মেইন ম্যেনু

ফেসবুক পোস্টটি না দিলে দেশে ফেরা হতো না আরুর

আরফুনা আরু তার স্বামী মঈনুদ্দিন হাসান ও শিশু সন্তান আরিসা হাসানকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে যান থাইল্যান্ডে। সেখানে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে টাকা-পয়সা, কাগজপত্র এমনকি পাসপোর্টসহ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। উপায় না দেখে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের শরণাপন্ন হন।

কিন্তু দূতাবাস ছুটির অজুহাত দেখিয়ে সাহায্য করতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। অবশেষে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন আরফুনাসহ তার পরিবার।

জানা যায়, গত ১৭ মার্চ বেড়ানোর জন্য সপরিবারে থাইল্যান্ডে যান আরফুনা আরু। ২৭ মার্চ দেশে ফেরার কথা। পাতায়া ও ফুকেট ঘুরে শেষে ব্যাংককে এসে সুকুম্বি নামক এলাকার সমস হোটেলে ওঠেন। দেশে আসবেন বলে টাকা-পয়সাও তেমন একটা আর রাখেননি। হোটেল ভাড়া আগেই পরিশোধ করা ছিল। যা টাকা পয়সা ছিল তা দিয়ে শপিং করার জন্য পাতুনাম মার্কেটে যান। শপিং শেষে একটি টুকটুক (টেক্সি) ভাড়া করে হোটেলে ফিরছিলেন। পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেলে করে আসা দুজন যুবকের একজন আরফুনার স্বামীর হাতে থাকা ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।

টুকটুকওয়ালা ও আশপাশের লোকজন চিৎকার করলেও ওই দুই যুবককে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ‘অন্তত পাসপোর্টগুলো দিয়ে যাও’ আরফুনার এমন চিৎকারেও কোনো লাভ হয়নি। অসহায় অবস্থায় শুধু তাকিয়েই থাকেননি। নিরুপায় হয়ে রাস্তায় রাস্তায় কেঁদেছেন, তবুও মেলেনি তার পাসপোর্ট। অসুস্থ মেয়ে শিশুকে নিয়ে সহায়তা চেয়েছেন অনেকের কাছে।

এরপর হোটেলে গিয়ে ওঠেন। হোটেলের মালিক সবকিছু শুনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। নগদ টাকা তুলে দেন না খেয়ে থাকা শিশু সন্তানের জন্য। কোনো প্রকার সমস্যা হবে না, তাদের এমন আশ্বাসও দেন।
হোটেলে বসেই ‘ম্যাজিস্ট্রেটস অল এয়ারপোর্টস বাংলাদেশ’ নামে ফেসবুক পেজে ছোট একটি পোস্ট দেন। যাচাইবাছাই করে ইউসুফ আলী নামের একজন ম্যাজিস্ট্রেট সেই পেজে সহায়তার জন্য অনুরোধ করেন ফেসবুক বন্ধুদের।

সেই পেজের পোস্টটি ছিল, ‘আরফুনা আরুর সাময়িক বিপদে নিশ্চয়ই থাইল্যান্ডে অবস্থানরত সহৃদ যে কেউ এগিয়ে আসবেন। থাইল্যান্ডে বেড়াতে গিয়ে একটু আগে ওনার পাসপোর্টসহ টাকা-পয়সা ছিনতাই হয়েছে। তার পাঁচ বছরের বাচ্চাটি না খেয়ে আছে।’ পোস্টে আরফুনার লোকেশন ও মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়।
এই পোস্ট দেখার পর অনেকেই এগিয়ে আসেন। কেউ টাকা পাঠাতে চেয়েছেন। কেউ পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ সরাসরি গিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছেন। পোস্টটি দেখার পর বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে থাইল্যান্ডে থাকা বাংলাদেশের দূতাবাসের লোকজন সহায়তা করেন। সবশেষে নির্ধারিত সময় ২৭ মার্চ বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দর হয়ে দেশে ফিরে আসেন আরফুনা ও তার পরিবার।

দেশে নেমেই ‘ম্যাজিস্ট্রেটস অল এয়ারপোর্টস বাংলাদেশ’ নামের ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন আরফুনা। সেখানে লেখেন, ‘আমি অবশেষে চিটাগাংয়ে এসেছি। আমি শেষ সেকেন্ডও জানতাম না যে, আমি আজ ফিরতে পারব কি না। কিন্তু আপনাদের, শুধু আপনাদের জন্য, আমি আজ দেশে ফিরতে পেরেছি। ধন্যবাদ অনেক ছোট একটা শব্দ, আমি কি করে আমার এই অনুভূতি প্রকাশ করব, আমার জানা নেই।

দূতাবাস আমাদের জন্য অনেক অনেক করেছে। আমি সারা জীবন মনে রাখব আপনাদের এ সাহায্য।’
এরপর ওই পেজের কর্ণধার ম্যাজিস্ট্রেট ইউসুফ আলী রিপ্লাই স্ট্যাটাস দেন, ‘অবশেষে আরফুনা আরু পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইটে একটু আগে (বিকেল ৫টায়) নিরাপদে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। ইস্টার-সানডের বন্ধের মধ্যেও দূতাবাস বিশেষ ব্যবস্থায় তার ট্রাভেল ডকুমেন্ট ইস্যু করে পূর্বের ফ্লাইটেই আসা নিশ্চিত করেছে।

বিপদটা হয়তো ছোট এবং সাময়িক ছিল। কিন্তু বিদেশ-বিভুঁইয়ে অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতির কারণে অনেক ছোট বিপদও বড় হয়ে দাঁড়ায় . . .যাতে না পড়লে বোঝা দায়।

এ পেইজের সম্মানিত ফলোয়ার (পড়ুন অংশীদার), একটি সংস্থা এবং এম্বাসি যেভাবে এমপ্যাথিটিক্যালি (সিমপ্যাথিটিক্যালি নয়) এগিয়ে এসেছেন, তাতে আবারো প্রমাণিত হয় যে আমরা সবাই এক মায়েরই সন্তান. . . বাঙলা মা! আরফুনা আরু এবং তার ছোট্ট শিশুটির পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ এবং আমাদের পক্ষ থেকে অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা।’

আরফুনা আরু একটি জানিয়েছেন, ‘পোস্ট দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, জার্মান, চীন, বাংলাদেশ, মালয়শিয়া, অষ্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশ থেকে অনেকে ফোন করেছেন। তারা বলেছেন, আপু কীভাবে টাকা পাঠাবো বলেন। বাঙালিরা যে একজন নারীর বিপদে এত বেশি এগিয়ে আসবে, তা ভাবতেও পারিনি। এটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। হোটেলওয়ালা ব্রিটিশ হওয়ার পরও সব ধরনের চার্জ বাদ দিয়েছেন। নগদ টাকা তুলে দিয়েছেন। বলেছেন, কোনো সমস্যা নেই। এম্বাসির লোকজন প্রথমে না এলেও বন্ধের দিনে পরে তারা এগিয়ে এসেছেন। আমি কাউকে দেখিনি, কাউকে চিনিও না। এরপরেও কীভাবে যে তারা এগিয়ে এসেছেন! তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো উপকারের সুযোগ থাকলে আমিও এগিয়ে আসব।’

ম্যাজিস্ট্রেট ইউসুফ আলী বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে সহায়তার জন্য একটি ম্যাসেজ করা হয়েছে। এতেই কাজ হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত থাকবে। মানুষ তো মানুষের জন্যই . . .।’রাইজিংবিডি