মেইন ম্যেনু

ফুটপাথে দাড়িয়ে মহামতি লেনিন

রুশ বিপ্লব নিয়ে লেখা বিখ্যাত বই ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’। বইটির লেখক জন রীড হলেও বাংলায় এর অনুবাদ করেছিলেন শ্রী ননী ভৌমিক। বিভিন্ন ভাষায় বইটি অনুবাদ হওয়ায় রুশ বিপ্লব সম্পর্কে অগুনতি মানুষের জানতে তেমন একটা সমস্যা হয়নি। সেই জার আমল থেকে চলে আসা অত্যাচার আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা অজস্র কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের জের ছিল সেই অক্টোবর বিপ্লব। রুশ বিপ্লবী ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকদের নিয়ে রচিত ওই বিপ্লব ঘুরিয়ে দিয়েছিল দুনিয়ার শাসন কাঠামোর চাকা।

বিপ্লব পরবর্তীতে যুবা কমিউনিস্টরা দেশের উন্নয়নে পূর্ণ মনোযোগ দিলেও, শিল্প-সাহিত্য বিকাশে যে তাদের ব্যাপক ঘাটতি ছিল যার প্রমাণ আমরা সহজেই দেখতে পাই।

3রুশ বিপ্লব পরবর্তীতে রুশ ভাষায় এমন একজন শিল্পী বা সাহিত্যিককে পাওয়া যায় না, যার সৃষ্টিকর্ম রাশিয়ার সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব পরিমণ্ডলে জায়গা করে নিয়েছে। ইভান তুরগেনেভ, লিও তলস্তয় এবং ফিওদর দস্তয়ভস্কির মতো সাহিত্যিকদের জন্ম এবং বিকাশও কিন্তু সেই জার আমলেই হয়েছিল। অথচ যে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে রুশ তরুণেরা অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমে এসেছিল তাদের দেশে কিভাবে শিল্প সাহিত্যের এরকম অবনতি হলো, তার অনুসন্ধান করলে আমরা সেই অক্টোবর বিপ্লবেই ফিরে যাই।

4বলশেভিকদের একচেটিয়া বিজয় রাতারাতি কমিউনিস্টদের এনে দেয়ে যেকোনো কিছু করার মান্ডেট। তরুণ কমিউনিস্টরা তাদের কমরেডদের নির্দেশ অনুযায়ী একে একে গোটা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে জার আমলের সকল স্থাপত্যকলা থেকে শুরু করে ভাস্কর্য পর্যন্ত ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। জার বিরোধীতার উন্মত্ততায় অনেক প্রাচীন মূল্যবান ভাস্কর্যও সেসময় ভেঙ্গে ফেলা হয়। আর সেই ভূলুণ্ঠিত ইতিহাসের উপর দাড়িয়ে বালির বাধের মতো ক্রমেই বাড়তে থাকে কমিউনিস্ট শাসন। কিন্তু বালির বাধ যেমন দীর্ঘস্থায়ী কোনো কাঠামো তৈরি 5করতে পারে না, তেমনি অতীতকে অস্বীকার করা লেনিনপন্থী কমিউনিস্টরাও বেশিদূর আগাতে পারেনি। একটা সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায় এবং ক্রমশ দেশটি থেকে সমাজতন্ত্র বিলুপ্ত হতে শুরু করে। আর পুতিনের আমলে মোটামুটি সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া হয়ে ওঠে পুরোপুরি পুঁজিবাদী রাশিয়া।

২০১৪ সালে ইউক্রেনের পূর্বাংশে রুশপন্থী একদল বিদ্রোহী দেশটির কাঠামোর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে বসে। জাতিগত প্রশ্নে তাদের দাবি দাওয়া নায্য থাকলেও পেছন 6থেকে রাশিয়া উস্কানি দেয়ায় স্ফুলিঙ্গ হয়ে ওঠে বিশাল আগুন। ক্রিমিয়া রাশিয়ার নিয়ন্ত্রনে চলে যাওয়ার পর সেই দ্বন্দ্ব আরও বেড়ে যায়। রাশিয়ার মদদপুষ্ট বাহিনীর সঙ্গে ইউক্রেন বাহিনীর লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ নিহত হয় এবং অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু এরই মাঝে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের মনে আসে এক পরিবর্তন। রুশ ভাষিক মানুষদের সঙ্গে সংস্কৃতিগত পার্থক্য বিরাজ করার পরেও দীর্ঘবছর ধরে ইউক্রেনবাসী তাদের দেশে সোভিয়েত আমলে নির্মিত অনেক মনুমেন্ট থেকে শুরু করে ভাস্কর্য বেশ যত্ন করেই রেখেছিল। 7এমনকি রাজধানীর বুকে দাড়িয়ে থাকা মহামতি লেনিনও বেশ দাপটেই দাড়িয়ে ছিল। কিন্তু রাশিয়ার আগ্রাসী নীতির ফলে এখন গোটা ইউক্রেন থেকেই সোভিয়েত আমলের নির্দশনগুলো নির্মম কায়দায় সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। মাত্র এক বছর আগেও যে নেতাকে শ্রদ্ধাভরে উচু আসন দেয়া হয়েছিল, আজ তাকেই ফুটপাথে ফেলে রাখা হচ্ছে হিটলারের ছবির পাশে। এযেন মহাকাল তার নিজ নিয়মে সময়ের প্রতিশোধ নিয়ে নিচ্ছে।

8ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বিভিন্ন স্থান থেকে সেখানকার জনগণই স্বইচ্ছা প্রনোদিত হয়ে সরিয়ে নিচ্ছে ওই সোভিয়েত আমলের প্রতিকৃতিগুলো। আর এনিয়ে কিয়েভবাসীর মনে নেই বিন্দুমাত্র অভিযোগ। উল্টো তাদের ভাষায়, ‘আমাদের দাদা-নানারা এর জন্য লড়াই করেছিলেন এবং আমরা সেগুলো ভেঙ্গে ফেলছি।’ এভাবেই নতুন করে ইতিহাস রচনার পথে এগিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেনবাসী।