মেইন ম্যেনু

প্রাক্তন স্পিকার শেখ রাজ্জাক মারা গেছেন

প্রাক্তন স্পিকার, বর্ষীয়ান সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষানুরাগী অ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলী আর নেই। রোববার দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে খুলনার ফারাজীপাড়াস্থ নিজ বাসভবনে তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি…রাজিউন)।

মৃত্যুকালে শেখ রাজ্জাকের বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দুরারোগ্য ক্যানসার ব্যাধিতে ভুগছিলেন। তার মৃত্যুতে খুলনার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

মরহুমের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সোমবার বেলা ১১টায় খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে জানাজা শেষে শেখ রাজ্জাককে নিজ জন্মস্থান পাইকগাছা উপজেলার হিতামপুর গ্রামে দাফন করা হবে।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী শেখ রাজ্জাক আলী খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার হিতামপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে ১৯২৮ সালের ২৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে (১৯৫২) ও বাংলা সাহিত্যে (১৯৫৪) মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করার পর এলএলবি সম্পন্ন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় শেখ রাজ্জাক সক্রিয়ভাবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে তিনি খুলনা জেলা জজ কোর্টে ওকালতি শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্ট বারের সদস্য হন এবং ১৯৬৪ সালে খুলনা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন।

শেখ রাজ্জাক খুলনা ল কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন সহ-অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। এরপর তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর ওই কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে না পারলেও তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে টেট্রা ক্যাম্পে চলে যান এবং রেডক্রসে যোগ দিয়ে অনেক আহত মুক্তিযোদ্ধাকে সেবা প্রদান করেন।

১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে খুলনা-৬ আসনে জাসদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বে গঠিত জাগদল-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন। ১৯৮৯ সালে এই দলের নাম পরিবর্তন করে ‘বিএনপি’ করা হয় এবং সে বছর নির্বাচনে খুলনা-৬ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি আইন প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। সে বছরই ৫ এপ্রিল তিনি ডেপুটি স্পিকার ও ১২ অক্টোবর স্পিকার নির্বাচিত হন।

১৯৯২ সালে শেখ রাজ্জাক শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে প্রথম সার্ক স্পিকার্স সম্মেলনে যোগ দেন এবং সার্ক স্পিকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের পর শেখ রাজ্জাক আলীর সভাপতিত্বেই জাতীয় সংসদে স্বল্প সময়ের অধিবেশনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অনুমোদন দেওয়া হয়।

শেখ রাজ্জাক আলী ২০০২ সালে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। তিনি ২০০৬ সালের শেষ দিকে বিএনপি ছেড়ে কর্নেল অলি আহমদের সঙ্গে এলডিপি নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এর পর থেকে তিনি পরিবারের সঙ্গে নিভৃতে সময় কাটাতে থাকেন।

শেখ রাজ্জাক আলী ১৯৫৩ সালে প্রখ্যাত সমাজসেবী, ভাষাসৈনিক ও লেখিকা অধ্যাপক বেগম মাজেদা আলীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের পাঁচ কন্যাসন্তানের সবাই নিজ নামে খ্যাতিমান ও সুপ্রতিষ্ঠিত। বড় কন্যা ড. রানা রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। দ্বিতীয় কন্যা ডা. সাহানা রাজ্জাক স্ত্রীরোগ (গাইনি) বিশেষজ্ঞ হিসেবে খুলনায় কর্মরত। তৃতীয় কন্যা জার্মানিতে কর্মরত ডা. অ্যানা রাজ্জাক মেডিসিন ও আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ। চতুর্থ কন্যা লীনা রাজ্জাক চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট এবং কনিষ্ঠা কন্যা ব্যারিস্টার ড. জনা রাজ্জাক ইউনিভার্সিটি অব দি ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের আইন বিভাগের অধ্যাপক।