মেইন ম্যেনু

ফের প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসছে জামায়াত!

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে শপথ নিয়ে মকবুল আহমাদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াতের নতুন আমিরের এ ধরনের বক্তব্য দলীয় কৌশল হিসেবেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে, জামায়াত ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা মনে করছেন এ বক্তব্যের মাধ্যমে অস্তিত্ব সংকটে থাকা জামায়াত আবার প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার চেষ্টা করছে।

এ ব্যাপারে বিবিসি বাংলাকে জামায়াত ঘরানার পত্রিকা দৈনিক নয়াদিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীকে অনেক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। একসময় মূলধারার রাজনীতিতে ছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু এখন দলটির যে অবস্থা তা খুব একটা স্বাভাবিক নয়। তাদের ভেতরে ভেতরে কাজ করতে হচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ইন্টারনেটভিত্তিক হচ্ছে। তারা যে সমস্যাটার মধ্যে পড়েছিল তার বড় একটা বিষয় ছিল নতুন নেতা নির্বাচন করা। সেটা তারা করেছে।

তিনি বলেন, জামায়াত ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন। এর মজলিসে সুরাই সবকিছু নির্ধারণ করে। একজন শিক্ষক হিসেবে মকবুল সাহেব শান্তশিষ্ট মানুষ, দলকে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সময়ই বলে দেবে নতুন আমির জামায়াতকে কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে তিনি জামায়াতকে আস্তে আস্তে সক্রিয় করার চেষ্টা করবেন এবং তাঁর সহযোগীরাও তাকে সাহায্য করবেন।

জামায়াতের নতুন আমির নির্বাচিত হওয়ার পর মকবুল আহমাদ যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে পরিবর্তনের সুর আছে বলে মনে করেন সালাহউদ্দিন বাবর। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের নতুন আমির দায়িত্ব গ্রহণের পর মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে দেশের সব নেতার প্রতি তিনি যেভাবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বিবৃতি দিয়েছেন সেই ধারা অব্যাহত থাকলে জামায়াত আবার সম্মুখ রাজনীতিতে চলে আসবে।’

বিবিসি বাংলার আরেক প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, দল টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে নতুন নেতৃত্ব জামায়াতের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। কিন্তু যেদিকে সবার দৃষ্টি ছিল তা হচ্ছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতৃত্ব যে ‘কলঙ্কজনক’ ভূমিকা রেখেছিল, সেখান থেকে নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে কিনা। দলের রাজনৈতিক কৌশলে কোন পরিবর্তন আসবে কিনা?

বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষক (সাবেক সচিব) শাহ আব্দুল হান্নান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নতুন আমিরের বিবৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করে। জামায়াতে ইসলামীর আমির তার বিবৃতির শুরুতেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা স্মরণ করেন।

শাহ আব্দুল হান্নান বলেন, ‘তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানিয়েছেন, সবাইকে সম্মান জানিয়েছেন। তারা যে ৭১-এ রাইট (সঠিক) কাজ করেছেন একথা কোথাও বলেন নাই। তারা শুধু বলেছেন বিচার ওনাদের মতে সঠিক হয় নাই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ নজরুল মনে করেন, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে চাপে পড়ে কিংবা বাধ্য হয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। অধ্যাপক নজরুল বলেন, ‘যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে চেঞ্জ (পরিবর্তন) না হয়, তাহলে তাদের বিশ্বাসে কতটা পরিবর্তন হয়েছে আর কতটা কৌশলগত কারণে হয়েছে, সেটা বলা মুশকিল।’

তিনি মনে করেন, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতৃত্ব যা করেছে সে ‘দায় বা কলঙ্ক’ থেকে বর্তমান নেতৃত্ব যদি মুক্তি পেতে চায় তাহলে নতুন নেতৃত্ব তাদের সামনে বড় সুযোগ এনে দিতে পারে।

অধ্যাপক নজরুল আরও বলেন, ‘যেহেতু যারা যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের সকলেরই নেতৃত্ব থেকে অপসারিত হয়েছে বা বাধ্য হয়েছে, সেজন্য তারা যদি মনে করে তারা নতুন যাত্রা শুরু করতে চায়- এটা তাদের জন্য একটা বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছে। এ সুযোগ তারা ব্যবহার করবে কিনা সেটা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না।’

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংগঠিত করতে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানী বাহিনীকে যে সহায়তা করেছে সেটি নিয়ে তাদের কোন অনুশোচনা নেই বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

অধ্যাপক নজরুল বলেন, ‘জামায়াত যদি সত্যিকার অর্থে দৃষ্টিগ্রাহ্য, গ্রহণযোগ্য কোন পরিবর্তন চায় তাহলে জামায়াতকে খুবই ফ্র্যাঙ্কলি (খোলামেলাভাবে) যুদ্ধাপরাধের ভূমিকা নিয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এটার কোনো বিকল্প নাই।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতৃত্ব যে কলঙ্কজনক ভূমিকা রেখেছে সেখান থেকে বর্তমান প্রজন্ম মুক্তি পেতে চায় কিনা তা দেখার জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার যে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্ব তাদের রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনবে। দলের সাংগঠনিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই কৌশল পরিবর্তন করা জরুরি বলে অনেকে মনে করেন।

গত ১৭ অক্টোবর জামায়াতের আমির হিসেবে শপথ নিয়ে মকবুল আহমাদ বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে সকল জনগণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অকৃত্রিম ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছি তাদের কথা আজ গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। বিশেষভাবে স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম, জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি উসমানীসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সকল অবিসংবাদিত নেতাদের আমি স্বশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি।’

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের অবস্থানকে ইঙ্গিত করে মকবুল আহমাদ বলেন, ‘অতীতের কোনো রাজনৈতিক বিষয়কে অজুহাত না বানিয়ে সকল দুঃখ, কষ্ট ও বেদনাকে ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

দেশবাসীর উদ্দেশে জামায়াতের নতুন এ আমির বলেন, জামায়াতে ইসলামী কাঙ্খিত মানের নেতৃত্ব তৈরির মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত মূলনীতি ও ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণধর্মী সমাজ বিনির্মাণের জন্য কাজ করছে। দেশের বিদ্যমান পরিবেশ পরিস্থিতিসহ আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সেই কাঙ্খিত জনকল্যাণমূলক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে জামায়াত তার রূপকল্প হিসাবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। ইনশাআল্লাহ যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আমরা গভীরভাবে আশাবাদী।’খবর দ্য রিপোর্টের।