মেইন ম্যেনু

প্রসংগঃ সর্বস্তরে বাংলা সন প্রচলন

সৈয়দ নাজমুল আহসান : বাংলা সন। বাঙ্গালী সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। আবহমান বাংলার গৌরবোজ্জল বাঙ্গালী সংস্কৃতির গর্ব বাংলা সন। বিশ্বের অনেক ভাষা-সংস্কৃতির নিজস্ব সন বা বর্ষপঞ্জী নেই। আমরা বাঙ্গালীরা গর্বিত এ কারনে যে আমাদের একান্ত নিজস্ব একটি বর্ষপঞ্জী আছে। বাঙ্গালীর নিজস্ব বর্ষপঞ্জী হলো বাংলা সন। বাংলা সন বাঙ্গালীর সংস্কৃতিকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। বাংলা ভাষা- সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি-জাতি গঠনের ভীতকে মজবুত করেছে। তাই একবাক্যে বলা যায় বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে বাংলা সন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বাংলা সনের উদ্ভবের ইতিহাস নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত করে তথ্য-উপাত্ত দেয়া সম্ভব না হলেও মোঘল সম্রাট আকবরের ব্যাক্তিগত উদ্যোগ-পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সনের উদ্ভব হয়েছে বলে অধিকাংশ পন্ডিত গবেষক একমত পোষন করে। ’আকবরনামা’ ও ’ আইনী আকরবী’তে ভারতীয় সনের ইতিহাস আলোচনায় বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের উল্লেখ আছে। যার উদ্যোক্তা হিসাবে সম্রাট আকবরের কথাই বলা হেেয়ছে। ব্যাপক গবেষনায় প্রমানিত হয়েছে আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তণ করেছেন। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে উপমহাদেশে সরকারী কাজে হিজরী সনের ব্যবহার হতো। হিজরী সন হলো চান্দ্রসন যা চাঁদের পরিক্রমনের উপর ভিত্তি করে গননা করা হয়। সেসময় সরকারী কাজে চান্দ্র সনের ব্যবহার থাকলেও সাধারন মানুষের পালা-পর্বন ইত্যাদির হিসাবে সৌরসনের প্রচলন চিল। আর চান্দ্র সন হিজরীর সাথে সৌরসনের হিসাবেরও তফাৎ ছিল। হিজরী চান্দ্রসনে ৩৫৪ দিন ৮ঘন্টা ৪৮ সে. এ বছর গননা করা হয়। অন্য দিকে সৌরসনে বছর গননা হয় ৩৬৫ দিন ৫ঘন্টা ৪৮ মি. ৪৬ সে. এ অর্থাৎ দুই সনের বছর গননায় প্রায় ১০/১১ দিনের পার্থক্য থাকায় রাস্ট্রীয় কাজে গরমিল দেখা দেয়। সম্রাট আকবর বছর গননার এই সমস্যা সমাধানের জন্য জ্যোতিষশাস্ত্রবীদ পন্ডিত আমীর ফতেহউল্যাহ সিরাজীকে দায়িত্ব দেন একটি ক্রটিমুক্ত বিজ্ঞানভিত্তিক সর্বজন গ্রহনীয় বর্ষপঞ্জীর সন উদ্ভাবনের। ফতেহউল্যাহ সিরাজীর উদ্ভাবিত সেই বর্ষপঞ্জী হলো বাংলা সন।

