মেইন ম্যেনু

প্রাণভিক্ষা না চাইলে যেকোনো সময় ফাঁসি কার্যকর

মানবতাবিরোধী অপরাধী মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। গতকাল মঙ্গলবার সকালে এই রায় ঘোষণার পর বিকেলেই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এর মধ্য দিয়ে আইনি লড়াইয়ের শেষ ধাপের ইতি ঘটল।

রিভিউ খারিজের মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর এই কেন্দ্রীয় নেতার দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হলো। এখন তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন। তবে এই সুযোগ তিনি নেবেন কি না, তা তাঁর আইনজীবী বা পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত জানানো হয়নি। প্রাণভিক্ষা না চাইলে বা প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে আর কোনো বাধা থাকবে না।

রিভিউ খারিজ হওয়ায় একাত্তরে চট্টগ্রামে ডালিম হোটেলে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার দায়ে মীর কাসেমকে আপিল বিভাগের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকল। আর রিভিউর রায়েও সর্বোচ্চ দণ্ড বহাল থাকা ষষ্ঠ ব্যক্তি হলেন একাত্তরের গুপ্তঘাতক আলবদর বাহিনীর এই নেতা।

আপিল বিভাগের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এই সদস্যের করা রিভিউ আবেদনের ওপর ২৮ আগস্ট শুনানি শেষে আপিল বিভাগ ৩০ আগস্ট আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন। গতকাল সকাল নয়টার দিকে এজলাসে আসেন বিচারপতিরা। আসন গ্রহণের পর নয়টা চার মিনিটের দিকে রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। আদালত বলেন, রিভিউ আবেদনটি খারিজ করা হলো। বেঞ্চের অপর চার সদস্য হলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।

বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রিভিউ খারিজ করে দেওয়া ২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। বিকেলেই রায়ের অনুলিপি ট্রাইব্যুনাল হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

রিভিউর রায়েও মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় সন্তোষ প্রকাশ করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) আমাদের সকলের জন্য একটি স্বস্তির দিন। সকলের জন্য স্বাধীনতা আরও ভালোভাবে ভাগ করার দিন। বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আমিও আজ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছি।’

সন্তোষ প্রকাশ করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘উদ্বেগের অবসান হয়েছে। যে আশা নিয়ে সমগ্র জাতি ছিল এবং আমি ছিলাম, আজ তা পূরণ হয়েছে।’

মীর কাসেম আলীর প্রধান কৌঁসুলি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, ‘আমি বারবার বলেছি, মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে সাজা নেওয়া হয়েছে। আপিল বিভাগ যে সাজা দিয়েছেন, এটি সঠিক নয়, তা আমার পক্ষে বলা সম্ভবপর নয়। সর্বোচ্চ আদালত যেটি করেন, তা ন্যায়বিচার।’

শেষ সুযোগ প্রাণভিক্ষার: বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এখন মীর কাসেমকে রায় পড়ে শোনানো হবে। তিনি নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না, তা জানতে চাওয়া হবে। প্রাণভিক্ষা চাইলে বিষয়টি নিষ্পত্তির পর সরকার দণ্ড কার্যকর করবে। আর প্রাণভিক্ষা না চাইলে সরকার যেকোনো সময় ফাঁসি কার্যকর করতে পারবে।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য গত রোববার যুক্তরাজ্যে গেছেন। ৪ সেপ্টেম্বর তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, মীর কাসেম আলী প্রাণভিক্ষা চাইলে বিদেশে বসেই রাষ্ট্রপতি তা নিষ্পত্তি করতে পারবেন। রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাণভিক্ষার আবেদনের জন্য সাত দিনের অপেক্ষা আমরা করে থাকি। আমাদের কাছে মনে হয়, সাত দিন অত্যন্ত যুক্তিসংগত সময়।’

দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মীর কাসেম প্রাণভিক্ষা চাইলে তাঁর দরখাস্ত রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের পরপরই দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। রাষ্ট্রপতি দেশে না ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কি না, জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রাষ্ট্রপতি যেখানেই থাকুন না কেন, তাঁকে এটা অবহিত করা যায়। তাতে কোনো অসুবিধা নেই।

