মেইন ম্যেনু

ফুটপাথের ভিখিরি থেকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র : স্বপ্নের উড়ান যুবকের

‘‘রাতের পর রাত কাটত খোলা আকাশের নীচে। যখন বৃষ্টি নামত তখন মাথা বাঁচাতে আমরা চলে যেতাম কোনও একটা শেডের নীচে। মাঝে মাঝে পুলিশের তাড়া খেয়ে এক ফুটপাথ থেকে উঠে গিয়ে আস্তানা গাড়তাম অন্য কোনও ফু়টপাথে।’’ ভাগ্যের নাটকীয় পরিবর্তনের এ এক আশ্চর্য কাহিনি, যেখানে এক নিরন্ন ফুটপাথবাসীর জীবন থেকে সোজা সম্মানীয় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমিয়েছেন জয়াভেল নামে চেন্নাইয়ের এক যুবক।

জয়াভেলদের আদি নিবাস ছিল তামিলনাড়ুর নেল্লোরে। ১৯৮০-র দশকে গ্রামে তাঁদের সমস্ত ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সহায়সম্বলহীন অবস্থায় জয়াভেলের বাবা-মা চেন্নাইয়ে চলে আসেন জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু রোজগারের পথ প্রশস্ত হয়নি তাঁদের সামনে। বাধ্য হয়ে স্বামী-স্ত্রী ভিক্ষা করতে শুরু করেন। তাঁদের আশ্রয় নিতে হয় রাস্তার ফুটপাথে। জয়াভেলের জন্মের পর তিনিও বাবা-মার সঙ্গে ভিক্ষা করা শুরু করেন। জয়াভেল স্মৃতিচারণের ঢং-এ বলতে থাকেন সেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট শৈশবের কথা— ‘‘রাতের পর রাত কাটত খোলা আকাশের নীচে। যখন বৃষ্টি নামত তখন মাথা বাঁচাতে আমরা চলে যেতাম কোনও একটা শেডের নীচে। মাঝে মাঝে পুলিশের তাড়া খেয়ে এক ফুটপাথ থেকে উঠে গিয়ে আস্তানা গাড়তাম অন্য কোনও ফু়টপাথে।’’

অসম্ভব দারিদ্র্য তো ছিলই, পাশাপাশি অন্য সমস্যাও কম ছিল না জয়াভেলের জীবনে। জয়াভেলের বাবা যখন মারা যান জয়াভেল তখন শিশু। বাবার মৃত্যুর পরে জয়াভেলের মা নিজেকে ডুবিয়ে দেন মদের নেশায়। আর ক্রমশ এক অনিশ্চিত থেকে অনিশ্চিততর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে ছো়ট্ট জয়াভেল।

জয়াভেলের জীবনে নাটকীয় পরিবর্তন আসে ১৯৯৯ সালে। পথশিশুদের নিয়ে একটি ডক্যুমেন্টারি বানাতে গিয়ে উমা মুত্থুরামনের নজর পড়ে জয়াভেলের উপরে। তিনি তার সঙ্গে কথা বলে জয়াভেলের দুর্দশার কথা জানতে পারেন। ঘটনাচক্রে উমা চালাতেন সুয়্যাম চ্যারিটেবল ট্রাস্ট নামের একটি সংস্থা, যে সংস্থার কাজ ছিল দুঃস্থ শিশুদের সাহায্য করা। ওই সংস্থার উদ্যোগেই স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করে জয়াভেল। ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষায় অত্যন্ত ভাল ফল করে সে। ইতিমধ্যে উমার ট্রাস্টের উদ্যোগে বেশ কিছু আর্থিক অনুদান সঞ্চিত হয়ে যায় জয়াভেলের উচ্চশিক্ষার জন্য। আশায় বুক বেঁধে জয়াভেল বসে পড়েন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায়। সেই পরীক্ষায় পাশ করার পরে বর্তমানে তিনি ব্রিটেনের গ্লেন্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ে পারফর্মেন্স কার এনহান্সমেন্ট টেকনোলজি নিয়ে পড়াশোনা করছেন।

মায়ের সঙ্গে এখন আর তেমন যোগাযোগ নেই জয়াভেলের। মাসে বড়জোর একবার দেখা হয় মায়ের সঙ্গে। তাঁর মা এখনও ফুটপাথেই পড়ে রয়েছেন, মদ্যপানের নেশাও ছাড়তে পারেননি। মায়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না থাকলেও, এই ফুটপাথবাসিনী মা-ই হয়তো গোপনে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যান জয়াভেলকে— জীবনের পথে আরও এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা। নিজের অতীতটাকে মায়ের মুখেই সম্ভবত দেখতে পান জয়াভেল। আর সেই কষ্টকর অতীতই তো তাঁর এগিয়ে চলার পাথেয়। জয়াভেলের সমৃদ্ধিপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য রইল আন্তরিক অভিনন্দন ।-এবেলা



« (পূর্বের সংবাদ)