সম্রাট আকবর তার রাজ্য শাসনের উনত্রিশ বছর পর ৯৯৩ হিজরী সনে বা ১৫৮৪ খ্রীস্টাব্দের ১০-১১ মার্চে বাংলা সন প্রবর্তনের ফরমান জারি করেন। কিন্তু নব উদ্ভাবিত বাংলা সনকে কার্যকর করার নির্দেশ দেন তার সিংহাসনে আরোহনের বছর অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরী সন থেকে যা ছিল ১৫৫৬ খ্রী.। হিজরী সনকে ভিত্তি ধরায় ৯৬৩ হিজরী সনের আলোকেই বাংলা সন ও ৯৬৩ বঙ্গাব্দ নির্ধারন করা হয় অর্থাৎ হিজরী সনকেই বঙ্গাব্দে রুপান্তরিত করা হয়। তবে তা বাঙ্গালীর উপযোগী করে। হিজরী সন চান্দ্রসন হলেও বাংলা সন হলো সৌরসন বা চান্দ্রসৌর সন। যা প্রকৃত পক্ষে চান্দ্র ও সৌর সনের মিলিত নতুন হিসাব, নতুন উদ্ভাবিত বাংলা বর্ষপঞ্জী। বাংলা সনে মাসের নামগুলো নেয়া হয়েছে বাঙ্গালীর পরিচিত নক্ষত্রসমুহের নাম থেকে যেমন- বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ মাসের নামকরন করা হয়েছে তেমনি জ্যেষ্ঠ নক্ষত্রের নামে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেজে আষাঢ়, শ্রাবনা থেকে শ্রাবন, ভাদ্র পদা থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, পূষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফল্গুনী থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র। তবে একমাত্র বাংলা মাস অগ্রাহায়ন কোন নক্ষত্রের নাম থেকে নেয় হয়নি। বাংলা সন যেহেতু হিজরী সনকে ভিত্তি ধরে প্রবর্তন করা হয়েছে তাই হিজরী সনের প্রথম মাস মহররমের সময় আকবরের সুবে বাংলায় বৈশাখ মাস হওয়ায় বৈশাখ সামটিকেই বংলা সনের প্রথম মাস নির্ধারন করা হয়ে। বাংলা সন তৎকালীন আকবরের রাজ্য শাসনে প্রজাদের খাজনা আদায়ে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। বাংলা সন সুবে বাংলার বাঙ্গালীদের তিথি-নক্ষত্র অনুযায়ী উৎসব, পালা-পার্বন অনুষ্ঠানকে সহজতর করেছিল। বাংলা সনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ফলেই আজকে বাঙ্গালী জাতি-সংস্কৃতি স্বমিহমায় বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে। বাংলা সন বাংলার মা-মাটি-মানুষের তথা প্রকৃতির নিজস্ব সন। এই সন বাঙ্গালীর নিত্য দিনের জীবন যাত্রার সাথে একাকার হয়ে মিশে আছে। বাংলা সন বাঙ্গালী সংস্কৃতি-জাতি গঠনের অন্যতম চালিকা শক্তি। বাংলা সনের নববর্ষ পহেলা বৈশাখ পালনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সংকীর্ণতা পরিহার করে বাঙ্গালী জাতি তার স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করছে, উৎসবে মেতে উঠছে। বাংলা সন বাঙ্গালী জাতির চেতনাকে শানিত করছে। বাংলা সন বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে।

