মেইন ম্যেনু

বদমেজাজি পুলিশ খোঁজা হচ্ছে

নিরীহ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় এবং নির্যাতন চালানোর কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলার পর পুলিশ বাহিনীতে এখন বিশেষ অভিযান চলছে। দেশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত উচ্ছৃঙ্খল ও বদমেজাজি পুলিশ সদস্যদের খুঁজে বের করার কাজে নেমেছেন গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যে এ রকম সহস্রাধিক পুলিশ সদস্যের খোঁজ মিলেছে। তাঁদের তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বলা হয়েছে, এই উচ্ছৃঙ্খল ও বদমেজাজি পুলিশ সদস্যরা রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তাঁরা কারো কথা মানছেন না। একের পর এক অপকর্ম ঘটিয়ে চলেছেন। আর তাঁদের কারণে গোটা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই সুপারিশ এসেছে, দ্রুত তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বা কাউন্সেলিং করিয়ে সারিয়ে না তুললে পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা বলে কিছু থাকবে না। এরই মধ্যে কয়েকটি জায়গায় এ ধরনের কাউন্সেলিং শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বেপরোয়া পুলিশ সদস্য খোঁজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা। খোঁজা শেষ হলেই শুরু হবে পুলিশে শুদ্ধি অভিযান।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘পুলিশের উচ্ছৃঙ্খল ও বদমেজাজি হওয়ার কারণ রাজনৈতিক। নেতাদের আশকারা পেয়ে দিন দিন পুলিশের অসাধু সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। অপরাধ করার পর তদন্ত চলাকালে যখন পুলিশপ্রধান পুলিশের পক্ষে কথা বলেন তখন তদন্ত কী রকম হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। পুলিশের এসব ধারাবাহিক অপরাধের পেছনে ঊর্ধ্বতন কারো কারো ইন্ধন আছে বলে আমার মনে হচ্ছে।’ পুলিশে যেসব বদমেজাজি বা উচ্ছৃঙ্খল সদস্য রয়েছেন তাঁদের কাউন্সেলিং বা প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে পুলিশ সদস্যরা কিন্তু খারাপ থাকেন না। তাঁরা যখন মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে পুলিশে যোগ দেন, সেই টাকা তোলার জন্য তাঁরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, যেসব ‘উচ্ছৃঙ্খল ও বদমেজাজি’ পুলিশ সদস্য সংস্থার বদনাম রটাচ্ছে, তাঁদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে সিভিল টিমের অভিযান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করে কেউ যদি সাদা পোশাকে অভিযানে যায়, তাহলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, গুটিকয়েক পুলিশের জন্য পুরো বাহিনীকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না। পুলিশ অনেক ভালো কাজও করছে।

গত বুধবার রাতে পুলিশে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) মোখলেছুর রহমান একটি বেসরকারি টেলিভিশনে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, পুলিশ সদস্যদের আচার-আচরণে পরিবর্তন আনার জন্য কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু স্থানে শুরু হয়ে গেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে পুলিশ দিয়ে তদন্ত করলে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়। অন্য কাউকে দিয়ে করলে অভিযুক্তদের ওপর অবিচার করা হবে। পুলিশকে আলাদাভাবে দেখলে হবে না। সমাজকেও বদলাতে হবে।

সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন অনেকে। গত ৯ জানুয়ারি রাতে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক গোলাম রাব্বিকে আটক করে ইয়াবা ব্যবসায়ী বানিয়ে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন এসআই মাসুদ শিকদারসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। ১০ জানুয়ারি মাসুদ শিকদারকে প্রত্যাহার করা হয়। গঠন করা হয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি। পরে তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়। এসআই মাসুদ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় কর্মরত। সবাই তাঁকে ‘পাগলা মাসুদ’ বলে জানে। নানা কায়দায় তিনি পথচারীদের আটকে টাকা আদায় করে আসছিলেন।

