মেইন ম্যেনু

প্রতিরোধের গল্প শুনালেন লুনা নূর

শাহাদত হোসাইন স্বাধীন : ০২ আগস্ট, ১৯৯৯ বৃহস্পতিবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ইতিহাসে এক প্রতিরোধের দিন, ইতিহাস পাল্টানোর দিন,শিকল ভাঙ্গার দিন। আমরা যারা একবিংশ শতকে ক্যাম্পাসে ঢুকেছি,অনেকেই জানি না সেই যুগান্তরকারী বিপ্লবের কথা,জানি না সেই প্রতিরোধের গল্প।

কেন ০২ আগস্ট খুন-ধর্ষণ বিরোধী দিবস পালন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কি সেই ইতিহাসের অধ্যায় যে কিনা পাল্টে দিয়েছিলো সমাজের প্রচলিত ধারণাকে। যতসব শোষনকরার আইনকে।
প্রতিবছরের ন্যায় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদ ০২ আগস্ট আলোচনা সভা ও নাটক প্রদর্শনীর আয়োজন করে জাহাঙ্গীরনগর মুক্তমঞ্চে।

উদ্দেশ্য নতুন প্রজন্মকে ১৯৯৯ সালের ০২ আগস্টের সেই খুন-ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কথা জানানো।

আলোচনা সভা শুরু হওয়ার কথা সন্ধা ০৭ টায়। কিন্তুু বিকেল ৫ টা থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছিল মুক্তমঞ্চ। আলোচনা শুনতে আাসা তরুণদের চোখজোড়ার উচ্ছ্বাসও ক্রমে বিচলিত হচ্ছিলো। আজ কি শুনতে পাবো সেই প্রতিরোধের গল্প? “না শুনবোই, বৃষ্টি আসুক! বৃষ্টির ভয়ে দরজা বন্ধ রাখি বলেই তারা পেয়ে বসে”,বসছিলেন আলোচনা শুনতে আসা লাবণ্য।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে ০৭ টার কিছু আগেই আগেই বৃষ্টি থেমে যায়। সেই বৃষ্টি ভেজা মুক্তমঞ্চের দর্শক সারিতে বসে পড়ে গল্প শুনতে আসা অদম্য তরুণরা।
অনুষ্ঠানে সভাপতি ছাত্র ইউনিয়নের জাবি সংসদের সভাপতি দীপান্জন সিদ্ধার্থ কাজলের শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর সেইদিনের সেই ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করলেন ক্যাম্পাসের সাবেক ছাত্রনেতা ও সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ মেহেদী ও আন্দোলনের আরেক দিকপাল যমুনা টিভির বিশেষ প্রতিনিধি আলমগীর স্বপন।
সবশেষে আসলেন লুনা নূর। সবার প্রিয় লুনা আপা। যিনি সেই দিনের লড়াকু সৈনিক। হার না মানা এক অদম্য নারী।

মুক্তমঞ্চে শত শত নারী পুরুষ বসে আসে লুনা আপার সেই দিনের (১৯৯৮ সালের ০২ আগস্ট) এর প্রতিরোধের গল্প শুনার জন্য। লুনা আপা মঞ্চে আসলেন করতালি আর চোখ জোড়া আগ্রহ নিয়ে স্বাতগম জানালো আজকের প্রজন্ম। যারা এক অপরাজেয় প্রতিরোধের গল্প শুনতে এসেছেন।
বরাবরের মতো লুনা আপা আসলেন,বললেন, জয় করলেন।
শুনালেন সেই বিপ্লবী দিনগুলোর কথা।
লড়াই দিনের সহযোদ্ধা ও আর শ্রোতা শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করলেন লুনা নূর।
“জাহাঙ্গীরনগর মুক্তমঞ্চ সোনালী চেতনার এক পবিত্র স্হানে আপনার আজ উপস্হিত হয়েছিলেন। আপনারা শুনতে এসেছেন একটি বিপ্লবের গান। সেই গান গেয়ে শুনানোর আমি এসেছি,সে দিনের প্রতিরোধের বানী নতুন প্রজন্মকে শোনানোর আাকাঙ্কা থেকে। আজকে যারা সেই ইতিহাসের কথা শুনতে এসেছেন আপনাদেরকে যদি শুনাতে পারি প্রতিবাদের ইতিহাস, তাহলে আপনারা আজকের প্রজন্ম ও জ্বলে উঠবেন নিজেদের শক্তি ও প্রেরণা নিয়ে”,বলছিলেন সবার প্রিয় লুনা আপা।
আমরা যারা ১৯৯০ এর দশকে ক্যাম্পাসে এসেছি আমাদের কাছে এই ক্যাম্পাস বিপ্লবের বাতিঘর, এই জাহাঙ্গীরনগর মুক্তমঞ্চে সারারাত নাটক চলত। ছেলে মেয়ে একসাথে নাটক দেখেছে। কিন্তুু হঠাৎ করে ধাক্কা খেল এই প্রগতিশীল ক্যাম্পাস।
এই ক্যাম্পাসের নারী ধর্ষিত হয়েছে তার পুরুষ বন্ধুর হাতে, তার মিছিলের সহযোদ্ধার হাতে। এই ক্যাম্পাস সেই ক্যাম্পাস যে ক্যাম্পাসে প্রথম নারী-পুরুষের সমান অনুপাত ছিলো ভর্তিতে, নারী -পুরুষ হাতে হাত রেখে মিছিল করেছে,আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। এহেন ঘটনায় স্তব্ধ ক্যাম্পাস।
ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
লুনা নূর বলছিলেন সেদিনের কথা।
১৭ আগস্ট দৈনিক মানব জমিনে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতা কর্মীদের ক্যাম্পাসে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পায়।
তার প্রতিবাদে মিছিলে মিলেছে প্রত্যক হলের ছাত্র-ছাত্রী। মিছিলে যোগ দিয়েছে শিক্ষকরা। সকল ধর্ষণ-খুন -সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর সমুদ্রের মতো গর্জে উঠেছে ।১৯৯৮ সালে ২০ আগস্ট শত শত নারী পুরুষ মিছিলে মিলেছে, তাদের দৃপ্ত পদক্ষেপ আর শ্লোগানে প্রকম্পিত সকল অপশক্তি।কিন্তুু ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের সেই ধর্ষকদের পক্ষে সাফাই গায়তে শুরু করে প্রশাসন।
তবু আন্দোলন থেমে থাকেনি। আন্দোলনের পক্ষে বাড়তে থাকতে জনসমর্থন।
আন্দোলন বানচালের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয় ধর্ষকদের প্রশ্রয় দানকারী ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের দ্বারা লাঞ্চিত হন নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ।
ভয়াবহ বন্যায় ক্যাম্পাসে দূর্যোগপূর্ন আবহাওয়া সৃষ্টি হলেও আমরা ক্যাম্পাস ছাড়িনি। বেচেঁ আছি কিনা তা বাড়িতে জানাতে ফোন করার জন্য যেতে হত সাভারে। এহেন প্রতিকূলতায় আমরা ধর্ষণ ও ধর্ষনের রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়েছি। আবেগ জড়িত কন্ঠে বলছিলেন লুনা নূুর।