মোঘল আমলে বাংলা সনের ব্যাপক প্রচলন ছিল। ইংরেজরা আসার পর সরকারি কাজে বাংলা সনের প্রচলন কমিয়ে দেয়া হয়। তারা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন করে। তখন থেকে বাংলা অঞ্চলে বাংলা সন প্রচলনে শিথিলতা আসে। পাকিস্তান আমলেও বাংলা সন সরকারীভাবে উপেক্ষিত ছিল। বাংলা বর্ষপঞ্জীকে সমেয়োপযোগী করার লক্ষ্যে১৯৬৬ সালে জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে সভাপতি করে তৎকালীন বাংলা একাডেমী বাংলা বর্ষপঞ্জী সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সেই কমিটি কর্তৃক প্রণীত সংস্কারকৃত বাংলা বর্ষপঞ্জী যা শহীদুল্লাহ বর্ষপঞ্জী নামে পরিচিত। শহীদুল্লাহ বর্ষপঞ্জী আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারের ন্যায় একটি আদর্শ বাংলা সনের বর্ষপঞ্জী। এ বর্ষপঞ্জীতে বাংলা বৈশাখ মাস থেকে ভাদ্র মাসে ৩১ দিন, আশ্বিন থেকে চৈত্রমাস ৩০ দিন ধরা হয়েছে। আর লীপ ইয়ার বা অধিবর্ষের ক্ষেত্রে গ্রেগরিয়ান ক্যান্ডোরের ন্যায় ৪ দিয়ে ভাগের বিভাজ্য সনকে ধরা হয়েছে। লীপ ইয়ারের চৈত্র হবে ৩১ দিন। ড. শহীদুল্লাহর বর্ষপঞ্জীর একটি সমস্যা হলো বাংলা সনে প্রচলিত গুরুত্বপূর্ন জাতীয়ভিত্তিক তারিখগুলোর সাথে ইংরেজী খ্রীস্টাব্দের তারিখের ক্ষেত্রে প্রতিবছর ২/১ দিনের হেরফের পরিলক্ষিত হওয়া। উদহারন স্বরুপ বলা হয় ঐতিহাসিক ২১ ফ্রেব্রূয়ারী অথবা ৮ ফাল্গুনের কথা। প্রচলিত শহীদুল্লাহ বর্ষপঞ্জী মোতাবেক ২১ ফেব্র“য়ারী কোন বছর হবে ৮ ফাল্গুন আবার কোনো বছর হতে পারে ৯ ফাল্গুন। এতে বাংলা সনের সাথে ইংরেজী সনের তারিখে ২/১ দিনের হেরফের হয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে ড. শহীদুল্লাহর পূত্র ভাষা সৈনিক মুহাম্মদ তকীয়ুল্লাহ প্রমিত বাংলা বর্ষপঞ্জী প্রনয়ন করেছেন। যাতে বিভিন্ন সন ও তারিখের সমন্বয় সাধান করে বাংলা সনে প্রচলিত তারিখগুলোর সাথে ইংরোজী সনের তারিখগুলো সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। ফলে ২১ ফেব্র“য়ারীতে প্রতি বছরই ৮ ফাল্গুন পড়বে। অন্য দিবসের ক্ষেত্রেও তাই হবে। মুহাম্মদ তকীয়ুল্লাহ প্রনীত ড. শহীদুল্লাহ বর্ষপঞ্জীর সংস্কারের ক্ষেত্রে ১৫ এপ্রিলে ১ বৈশাখ ধরতে হবে। আর লীপ ইয়ারের হিসাবের ক্ষেত্রে ৪ দিয়ে বিভাজ্য সন নয় লীপ ইয়ার হিসাব করতে হবে বাংলা সনকে ৪ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ ২ অবশিষ্ট থাকে যে সনে সে সনকে বাংলা লীপ ইয়ার সন ধরতে হবে।আর বাংলা লীপ ইয়ার সনে ফাল্গুন মাস ৩১ দিন হবে। তকীয়ুল্লাহ প্রমান করেছেন তার প্রমিত বাংলা বর্ষপঞ্জী অনুসরন করা হলে বাংলাদেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বাংলা তারিখগুলো প্রতিবছর ইংরেজী তারিখের সাথে নির্দিষ্ট করাই থাকবে হেরফের হবে না। তকীয়ুল্লাহ সম্পাদিত প্রমিত বাংলা বর্ষপঞ্জী অনুসরন করে বর্তমানে প্রচলিত ১৪ এপ্রিল ১ বৈশাখের স্থলে ১৫ এপ্রিল ১ বৈশাখ করা হলে আগামী বছরগুলোতে খ্রীষ্টাব্দ ও বঙ্গাব্দের পরস্পর প্রতিসঙ্গী তারিখ একই থাকার ফলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ন দিবস পালনে তারিখ হেরফেরের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। যা আমাদের বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করবে, শুদ্ধ করবে, জাতীয় চেতনাবোধকে করবে শানিত-সমৃদ্ধ । সেসাথে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়িত হবে।

আজকে আমাদের স্বাধীন ভূ-খন্ড আছে, পতাকা আছে, মানচিত্র আছে ভাষা-সংস্কৃতি আছে। নেই সর্বস্তরে বাংলা সনের প্রচলন। সরকার প্রঞ্জাপনের মাধ্যমে সর্বস্তরে বাংলা সনের প্রচলনের নির্দেশ দিলেও তা সর্বত্র মানা হচেছ না। এটা দুঃখজনক। আইনের প্রয়োগে জাতীয় চেতনাবোধকে জাগ্রত করাতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বে-সরকারী উদ্যোগেও পদক্ষেপ নিতে হবে। ভাষা আন্দোলন স্মৃতিরক্ষা পরিষদ, বাংলা সন বাস্তবায়ন পরিষদ, হৃদয়ে ৮ ফাল্গুনসহ বেশকিছু সংগঠন গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। আমরা আমাদের নিজেদের পরিবারে যদি বাংলা সনের প্রচলনের অভ্যাস গড়ি। স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে,পত্রিকা-মিডিয়ার সংবাদে এবং সকল চিঠি-পত্রের স্বাক্ষরে বাংলা সনের চর্চা করি। তাহলেই বাংলা সন প্রচলনের ব্যাপকতা বাড়বে। দেশ- জাতির জাতীয় প্রয়োজনেই সর্বস্তরে বাংলা সনের প্রচলন জরুরী।

লেখক : সদস্য, বাংলা একাডেমি