মেইন ম্যেনু

পড়ার চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে কিশোর

গাদা গাদা বই, সেমিস্টারের পর সেমিস্টার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে কেড়ে নিচ্ছে সৃষ্টিশীলতা আর প্রাণশক্তি। কিসের মোহে, কিসের লোভে এমন মারণপথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে শিশুদের? এ প্রশ্ন কদাচিৎ উঠেছে ঠিক কিন্তু সেটা জোরালোভাবে বলছে না কেউই। রাষ্ট্রও যেন নির্বিকার। শিক্ষাব্যবস্থা দিনদিন যান্ত্রিক মানব তৈরি ছাড়া যেন আর কিছুই করছে না। শিশুদের ফুরসত নেই খেলবার, ফুরসত নেই ছুটোছুটি-হল্লায় শৈশব কাটানোর। যন্ত্র ও পুঁজি সভ্যতার দাস হওয়ার জন্য যেনো শিশুদের ক্রমাগত ঠেলে দেয়া হচ্ছে একটা অবৈজ্ঞানিক শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে। এর বিপরীতে কোনো উচ্চারণ নেই, স্লোগান নেই। নেই প্রতিবাদ।

কিন্তু নিজের জীবন নিঃশেষ করে এমন যান্ত্রিক শিক্ষাপদ্ধতির বিরুদ্ধে ঠিকই নিরব প্রতিবাদ জানাল কিশোর মো. শরীফ মণ্ডল (১৪)। রোববার সকালে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় নিজ বাসায় গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে ৬ষ্ঠ শ্রেণির এ কিশোর। সুরতহাল রিপোর্ট শেষে পুলিশ জানিয়েছে, পড়ালেখার চাপ সহ্য করতে না পেরেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে কিশোরটি।

কি ছিল ঘটনার নেপথ্যে: রাজধানীর খিলাগাঁওয়ের ফেইরিস হার্ট কিন্ডার গার্টেন স্কুলে পড়তো কিশোর শরীফ। ভারী আর কাটখোট্টা পড়ালেখার চেয়ে মনোযোগ বেশি ছিল খেলাধুলায়। সারাক্ষণ ক্রিকেট আর ক্রিকেট। বাবা মাইক্রোচালক আনোয়ার হোসেন গলদঘর্ম ছেলের পড়ালেখায় মন ফেরাতে। স্থানীয় একটি টেইলার্সে কাজ করেন তার মা। স্কুল থেকে বারবার নোটিস আসছে-ছেলে পড়ালেখায় খারাপ করছে। উপায়ন্তহীন আনোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী কয়েকদিন ধরে বেদম বকাঝকা করলেন ছেলেকে। এরপর একজন প্রাইভেট টিউটর ঠিক করলেন। রোববার বিকেল থেকে বাসায় এসে পড়ানোর কথা শরীফকে। শরীফের পিঠেপিঠি বড়ভাই সজীব স্থানীয় একটি ইলেক্ট্রনিক দোকানে ম্যাকানিক্যাল কাজ শিখছে। ছোট বোন সেঁজুতি শরীফের স্কুলেই পড়ছে প্লেতে।

রোববার সকালে যথারীতি কাজে বের হয়ে যান বাবা আনোয়ার হোসেন ও মা। বড়ভাই সজিবও চলে যায় কাজ শিখতে। রোজ সকালে ছোটবোনকে স্কুলে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পড়ে শরীফের ওপর। প্রতিদনকার মতো বোনকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছে সে। এরপর খিলাগাঁও সিপাহীবাগের ২৭৩/বি সাহেরুনবাগের খালি ও নির্জন বাসাটিতে ফিরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে জিআই তার বেঁধে গলায় প্যাঁচিয়ে আত্মহত্যা করে শরীফ।

সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে বাসার জানালা দিয়ে প্রতিবেশিরা শরীফের লাশ ঝুলতে দেখে বাবা আনোয়ার হোসেনকে খবর দেয়। এরপর আনোয়ার হোসেন বাসায় ফিরে পুলিশকে খবর দিয়ে দরজা ভেঙে দুপুর ১২টার দিকে লাশ উদ্ধার করেন। তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে।

ঢামেকের মর্গের সামনে বিলাপ করতে করতে বাবা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পড়ালেখায় বড্ড অমনোযোগী ছিলো বলে শনিবার হাল্কা বকাঝকা করেছি। প্রাইভেট টিউটর ঠিক করেছি। সকালে পইপই করে বলে গেছি বিকেলে হাউজটিউটর আসবে, প্রস্তুত থাকিস। কিন্তু আমার ছেলেটা প্রস্তুতি নিল মৃত্যুর।’

খিলাগাঁও থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) মো. আলাউদ্দিন ময়না তদন্ত শেষ করে বলেছেন, ‘তার (শরীফের) শরীরে কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্ন নেই। বাবার জবানী থেকে ধারণা করা হচ্ছে পড়ালেখার চাপ সহ্য করতে না পেরেই সে আত্মহত্যা করেছে।

প্রসঙ্গত, গত বছরের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই এসএসসিতে জিপিএ-৫ না পেয়ে আত্মহত্যা করেছিল ফেনী সেন্ট্রালহাই স্কুলের ছাত্র আরাফাত শাওন। তার ‘সুইসাইড নোট’- রীতিমতো ঝড় তুলেছিল সারাদেশে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে চরম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল সে। শরীফ কোনো ‘সুইসাইড নোট’ লেখেনি। ফলে এবার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার দৌড়ও হয়তো তেমন একটা হবে না। কিন্তু প্রশ্নটা ঠিকই জিইয়ে থাকে তুষের আগুনের মতো।