মেইন ম্যেনু

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীকে দিয়ে সংসদে অসত্য বলাচ্ছে কারা?

মাঈনুল ইসলাম নাসিম : ২০০৯ থেকে ২০১৫ টানা সাড়ে ৬ বছর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন হরহামেশা যেভাবে সংসদের ভেতরে ও বাইরে ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান’ সংক্রান্ত অসত্য ও ভিত্তিহীন তথ্য-উপাত্ত দিতেন, গত বছর দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি অন্ততঃ একই পথের পথিক হবেন না, এটাই ছিলো আমাদের প্রত্যাশা। ক্লিন ইমেজের নিরহংকারী একজন ভালো মানুষ হিসেবে আমরা এখনো আস্থা রাখি তাঁর উপর, যিনি স্বীয় ক্যারিশম্যাটিক গুণে ‘টেকনোক্রেট’ কোটায়ও মন্ত্রী হবার যোগ্যতা রাখেন। তাঁর মতো এমন একজন সৎ ও শিক্ষিত মানুষকে দিয়ে পূর্বসূরীর পদাংক অনুসরণ করিয়ে ৭ জুন মহান জাতীয় সংসদে ভিত্তিহীন তথ্য পরিবেশন করানোতে অবাক হয়েছেন বহু দেশে বসবাসরত প্রবাসীরা, যেসব দেশে নিকট অতীতে কখনো বাংলাদেশ থেকে কর্মী প্রেরিত হয়নি, বর্তমানেও হচ্ছে না।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিকে দিয়ে বলানো হয়, “বিগত জোট সরকারের আমলে বিশ্বের ৯৭টি দেশে কর্মী প্রেরণ করা হতো, আর বর্তমান সরকারের আমলে নতুন আরো ৬৪টি দেশে কর্মী প্রেরণ করায় এই সংখ্যা ১৬১টিতে উন্নীত হয়েছে”। অথচ বাস্তবতার নিরিখে অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও যেমন কথিত ঐ ৯৭টি দেশে কর্মী পাঠানো হয়নি, ঠিক তেমনি বর্তমান সরকারের আমলেও ১৬১ টি দেশে কর্মী প্রেরণের তথ্যটি শতভাগ উদ্ভট ও ভিত্তিহীন। বর্তমান সময়ের কথাই ধরা যাক। ১৬১ সংখ্যাটি যদি বলতেই হয় তবে শুধুমাত্র দু’টি ক্ষেত্রে তা ব্যবহারের যৌক্তিকতা আছে। প্রথমতঃ যেটা বলা যেতে পারে তা হচ্ছে ১৬১টি দেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের বসবাস অথবা বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলো থেকে ১৬১টি দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের নিয়মিত যাতায়াত।

সরকারের উদ্যোগে বা প্রচেষ্টায় ১৬১টি দেশে কর্মী পাঠানোর তথ্যটি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয় কয়েকটি সরল সমীকরণে। মন্ত্রণালয়ের অধিনস্ত জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)’র অধীনে যেসব দেশে কর্মী পাঠানো হয় বা হয়ে থাকে, মূলতঃ সেটাকেই সরকারী উদ্যোগে কর্মী প্রেরণ বুঝিয়ে থাকে। ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের হিসেবটি দিলেই সবকিছু পুরোপুরি ক্লিয়ার হয়ে হবে। ইউরোপের ৫১টি দেশ, উত্তর আমেরিকার ২৩টি দেশ, দক্ষিণ আমেরিকার ১২টি দেশ এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের ১৪টি দেশ তথা এই ৪টি মহাদেশের সর্বমোট ১০০টি দেশের মধ্যে ১০টি দেশেও যেহেতু বাংলাদেশ থেকে সরকারী উদ্যোগে কর্মী পাঠানো হয় না, তাই ১৬১ সংখ্যার হিসেব মেলার কোন সুযোগই নেই। বাস্তবতা হচ্ছে এশিয়ার অধিকাংশ দেশ এবং আফ্রিকার সীমিত সংখ্যক কিছু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো এবং আছে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানী বা সরকারী প্রচেষ্টায় কর্মী প্রেরণ।