গত ১৫ জানুয়ারি মীরহাজিরবাগ এলাকায় ডিএসসিসির পরিদর্শক বিকাশ চন্দ্র দাসকে আটকে মারধর করে পুলিশ। বিকাশের স্বজনরা অভিযোগ করেন, যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আকাশ, মনোজসহ চারজন বিকাশকে বিনা কারণে মারধর করেন। জানা যায়, এসআই আকাশ চাকরিতে আসার আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। পুলিশে চাকরি নিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার কথাই শুনতেন না তিনি।

বরিশাল, রাজশাহীসহ কয়েকটি স্থানে এ ধরনের আরো ঘটনা ঘটে। গোয়েন্দারা এ পর্যন্ত যে সহস্রাধিক বেপরোয়া পুলিশ সদস্যের খোঁজ পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার এসআই মোক্তার হোসেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ—আসামি ধরার নামে নিরীহ লোকজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও তাঁর আঁতাত রয়েছে। এলাকায় তিনি ‘উগ্র মোক্তার’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই থানায় কর্মরত আছেন। অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এসআই মোক্তার বলেন, ‘ভালো কাজ করলেই অভিযোগ আসে। আমি কারো সঙ্গে আপস করি না। অভিযোগগুলো মিথ্যা। প্রতিপক্ষ গ্রুপ এসব রটাচ্ছে।’

একই থানার ওসি অবনী শংকর কর, এসআই জসিম উদ্দিন, পরিমল, এসআই দ্বীপের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। নারী নির্যাতনের অভিযোগে ওসি অবনী শংকরসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। অবনী শংকর কর বলেন, ‘মামলার ব্যাপারে কোনো কথা বলব না। তবে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। থানার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসা মাত্র তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

এসআই দ্বীপ বলেন, ‘উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে আমি পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছি। সততার সঙ্গে কাজ করে আসছি। এলাকায় যদি ভোট নেওয়া হয় তাহলে একজন ভালো পুলিশ অফিসার হিসেবে আমি ৯৯ ভাগ ভোট পাব।’

নরসিংদীর মনোহরদী থানার এসআই আবদুল লতিফের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও জুয়ার আসর থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে এসআই লতিফ বলেন, ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। ভালো কাজ করলেও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। এলাকায় মাদক ব্যবসা নির্মূল করতে নানাভাবে কাজ চালিয়ে আসছি। আজও (গতকাল) এক মাদক ব্যবসায়ীকে ধরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে। আমার কারণে ডাকাতরা আতঙ্কে আছে।’

গত ৮ ডিসেম্বর ঢাকার মিরপুরের ব্যবসায়ী শামসুজ্জোহা ফরহাদকে পুরনো একটি মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে দুই লাখ ৮৫ হাজার টাকা আদায় করেন ডিএমপির রূপনগর থানার এসআই ফিরোজ ওয়াহিদ ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মিজান। মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে এখনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ প্রসঙ্গে তাঁরা কোনো কথা বলতে চাননি। ২০১৩ সালের ২৭ জুলাই রাতে যাত্রাবাড়ীতে ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুনকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ডাকাতি ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা দেয় পুলিশ। টানা ছয় মাস কারাভোগের পর জামিনে বের হন তিনি। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি রফিকুল ইসলাম ও এএসআই আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা সামসুজ্জামান বাবুল পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ওসি রফিকুল এখন রংপুর রেঞ্জে কর্মরত। ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি রাজশাহীর বোয়ালিয়া মডেল থানার পুলিশ মোহাম্মদ সোহেল নামের এক যুবককে আটক করে। পরে ওই থানার তৎকালীন ওসি জিয়াউর রহমান মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সোহেলকে ছেড়ে দেন। জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পালনকালে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আঁতাত থাকার অভিযোগও রয়েছে বলে গোয়েন্দারা সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছেন।

