মেইন ম্যেনু

ফেসবুকে পরিচয়: অতঃপর রাতভর ধর্ষিত দুই স্কুল ছাত্রী

মায়ের অনুপস্থিতিতে বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল নবম শ্রেণির ছাত্রী। দিদিমাকে বলেছিল, বান্ধবীর বাড়ি যাচ্ছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে আসবে। কিন্তু রাত গড়ালেও ফেরেনি মেয়ে। অবশেষে কলকাতার বাঁশদ্রোণী থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন মা। তার পরেও সারা রাত খোঁজ মেলেনি ওই কিশোরীর। পরদিন সকালে অবশ্য মেয়ে ফিরে আসে বাড়িতে। তবে ধুঁকতে ধুঁকতে, বিধ্বস্ত চেহারায়।
কোথায় ছিল সে সারা রাত?

জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ওই কিশোরী মাকে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ফেসবুকে পরিচিত এক বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বেরিয়েছিল সে। সঙ্গে ছিল পাড়ার এক বান্ধবীও। পরে সেই বন্ধুই আরও তিন জনকে সঙ্গে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করেছে। শ্লীলতাহানি করা হয়েছে তার বান্ধবীরও। এর পরেই ওই কিশোরীর পরিবার থানায় গিয়ে মেয়ের ধর্ষণের অভিযোগ জানায়।

পুলিশ জানায়, তদন্তে উঠে আসে অনীক ভট্টাচার্য নামে এক তরুণের কথা। নিউ আলিপুরে তার বাড়িতেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে অভিযোগ।

কে এই অনীক? পুলিশ জেনেছে, শুধু ওই রাতেই নয়, অনীকের ফ্ল্যাটে মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে চলত বন্ধু-বান্ধবীদের আড্ডা। অনীকের মা-ও বলেছেন, ওই দিন গভীর রাতে অনীকের ঘরে বন্ধুদের দলে ওই মেয়েদের তিনি দেখেছেন। তাঁকে ওই মেয়েরা ‘গুড নাইট’ও জানায়।

অনীক ওই এলাকারই এক স্কুলের ছাত্র। পরিবার সূত্রে খবর, গত বছর সে উচ্চ মাধ্যমিকে অকৃতকার্য হয়। তার আগের বছর শরীর খারপ ছিল বলে পরীক্ষা দিতে পারেনি। এই বছর ফের উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েছে। পরীক্ষার পরে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘোরাঘুরি, আড্ডা বেড়ে গিয়েছে বলে জানান অনীকের মা। অনীকের বাবা পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি জানিয়েছেন, তাঁরা ওই এলাকার পুরনো বাসিন্দা।

ছেলের অনেক বান্ধবী আছে বলেও জানালেন অনীকের বাবা-মা। অনীকের মা জানালেন, তাঁরা নিউ আলিপুরের ওই বাড়ির দোতলা ও তিনতলার দু’টি ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন। দোতলায় স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে থাকেন তিনি। তিনতলায় থাকেন তাঁর বৃদ্ধ মা-বাবা। মা-বাবা এখন শহরে নেই। তাই তিনতলার ফ্ল্যাট ফাঁকা। ঘটনার রাতে অনীক বন্ধুদের নিয়ে ওই ফ্ল্যাটেই ছিল। অনীকের মা বলেন, ‘আমাদের তিনতলার ফাঁকা ফ্ল্যাটেই ওরা রাত জেগে আড্ডা দিত। কখনও খারাপ কিছু টের পাইনি।’

তবে ওই কিশোরীর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে শুক্রবার অনীককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধরা হয়েছে তার তিন বন্ধুকেও। ধৃতদের মধ্যে অনীক ও সঙ্কেত ঘোষ তরুণ, বাকি দু’জন নাবালক। শনিবার ধৃতদের আলিপুর দায়রা আদালতে হাজির করা হলে অনীক ও সঙ্কেতকে পুলিশি হাজতে পাঠানো হয়েছে। দুই নাবালকের ঠাঁই হয়েছে জুভেনাইল হোমে। ওই দুই কিশোরীকেও একটি হোমের আশ্রয়ে পাঠিয়েছে আদালত।