১৯৯৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেটের সভায় পূর্বের ২৪ সেপ্টম্বরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে দোষীদের সাজা কমানো হয়। ‘ধর্ষণ সেঞ্চুরি “উদযাপন করা ছাত্রলীগের তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র জসিম উদ্দীন মানিককে চিরতরে বহিষ্কার সহ তার সহযোগী শেখ মিরাদুল ইসলাম ও দেওয়ান গোলাম মোহাম্মদ ডালাসকে ৩ বছর, আতিকুর রহমান নাঈমকে ২ বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়।
ধর্ষনের বিচারে সিন্ডিকেটের এই অকঠোর রায় প্রত্যাখান করে সাধারণ ছাত্র ঐক্য।
যার ফলশ্রুতিতে রচিত হয়েছিলো এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় -২ রা আগস্ট।

অপেক্ষাকৃত কম সাজা পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠে রেপিস্ট গ্রুপ। তারা আবার হলে ফিরে আসে। ১৯৯৯ সালের ১ জুলাই হল রেইড দেওয়া হলেও সেটি আইওয়াশ হিসেবে থেকে যায়।’৯৮ সালে আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের চেতনা আবার জেগে উঠে।

“খুনি-ধর্ষক ভাই ভাই,জাবি ক্যাম্পাসে ঠাইঁ নাই ” এই প্রত্যয়ে সাধারণ ছাত্র ঐক্যের ব্যানারে ছাত্র ইউনিয়ন,ছাত্রফ্রন্ট,গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের নেতৃত্বে আহুত মিছিলে বাধঁ ভাঙ্গে শিক্ষার্থীদের।

হলের তালা ভেঙ্গে বিতাড়িত করা হয় সেই রেপিস্ট গ্রুপকে। এর ফলে জাহাঙ্গীরনগরে রচিত হয় ক্ষমতা বনাম অধিকার আদায়ের অমর দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রে রচিত হয় “ধর্ষণ বিরোধী নীতিমালা”।যার খসড়া রচিত হয় জাহাঙ্গীরনগর থেকে।

luna apa.2.jpgapa 3

লুনা নূর আপা বলেন,” ক্ষমতার রাজনীতি সেই দিনের কুখ্যাত মানিক ও তার সহযোগীদের বেপরোয়া করে তোলে। আমরা যখন ক্যাম্পাসে আসি তখন মানিক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তার আগে সে ছিলো ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক।
সাধারণ ছাত্র ঐক্য ধর্ষণ ও ধর্ষণের রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একটা ছেলে কখনো ধর্ষক হয়ে জন্মায় না। ক্ষমতার রাজনীতি তাকে ধর্ষক বানায়, খুনি বানায়,সন্ত্রাসী বানায়। তাই আমাদের আজকের প্রতিরোধ সকল ধর্ষণের রাজনীতির বিরুদ্ধে”।
আজকে যারা মুক্তমঞ্চে শ্রোতা হয়ে এসেছেন আপনাদের বলছি এখনো ধর্ষণের রাজনীতি শেষ হয় নি। পহেলা বৈশাখে যৌন নিপীড়ন ও তনু হত্যার পর আমাদের নতুনভাবে ভাবতে হয়। আমাদের আন্দোলন শেষ হয়নি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চালিয়ে নিতে হবে এই সংগ্রাম। সকল অন্যায় কাঠামোর বিরুদ্ধে দাড়াতেঁ হবে। ভাঙ্গতে হবে অন্যায়ের শিকল। ০২ আগস্টের প্রেরণা হয়ে থাকবে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে। তাদের চেতনা শানিত হউক নব বিপ্লবের জাগরণে । কোন এক প্রতিরোধের মিছিলে দেখা হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।

বিপ্লবী শুভেচ্ছা।

বিপ্লবের বাণী শুনিয়ে বিদায় নিলেন এক বিপ্লবী।