আরো যাঁদের উচ্ছৃঙ্খল ও বদমেজাজি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার ওয়ারী থানার এসআই খালেক, জালাল মণ্ডল, ওমর ফারুক, যাত্রাবাড়ী থানার এসআই সুমন ও এআসআই জামাল, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার এসআই নজরুল, তৌহিদ, এএসআই ফরিদ, শ্যামপুর থানার এসআই স্বপন, তুষার, কদমতলী থানার এএসআই এনায়েত, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সুবেদার জামাল, চাঁদপুর সদর থানার এসআই শামীম আহমেদ, শাহরাস্তি থানার এসআই দেলোয়ার হোসেন, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার এসআই জাহাঙ্গীর আলম, কোতোয়ালি থানার এএসআই আবদুল কাদির, এসআই ফজর বিশ্বাস, কোতোয়ালি থানার সাবেক ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সুদীপ কুমার দাস, বর্তমান ওসি মহিউদ্দিন সেলিম, এসআই হারুনুর রশীদ, পাঁচলাইশ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাস, চান্দগাঁও থানার ওসি বাবুল ভৌমিক, পাঁচলাইশ থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আজিজ আহমেদ, বাকলিয়া থানার সাবেক ওসি নুরুল আবছার, কোতোয়ালি থানার এএসআই আবদুল কাদির, এসআই ফজর বিশ্বাস, এসআই মো. আলী, পাঁচলাইশ থানার এসআই উৎপল বড়ুয়া, কোতোয়ালি থানার এসআই মোহাম্মদ আলী, মিরসরাই থানার ইন্সপেক্টর ইমতিয়াজ ভুইয়া, সিরাজগঞ্জ সদর থানার এসআই শরিফুল ইসলাম, এসআই বদিউজ্জামান, এসআই ফারুক হোসেন, এসআই আবু সাদাত, এসআই বারিক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার এসআই আইনউদ্দিন, এসআই সাইদুর রহমান, ইন্সপেক্টর মো. মিজানুর রহমান, এসআই মো. শাহীন, এসআই মো. রজব, নাটোর সদর থানার কনস্টেবল মো. ফারুক হোসেন, এসআই মো. আলাউদ্দিন, রাজশাহীর বোয়ালিয়া মডেল থানার এএসআই মো. জাহিদুল ইসলাম, রাজপাড়া থানার ওসি রেজাউল করিম, আরএমপির সার্জেন্ট মো. হাসান, এসআই মো. নজরুল ইসলাম, কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার এসআই মো. কামাল, মনোহরগঞ্জ থানার ওসি মো. হারুনুর রশীদ, বুড়িচং থানার এসআই মো. মনির হোসেন, এসআই মো. নাজমুল, এএসআই নাসির পাটোয়ারী, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ওসি মো. শওকত হোসেন, কুমিল্লা সদরের ডিবির এসআই মো. সোহেল, এসআই মো. ইকবাল, এসআই মো. সোহেল, কোতোয়ালি থানার ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ, এসআই সালাউদ্দিন আহমেদ, এসআই জসিম উদ্দিন, কোতোয়ালি থানার এসআই মো. হারুন, এসআই জসিম উদ্দিন প্রমুখ।

সূত্র জানায়, পুলিশের সুনাম ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সদর দপ্তর নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বেপরোয়াদের চিহ্নিত করার পর শুদ্ধি অভিযানে থাকবে—দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা একই স্থানে থাকছেন তাঁদের অন্যত্র বদলি করা, যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তা দ্রুত তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া, কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে আচার-আচরণ পরিবর্তন করা, বদমেজাজি বা উগ্র সদস্যদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের কী ধরনের যোগসাজশ তা অনুসন্ধান করা এবং দুর্নীতিবাজ সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।

পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, খারাপদের পুলিশ বাহিনীতে স্থান হবে না। ধৈর্য ধরে দেশের খেদমত করতে হবে। সম্প্রতি পুলিশ যেসব অপরাধমূলক কাজ করেছে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিছু পুলিশ সদস্যের কারণে পুরো বাহিনীকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান তিনি।-কালেরকণ্ঠ