মেইন ম্যেনু

বছরজুড়ে বর্বর আইএস, পেয়েছে যা হারিয়েছে তারও বেশি

২০১৫ সালটি ছিল ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সবচেয়ে বর্বরতার বছর। বিভিন্ন স্থানে হামলার হুমকি এবং দায় স্বীকার করে আলোচনায় উঠে আসে আইএস। বিশেষ করে প্যারিস হামলা, জাপানি বন্দীদের শিরোশ্ছেদ, জর্দানের পাইলটকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা, মার্কিন নাগরিক কায়লা মুলারকে হত্যার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে বছরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক এ জঙ্গি সংগঠনটি। আর বছরজুড়েই আইএসের কর্মকাণ্ডকে নৈতিকতাবিরোধী বলে জানিয়ে দেয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম সম্প্রদায়। এছাড়া নিজেদের বিস্তারে গত বছরের চেয়ে এবার বেশি কিছু হারিয়েছে সংগঠনটি।

নিজেদের সুন্নীপন্থী দাবিকারী এ সন্ত্রাসী সংগঠনটি গত মে মাসে ইরাকের রামাদি ও পরে ঐতিহ্যবাহী পালমিরা শহরের দখল নেয়।

তবে, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন সাবেক পরামর্শক বলেছেন, ২০১৪ সালে আইএস মসুল, তিকরিতসহ বেশ কিছু অঞ্চল দখল করে। ২০১৪ সালটি যদি হয় তাদের অর্জনের বছর, তাহলে ২০১৫ সালটি তাদের হারানোর বছর। আগের দখলকৃত অনেক অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি তারা। এছাড়া এ বছর তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০১৫ সালে আইএসকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হয়েছে।আর ইরাক ও সিরিয়ায় নতুন অঞ্চলেও আধিপত্য বিস্তার করতে দেয়া হয়নি আইএসকে। পশ্চিমা বিভিন্ন শক্তির সহায়তায় তাদেরকে প্রতিহত করছে কুর্দি যোদ্ধারা। আইএসের খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, বিশেষ করে সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমান হামলা জোরদারের পর থেকে তাদের স্বপ্ন দিনকে দিন আরো ফিকে হতে শুরু করেছে।

তবে, এদতসত্বেও আইএস এখনো ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তৃর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। পশ্চিমা শক্তি ও রাশিয়া আইএসের বিরুদ্ধে বিমান হামলায় বিলিয়ন ডলার ব্যয় করলেও ফালুজা, রামাদি, মসুল, রাক্কা এবং পালমিরার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহর এখনো আইএসের নিয়ন্ত্রণে আছে।

বিশ্বের বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের উপর নজর রাখে ’আইএইচএস জেইন’স টেররিজম এন্ড ইনসারজেন্সি সেন্টার’।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ম্যাথু হেনম্যান বলেন, নতুন করে কোনো অঞ্চলে আইএসের প্রাধান্য বিস্তারের সুযোগ না দিয়ে এখন যেসব অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে, সেখানে তাদেরকে দুর্বল করা গেলে সফলতা পাওয়া যাবে।

তার মতে, ২০১৫ সালে আইএস আন্তর্জাতিক শক্তি দ্বারা শক্ত হামলার লক্ষবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তবে হেনম্যান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইরাক ও সিরিয়া থেকে যদি আইএসকে উচ্ছেদ করাও যায়, তাহলে তারা বিশ্বের অন্য কোথাও জড়ো হতে পারে।

এছাড়া ২০১৫ সালে আইএসের মধ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার বাইরে গিয়ে হামলা পরিচালনার প্রবণতা দেখা গেছে। এটি তাদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের একটি উপায়। তারা প্রমাণ করতে চাইছে, শুধু ইরাক বা সিরিয়া নয়, পৃথিবীর যে কোনো স্থানেই হামলা চালাতে সক্ষম তারা, বলেন হেনম্যান।

তিউনিসিয়া, ফ্রান্স ও ইয়েমেনে বড় ধরনের হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস। মিসরে রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায়ও দায় স্বীকার করেছে আইএস। ওই বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ২২৪ জন নিহত হয়েছেন।

হেনম্যান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আইএসের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, যে কোনো স্থানে হামলা চালাতে সক্ষম তারা এবং মানুষজন ভাবতে বাধ্য হচ্ছে যে, কোথাও নিরাপদে নেই তারা।

তবে আইএসের এসব হামলার একটা সাধারণ বার্তা আছে বলে মনে করেন হেনম্যান। তিনি মনে করেন, আইএস এটা প্রমাণ করতে চায় যে, তাদের উপর হামলার জন্য হামলাকারীকে পস্তাতে হবে।

তিনি বলেন, আইএস একই সাথে সাপও মারতে চাইছে আবার লাঠিও ভাঙতে চাইছে না। বিদেশিদের উপর হামলা করে তারা যেমন শত্রুকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে একই সাথে নিজের সমর্থকদের মনেও আত্নবিশ্বাসের যোগান দিচ্ছে।

তার মতে, বিদেশিদের উপর হামলার আরেকটা ‍উদ্দেশ্য হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বে একটা সংঘর্ষের সূত্রপাত করা এবং সেটিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিত্তি হিসেবে প্রমাণ করা। এক কথায় তাদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে আধুনিক সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেয়া।

জর্দানের পাইলটকে হত্যা করার মাধ্যমে আইএস আম্মানকে নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত করেছে। রাশিয়ার বিমান ভূপাতিত করার পর রাশিয়া এখন আইএসের বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বিমান হামলা চালাচ্ছে। প্যারিসে হামলার পর ফ্রান্সও আইএসের বিরুদ্ধে হামলা আরো জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালাবে, প্যারিস হামলার পর তারা এখন এ সিদ্ধান্তে আরো বদ্ধ পরিকর। পশ্চিমের অন্যান্য দেশও পর্যায়ক্রমে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে।

এসব এটাই প্রমাণ করে যে, আইএস বিশ্বের জন্য এখন অনেক বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এখনো আইএস হুমকি দিয়ে অডিওবার্তা পাঠাচ্ছে। সম্প্রতি গংগঠনটির নেতা আবুবকর আল বাগদাদী এক অডিও বার্তায় বলেছেন, আই্‌সের বিরুদ্ধে বিমান চামলা চালানোর ফলে তারা অারো শক্তিশালী হয়েছে।

আএইসের শক্তির মূল উৎস তেল বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আইএস এখনো বেশ শক্ত অবস্থানেই আছে এবং বিশ্বব্যাপী নিজেদের অদম্য প্রচার করে যাচ্ছে।