বাই-রোডে তথা দালালের মাধ্যমে আংশিক আকাশপথে সহ সাগর-পাহাড় পাড়ি দিয়ে যাঁরা বিগত দিনে বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে প্রবেশের পর একটা সময় পর বৈধ হয়েছেন বা বৈধতার সুযোগ নিয়েছেন, এই সকল দেশকে কোনভাবেই ঐ ১৬১ সংখ্যার হিসাবতত্ত্বের মধ্যে আনার সুযোগ নেই। যেসব বাংলাদেশী বিভিন্ন দেশে ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক উদ্যোগে স্পন্সরের মাধ্যমে বা লাখ লাখ টাকা খরচায় গিয়েছেন এমনকি ভিসা নিয়ে যাবার পর ওভার-স্টে করে সংশ্লিষ্ট দেশে বা পাশ্ববর্তী কোন না কোন দেশে ইমিগ্রান্ট হয়েছেন, সেটাকেও সরকারীভাবে কর্মী পাঠানোর তালিকায় নেয়ার অবকাশ নেই। সঙ্গত কারণে জোট সরকারের আমলে ৯৭টি দেশে কর্মী পাঠানোর তথ্যটি যেমন ভূয়া, একইভাবে বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টায় ১৬১টি দেশে জনশক্তি রপ্তানীর আজগুবি তথ্য শতভাগ বানোয়াট। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মহান জাতীয় সংসদে সত্য চিত্রটি তুলে ধরতে সমস্যা কোথায় ?

ভুল, বানোয়াট, অসত্য তথ্য আর যাইহোক ক্লিন ইমেজের একজন মন্ত্রীর প্রোফাইলের জন্য যে চরম বেমানান, তা নুরুল ইসলাম বিএসসি সাহেব নিশ্চয়ই অবগত আছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার গুডবুকে স্থান করে নেয়ার অপচেষ্টার অংশ হিসেবেই সম্ভবত কোন অশুভ শক্তি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীকে দিয়ে এসব ভিত্তিহীন বক্তব্য দেয়াচ্ছে। স্যোশাল নেটওয়ার্কের যুগে যেখানে পৃথিবীর সবকিছুই পানির মতো স্বচ্ছ ও পরিষ্কার, সেখানে বাংলাদেশ থেকে ১৬১টি দেশে কর্মী প্রেরণের এই অসত্য তথ্য যাচাই করার জন্য বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন পড়ে না। মঙ্গলবার সংসদে মন্ত্রী অবশ্য যে সত্য তথ্যটি দিয়েছেন তা হচ্ছে, “২০১৪ সালের জুলাই হতে গত ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত ৪ লাখ ৬১ হাজার ৯৪৬ জন বাংলাদেশি কর্মী বিএমইটি’র মাধ্যমে বিদেশ গমন করেছেন”। এজন্য দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়কে আমরা অবশ্যই অভিনন্দন জানাই। কিন্তু এটা যে জনশক্তি রপ্তানির ক্রমাবনতিরই চিত্র, সেটাও তো অস্বীকার করার উপায় নেই।

আগেকার মন্ত্রীর সময়কালে যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল জনশক্তি রপ্তানী, নতুন মন্ত্রীর আমলে তা থেকে উত্তরণের পথ এখন তৈরী হতেই পারে। তাই বলে সত্য প্রকাশে ক্ষতি কি ? বিএমইটি’র পরিসংখ্যান যেখানে বলছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রপ্তানি হয়েছিল ২০০৭ ও ২০০৮ সালে। ২০০৭ সালে জনশক্তি রপ্তানি হয় ৮ লাখ ৩২ হাজার ৬০৯ জন এবং ২০০৮ সালে রপ্তানি হয় ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন। ২০০৯ থেকে ২০১৫ এই সাড়ে ৬ বছর দায়িত্ব পালনকারী মন্ত্রীর ব্যর্থতা এবং মন্ত্রণালয়ের ভুল পলিসি জি-টু-জি’র খেসারতে কমতে থাকে জনশক্তি রপ্তানি। দশ বছরের ব্যবধানে জনশক্তি রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে আজ, এই তথ্যটি দিয়ে বরং জাতীয় সংসদকে আরো ‘মহান’ করা যেতো অনায়াসেই। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)’র তরফ থেকেও যেখানে বারবার বলা হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানিতে স্থবিরতা বা রপ্তানী কমে যাবার কথা, সেখানে মন্ত্রণালয়ের কাছে পুরনো স্টাইলে ‘সবকিছু স্বাভাবিক’! আবারো তাই একই প্রশ্ন, নয়া মন্ত্রীকে দিয়ে অসত্য উচ্চারণ করাচ্ছে কারা ? চাটুকারিতা নয়, আমরা চাই পুরনো শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার, নতুনের সন্ধান।

লেখক : ইতালী প্রবাসী, সাংবাদিক


(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। আওয়ার নিউজ বিডি এবং আওয়ার নিউজ বিডি’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)