পুলিশ সূত্রে খবর, কিছু দিন আগে অভিযুক্ত এক কিশোরের সঙ্গে অভিযোগকারিণী কিশোরীর আলাপ হয়। বৃহস্পতিবার ওই অভিযুক্ত কিশোরই ফোন করে কিশোরীকে কলকাতার রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনের যেতে বলে। সেই মতো ওই কিশোরী এক বান্ধবীকে নিয়ে রবীন্দ্র সরোবর স্টেশনে যায়। ওই কিশোরী পুলিশকে জানিয়েছে, রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনে ওই কিশোরের বদলে অনীক হাজির হয়। পরে আসে সঙ্কেতও।

পুলিশ জানায়, অনীক ও সঙ্কেতের সঙ্গে ওই দুই কিশোরী রবীন্দ্র সরোবর লেকে যায়। সেখানেই অন্য দুই অভিযুক্ত এসে যোগ দেয়। পরে ওই ছ’জনে অনীকের বাড়ি যায়। ওই ফ্ল্যাটি অন্য কেউ ছিল না। অভিযোগ, ওই বাড়িতে গিয়ে অভিযোগকারিণীর বান্ধবীকে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। অন্য একটি শোয়ার ঘরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয় ওই কিশোরীকে। ওই কিশোরীর বিবস্ত্র অবস্থায় ছবিও তোলা হয় বলে অভিযোগ।

কিশোরী পুলিশকে জানিয়েছে, সারা রাত তাদের দু’জনকে ওই বাড়িতে আটকে রাখা হয়। শুক্রবার ভোরে তাদের রবীন্দ্র সরোবর মেট্রোর সামনে ছেড়ে দেয় অভিযুক্তেরা। ধর্ষণের কথা বাড়িতে জানালে ওই কিশোরীর ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।

পুলিশ জানায়, কিশোরীকে নিয়ে পুলিশ প্রথমে অনীকের বাড়িতে হানা দেয়। তাকে ও অভিযুক্ত এক নাবালককে ধরার পরে নারকেলডাঙা থেকে সঙ্কেত ও ঠাকুরপুকুর থেকে আরও এক নাবালককে ধরা হয়। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তেরা ফেসবুকে ফাঁদ পেতে ওই কিশোরীকে ফাঁসায়। তদন্তকারীরা বলছেন, বাকি অভিযুক্তেরাও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের। তিন জন এখনও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্র। পুলিশের দাবি, ওই অভিযুক্তেরা প্রায়ই গাড়ি নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। সঙ্কেত ও অনীককে প্রায়ই রাতে লেক এলাকায় দেখা যায়।

শনিবার আলিপুর দায়রা আদালতে অভিযুক্তদের হাজির করার সময়ে সঙ্কেতের দাদু এবং অন্য দুই নাবালকের মা ছিলেন। নাবালকদের পরিবারের দাবি, অভিযোগকারিণীর সঙ্গে তাঁদের ছেলেদের বন্ধুত্বের কথা জানতেন। মেয়েটিকে আগেও দেখেছেন তাঁরা। দুই অভিযুক্ত নাবালকের পরিবারই ছেলেদের ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করে। তবে নাতির এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ সঙ্কেতের দাদু। তিনি বলেন, “নাতি অনেক দিন আগেই বখে গিয়েছিল। ওর বাবা-মা এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়নি।” এ দিন নাতির হয়ে কোনও আইনজীবীও নিয়োগ করেননি ওই বৃদ্ধ।

নিউ আলিপুরের পি ব্লকে নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অনীকের মা দাবি করেছেন, তাঁর ছেলেকে ফাঁসানো হচ্ছে। ওই মহিলার দাবি, বৃহস্পতিবার রাত একটা নাগাদ তিনতলার ফ্ল্যাটে গিয়ে ওই দুই কিশোরীকে দেখেছিলেন তিনি। যদিও প্রশ্ন উঠেছে, এত রাতে ছেলের ঘরে দুই কিশোরীকে দেখেও অনীকের মা কেন তাদের বাড়ি চলে যেতে বলেননি? বাড়ি যাওয়া সম্ভব না হলে কেন তাদের নিজের ঘরে নিয়ে যাননি? অনীকের মায়ের উত্তর, “এ রকম আড্ডা মাঝেমধ্যেই হত। তাই সে রকম অস্বাভাভিকতা টের পাইনি।” অনীকের বাবা জানান, তিনি ওই রাতে দেরিতে ফিরেছিলেন। কিছুই জানতেন না। তাঁর মন্তব্য, ‘এটি চক্রান্ত।’তথ্যসুত্র-অনলাইন