মেইন ম্যেনু

ফিলিপাইনে আইনি জটিলতায় বাংলাদেশের টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় যে অর্থ ফিলিপাইনে চলে গেছে। তা ফেরত পেতে আইনি লড়াই করতে হবে। এ লাইড়ে কেউ যদি এ অর্থের দাবি না করে তাহলে অতি শিঘ্রই (৩ মাস) টাকা ফেরত পাবে বাংলাদেশ বলে জানিয়েছেন ফিলিপাইনের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া বাকে আবাদ।

তিনি বলেছেন, তবে কেউ যদি এ অর্থের দাবি করে তাহলে কত সময় লাগবে তা বলা কঠিন।

এএমএলসির নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া বাকে আবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে মঙ্গলবার এ খবর প্রকাশ করেছে ফিলিপাইনের সংবাদ মাধ্যম র‌্যাপলার।

চুরি হওয়া অর্থের একটি অংশ জমা পড়েছে ফিলিপাইনের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) কাছে। ফিলিপাইনের জাংকেট অপারেটর কিম অংয়ের কাছ থেকে এ অর্থ পাওয়ার পর গত সপ্তাহে একটি বাজেয়াপ্তকরণ মামলা করেছে এএমএলসি।

এ মামলা নিষ্পত্তির ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি। এছাড়া ওই অর্থ ফেরত পেতে বাংলাদেশকে এর মালিকানার দাবিও উপস্থাপন করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে ফিলিপাইনে প্রবেশ করে। চুরি যাওয়া ওই অর্থ দেশটির রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার শাখার মাধ্যমে প্রবেশ করে। পরে তা মুদ্রা রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠান ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশনের মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করে কয়েকটি ক্যাসিনোয় পাঠানো হয়।

ওই অর্থের মধ্য থেকে ২ কোটি ১৫ লাখ ডলার যায় কিম অংয়ের কাছে। কিম অং ওই অর্থ থেকে এখন পর্যন্ত এএমএলসির কাছে মোট ৯৮ লাখ ডলার ফিরিয়ে দিয়েছেন, যা এখন দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকো সেন্ট্রাল এনজি পিলিপিনাসের (বিএসপি) ভল্টে রক্ষিত আছে।

কিম অংয়ের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ বাংলাদেশকে ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে এএমএলসি দেশটির বিচার বিভাগে ১৫ এপ্রিল একটি বাজেয়াপ্তকরণ মামলা করে। কারণ ফিলিপাইনের আইন অনুযায়ী অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে কিম অংয়ের কাছ থেকে লিখিত সম্মতির পাশাপাশি মামলাটি নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে মামলার শুনানিতে কেউ যদি ওই অর্থের মালিকানা দাবি না করে, তাহলে তা তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন এএমএলসির নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া বাকে আবাদ। তবে অন্য কেউ এর মালিকানা দাবি করলে মামলাটি নিষ্পত্তিতে ঠিক কত সময় লাগবে, সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

ফিলিপাইনের সন্দেহভাজনদের সম্পদ বাজেয়াপ্তে আরো মামলা করা হবে জানিয়ে জুলিয়া বাকে আবাদ বলেন, আমরা এটি ধাপে ধাপে করব। এটি আইন সমুন্নত রাখার একটি প্রক্রিয়া, যা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য শুনানির প্রয়োজন রয়েছে। এটি তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হবে বলে আমরা (এএমএলসি) আশা করছি। এ সময় আর কেউ বিরোধিতা না করলে আদালত এএমএলসিকে প্রমাণ উপস্থাপনের অনুমতি দেবেন।

কিম অং গত সোমবার এএমএলসির কাছে জমা দেন ৪৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এর আগে গত ৩১ মার্চ তিনি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার জমা দিয়েছিলেন। পরে ৪ এপ্রিল জমা দেন আরো ৮ লাখ ৩০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত কিম অংয়ের মালিকানাধীন ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজারের কাছ থেকে মোট ৯৮ লাখ ডলার পাওয়া গেছে, যা জমা আছে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বিএসপি) ভল্টে।

এদিকে রিজার্ভের অর্থ চুরির বিষয়টি নিয়ে ফিলিপাইন সিনেটের ব্লু রিবন কমিটির ষষ্ঠ শুনানি অনুষ্ঠিত হয় গতকাল। গতকালের শুনানির অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল জব্দকৃত অর্থ বাংলাদেশকে ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে জুলিয়া আবাদ বলেন, ১৫ এপ্রিল ম্যানিলা রিজিওনাল ট্রায়াল কোর্টে (আরটিসি) বাজেয়াপ্তকরণ মামলা করা হয়েছে।