মীর কাসেম প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না, এমন প্রশ্নে তাঁর প্রধান কৌঁসুলি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘ওইখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, আই অ্যাম আ লইয়ার, ফাইটিং ফর ল।’

রায়ের খবর শুনেছেন কাসেম: গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, কাশিমপুর কারাগারে থাকা ৬৩ বছর বয়সী মানবতাবিরোধী অপরাধী মীর কাসেম আলী রেডিওতে রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার খবর শুনেছেন বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর জেলার নাশির আহমেদ জানান, মীর কাসেম তাঁর কাছে থাকা এক ব্যান্ডের রেডিওর মাধ্যমে ওই রায় শুনতে পেয়েছেন। আগে তাঁকে বেশ শক্ত দেখা গেলেও রায় শোনার পর অনেকটা চিন্তাযুক্ত ও নার্ভাস মনে হয়েছে।

চার বছরের পরিক্রমা: জামায়াতের অর্থের জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত মীর কাসেমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১২ সালের ১৭ জুন গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের রায়ে দুটি অভিযোগে তাঁকে ফাঁসির আদেশ ও আটটি অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর আপিল করেন মীর কাসেম। চলতি বছরের ৮ মার্চ আপিলের রায়ে ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে হত্যার (১১ নম্বর অভিযোগ) দায়ে মীর কাসেমের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। অপর ছয়টি অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড বহাল থাকে। আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় ৬ জুন প্রকাশিত হয়। রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে ১৯ জুন আবেদন করেন মীর কাসেম। এই রিভিউ আবেদনের ওপর ২৪ আগস্ট শুনানি শুরু হয়।

যে অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড: আপিল বিভাগের রায়ে ১১ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। এই অভিযোগের বর্ণনা অনুসারে, ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যেকোনো একদিন মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁকে সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ফলে জসিমের মৃত্যু হলেও আরও পাঁচজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশসহ তাঁর মৃতদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

মামলাগুলো: মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৬টি মামলায় ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল ও রিভিউ নিষ্পত্তির পর পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। তাঁরা হলেন জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা­ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। এর বাইরে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের ওপর রায় হয়েছে, ট্রাইব্যুনালে তাঁকে দেওয়া সর্বোচ্চ সাজা কমিয়ে আপিল বিভাগ আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন। এই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে দুই পক্ষ আবেদন করেছে। এ ছাড়া আপিল শুনানির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় মারা যান গোলাম আযম ও মো. আবদুল আলীম।

প্রসিকিউটরদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে এখন ১৬টি আপিল রয়েছে। আপিল দায়েরের ক্রম হিসেবে এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে মোবারক হোসেনের করা আপিল শুনানি শুরুর পালা। এর বাইরে আরও ২০টি মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।

ফাঁসির রায় স্থগিতে অ্যামনেস্টির আহ্বান: মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় স্থগিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গতকাল মঙ্গলবার নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটির দক্ষিণ এশীয় পরিচালক চম্পা প্যাটেল এই আহ্বান জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় করা অপরাধের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার বাংলাদেশের মানুষের আছে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের যে ধারা চলছে, তাতে সেই অধিকার রক্ষা করা যাবে না।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার
রিভিউ খারিজের যত দিন পর ফাঁসি কার্যকর

আবদুল কাদের মোল্লা
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল
২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর আবেদন খারিজ হয়, ওই দিন রাতে ফাঁসি কার্যকর হয়

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল
২০১৫ সালের ৬ এপ্রিল আবেদন খারিজ, ১১ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টায় ফাঁসি কার্যকর হয়

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য
২০১৫ সালের ১৮ নভেম্বর আবেদন খারিজ হয়, ২১ নভেম্বর রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর হয়

আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল
২০১৫ সালের ১৮ নভেম্বর আবেদন খারিজ হয়, ২১ নভেম্বর রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর হয়

মতিউর রহমান নিজামী
জামায়াতের আমির
২০১৬ সালের ৫ মে আবেদন খারিজ হয়, ১০ মে রাত ১২টা ১০ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর হয়