মেইন ম্যেনু

প্রেসক্রিপশন বাংলায় অথবা ইংরেজি বড় হাতের অক্ষরে লেখা হোক

প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্র লেখেন চিকিৎসক। আপনার যে কোনও অসুখ-বিসুখে চিকিৎসকের কাছে গেলেই আপনাকে দেখে তিনি খসখস করে ব্যবস্থাপত্রটা লিখে ফেলেন। কী রোগ তা ডায়াগনোসিস করার পরামর্শ দিয়ে ব্যবস্থাপত্রে চিকিৎসকেরা একগাদা ঔষধের নাম লিখেন। কিন্তু যার জন্য ব্যবস্থাপত্র লেখা হলো, তিনি এতে কী লেখা হয়েছে তা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না শুধুমাত্র চিকিৎসকের হিজিবিজি লেখার কারণে। ফলে তার মনের মধ্যে সংসয় দেখা যায়, তিনি কী সঠিক ডায়াগনোসিসটি করেছেন কিংবা সঠিক ঔষধটি কিনেছেন!

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক গাজী সালেহ উদ্দীন সব সময় মনের ভেতরে একটা সন্দেহ নিয়ে ঔষধ সেবন করেন। কারণ তিনি কখনই নিশ্চিত হতে পারেন না যে, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ঔষধের দোকানের সহকারী সঠিক ঔষধটা দিয়েছে কী না।

তিনি বলেন, ‘সবসময় ঔষধের দোকানের সহকারী যে সঠিক ঔষধটাই দিচ্ছে, আমি কিভাবে তা নিশ্চিত হব? শিক্ষিত হয়েও যে আমি বেশিরভাগ সময় ব্যবস্থাপত্রে চিকিৎসক মহোদয় কি ঔষধ লিখেছেন সেটার পাঠোদ্ধার করতে পারি না। সেখানে একজন দোকানের সহকারী কিভাবে তার পাঠোদ্ধার করবে। এজন্য আমার ভেতরে খুতখুতে ভাবটা থেকেই যায়।’

সালেহ উদ্দীন বলেন, যদি চিকিৎসকরা বাংলায় কিংবা ইংরেজি বড় হাতের অক্ষরে লিখতেন তাহলে কম শিক্ষিত থেকে শুরু করে সবাই মোটামুটি বুঝতে পারতো, চিকিৎসক আসলে কোন ঔষধ লিখেছেন আর তারা কোন ঔষধ কিনে খাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের মতো অধিকাংশ মানুষের মতামত হলো, যেহেতু আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি এবং বাংলা আমাদের প্রাণের ভাষা আর এই ভাষার দাবীতে আমাদের রক্ত দিতে হয়েছে সেহেতু সবাই যাতে বুঝতে পারে এজন্য চিকিৎসকরা তাদের ব্যবস্থাপত্র ইংরেজির পরিবর্তে বাংলায় লিখলে সবাই উপকৃত হবেন।

চিকিৎসকদের দেয়া কমপক্ষে ১০০টি ব্যবস্থাপত্র বিশ্লেষন করে দেখা গেছে, হয় আদতেই তাদের হাতের লেখা খারাপ, নয়ত তাঁরা ইচ্ছে করেই জড়িয়ে পেঁচিয়ে ব্যবস্থাপত্র লিখেন রোগীদের বিভ্রান্ত করার জন্য। এ ক্ষেত্রে দুটো সম্ভাবনাই আসলে বিপদজনক। যদি চিকিৎসকদের হাতের লেখা খারাপ হয়, তাহলে কী মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থায় হাতের লেখা বিষয়টাকে গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে?

আর ইচ্ছে করে যদি চিকিৎসকরা জড়িয়ে পেঁচিয়ে লিখেন তাহলে উদ্দেশ্যটা তাদের মহৎ বলে মনে হয় না।

ঢাকার গ্রীনরোডে অবস্থিত একটি বেসরকারী হাসপাতালে বাবাকে ভর্তি করানোর পর বিপাকে পরেছেন কুষ্টিয়া থেকে আসা চালের ব্যবসায়ী জমির উদ্দীন। বাংলা মোটামুটি পড়তে পারলেও কিন্তু তিনি ইংরেজি পড়তে পারেন না। তিনি জানান, ‘বাবাকে কী ঔষধ খাওয়াবো, কখন খাওয়াবো এটা বুঝতে না পেরে প্রেসক্রিপশন নিয়ে কারো না কারো কাছে যেতে হয় আমাকে । কিন্তু হাসপাতালে আসা অনেকেই ডাক্তার কী লিখেছেন এটা বুঝতে পারেন না।’

বাংলাদেশ সরকারের একজন যুগ্ম সচিব মাহবুব কবির। তিনি বলেন, চিকিৎসকের দেয়া ব্যবস্থাপত্র নিয়ে তার অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ব্যবস্থাপত্রের লেখা অস্পষ্ট হওয়ার কারণে অনেক সময় তাকে আবার সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়েছিল তিনি আসলে কোন ঔষধের নাম লিখেছেন এটা জানার জন্য। এছাড়াও অনেক সময় ডাক্তারের কাছে ফোন করে প্রেসক্রিপশনে লিখা ঔষধের নাম জেনে নিতে হয়েছে, যা বড়ই বিব্রতকর। প্রেসক্রিপশনে লিখা ঔষধের নাম যথার্থভাবে পাঠোদ্ধার করতে না পারায় ভুল পথে এগিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন অনেকেই।

মাহবুব কবির বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দ্রুত এই সম্পর্কিত একটি গেজেট নোটিফিকেশন আনতে চলেছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিছু দিনের মধ্যে সারা দেশের এই নিয়ম চালু হয়ে যাবে। এবার থেকে ক্যাপিটাল লেটারে লিখতে হবে প্রেসক্রিপশন। সঙ্গে থাকবে ওষুধের জেনেরিক নাম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও চিকিৎসকরা তাদের দেয়া ব্যবস্থাপত্র কম্পিউটারে লিখেন বলে তিনি জানান।

তিনি বাংলাদেশের চিকিৎসকরা তাদের ব্যবস্থাপত্র কম্পিউটারে অথবা ইংরেজি বড় হাতের অক্ষরে লিখার ব্যবস্থা প্রচলন করার জন্য সরকারের নির্দেশনা আশা করেন। মাহবুব আরও জানান যে, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ডাক্তার সাহেবরা একসাথে একাধিক রুগীকে ডেকে তাঁদের কক্ষে বসিয়ে একজনের পর একজন রুগী দেখতে থাকেন। এ ব্যবস্থাটিও তাঁদের পরিহার করা উচিৎ। কারণ, এতে চিকিৎসক রুগীর প্রতি যথাযথ মনোযোগ দিতে পারেন না এবং অতি দ্রুত একজন রোগীকে বিদায় দিতে ডাক্তার সাহেবদের উপর বাড়তি মানসিক চাপ কাজ করে। যা বিশ্বে আর কোথাও দেখা যায় না। সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ বা এসডিজি’র একটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থাগুলো নেয়া অতি জরুরী বলে মনে করেন সরকারের এই যুগ্ম সচিব।

লেখক: এম এম  হাসান


(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। আওয়ার নিউজ বিডি এবং আওয়ার নিউজ বিডি’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)