এএমএলসির কাছে জমাকৃত অর্থের পাশাপাশি সংস্থার নির্দেশে জব্দ করা অর্থও এর আওতায় রয়েছে। এসব অর্থের পাশাপাশি কিম অংয়ের জব্দকৃত অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থও এ মামলার আওতায় রয়েছে। ওই অ্যাকাউন্টের স্থিতি বর্তমানে ৩ লাখ ২৫ হাজার ডলার।

জুলিয়া আবাদ জানান, এরই মধ্যে অংয়ের ফেরত দেয়া অর্থ এএমএলসির কাছে জমা রাখার অনুমোদন দিয়ে প্রভিশনাল অ্যাসেট প্রিজার্ভেশন অর্ডার (প্যাপো) জারি করেছেন ম্যানিলা রিজিওনাল ট্রায়াল কোর্ট (আরটিসি)। অংয়ের ওই অর্থ বাংলাদেশকে ফেরত দিতে শুনানির প্রয়োজন।

জমাকৃত এ অর্থ দাবি করা হবে কিনা জানতে চাইলে কিম অংয়ের আইনজীবী আর্নেস্তো তাবুজারা থ্রি বলেন, ‘না। কারণ ওই অর্থ আমাদের নয়। আমরা কেন তা দাবি করতে যাব?’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত খুব দ্রুত এ অর্থের মালিকানা দাবি করা। না হলে তা ফিলিপাইন সরকারের সম্পত্তি বলে বিবেচিত হবে।

কিম অং ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি যাওয়া অর্থের বেশকিছু অংশ গেছে দেশটির সোলেয়ার ও মাইডাস ক্যাসিনো এবং মুদ্রা রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠান ফিলরেমের কাছে। এর মধ্যে সোলেয়ারে কিছু অর্থ জব্দ অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া কিম অংয়ের একটি অ্যাকাউন্টও জব্দ করেছে এএমএলসি। ওইসব জব্দকৃত অর্থের মালিকানা পেতেও একই ধরনের বাজেয়াপ্তকরণ মামলা করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এদিকে গত ২৯ মার্চ সিনেট কমিটির দ্বিতীয় শুনানিতে সোলেয়ারের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ব্লুমবেরি রিসোর্টস করপোরেশনের প্রধান আইনি পরামর্শক সিলভারিও বেনি তান জানিয়েছিলেন, বিদেশী জাংকেট অপারেটর ডিং ঝিজের নির্দেশনায় সোলেয়ারে ১৩৬ কোটি পেসোর জুয়া খেলা হয়।

এর পর গত ১০ মার্চ তান জানান, ওই অর্থ থেকে ১০ কোটি ৮ লাখ পেসো বা ২৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার তারা জব্দ করেন। এ অর্থ হস্তান্তরের জন্য একটি যথোপযুক্ত পন্থার জন্য তারা অপেক্ষা করছেন বলেও সে সময় জানান তিনি। একই শুনানিতে চুরি হওয়া অর্থের মধ্য থেকে ৫৩ কোটি ২০ লাখ পেসো মাইডাস হোটেল অ্যান্ড ক্যাসিনোয় প্রবেশ করে বলে জানা যায়।

মাইডাসের আইনজীবী ক্যাটরিনা নেপোমুসেনো গত ২৯ মার্চ এ সম্পর্কে জানান, তাদের ক্যাসিনোয় ৫৩ কোটি ২০ লাখ পেসোর জুয়া খেলা হয়। এর মধ্যে ১১ কোটি ১০ লাখ পেসো উত্তোলন করা হয়। প্রবেশকৃত ওই অর্থ বাজেয়াপ্ত করতে মামলায় তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল তিনি বলেন, আমরা কারো কাছ থেকে সরাসরি কোনো অর্থ পাইনি।

আমরা যা পেয়েছি, তা জাংকেট সাব-এজেন্টের কাছ থেকে। ওই অর্থ অবিনিময়যোগ্য ক্যাসিনো চিপসে রূপান্তর করে এরই মধ্যে খেলা হয়ে গেছে। আর তা এরই মধ্যে চলে গেছে খরচের খাতায়।