মেইন ম্যেনু

বনের মোষ তাড়াতে সাবধান

সমাজে কিছু মানুষ আছে, যারা আমাদের মতো সাধারণ নয়। তারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়। তারা মোষগুলো তাড়ায় বলেই আমরা নাকে তাল দিয়ে আরামে ঘুমাই, যাপন করি গ্লানিমুক্ত জীবন। আর ঘুম থেকে উঠে বলি, এদের পাগলামি যে কখন থামবে। আরিয়ান আরিফ তেমনই এক মোষ তাড়ানো বাহিনীর সর্দার। বন্ধু-বান্ধবরা মিলে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়, আর পথ থেকে টোকাই শিশুদের তুলে আনে, পড়াশোনা করায়, ভালো খাওয়ার আয়োজন করে। একটা সংগঠনও করেছে, নাম অদম্য ফাউন্ডেশন। একটা স্কুল চালায়, নাম মজার ইশকুল। তারা রাস্তা থেকে টোকাই শিশুদের এনে পেটপুরে খাইয়ে দেয়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বটে, তবে প্রচলিত এনজিও’র মতো ধান্দা হয়ে উঠতে পারেনি এখনও। অদম্য ফাউন্ডেশন বা মজার ইশকুল পুরোটাই স্বেচ্ছাশ্রম, অদৃশ্য কোনো উৎস থেকে কোনো ফান্ড আসে না। কষ্টে-সৃষ্টে তারা রাজধানীর বনশ্রীতে বাসা ভাড়া নিয়ে একটি শেল্টার হোম বানিয়েছে। সেখানে ১০ জন শিশুর থাকা-খাওয়া, পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে। যে শিশুরা সেখানে থাকে, তারা স্নেহে-মমতায় আরামেই খাকে। কিন্তু হঠাৎই সব ওলটপালট হয়ে গেল। এই ১০ শিশুর একজন মোবারকের চাচা মনির পুলিশে অভিযোগ করল, বনশ্রীর একটি বাসায় তার ভাতিজাসহ ১০ শিশুকে আটকে রাখা হয়েছে। পুলিশ গিয়ে ১০ শিশুসহ চার স্বেচ্ছাসেবীকে ধরে নিয়ে এলো। অদম্য বাংলাদেশের সভাপতি আরিফ ছাড়াও গ্রেপ্তার হলো সাধারণ সম্পাদক জাকিয়া সুলতানা, দুই কর্মকর্তা হাসিবুল হাসান সবুজ ও ফিরোজ আলম শুভ। থানায় মামলা হলো। তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের শক্ত অভিযোগ। জামিন তো হলোই না, উল্টো রিমান্ড হলো। ফলে যা হয় পুলিশ রিমান্ডে তাদের ওপর নির্যাতনও হলো। এসবই সাধারণ ঘটনা। শিশুদের আটকে রাখার ঘটনা ঘটে, পরে পাচার করা হয়।

আমরা প্রায়শই এ ধরনের ঘটনা কাভার করি। আবার ভুলেও যাই। কিন্তু এই ঘটনাটি ভোলা গেল না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। অনেকেই আমাকে ইনবক্স করলেন, দেখেন তো এই বাচ্চাগুলোর জন্য কিছু করা যায় কিনা। প্রথমে আমি পাত্তা দেইনি। পরে একাধিকজনের অনুরোধে খোঁজ নিলাম। এটিএন নিউজের রিপোর্টার আরাফাত সিদ্দিকীকে দায়িত্ব দিলাম খোঁজ নিতে। ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, আসলে একটা বড় ভুল হয়ে গেছে। স্রেফ ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গিয়ে তারা এখন রিমান্ড শেষে কারাগারে। আরাফাত বলল, আসলে এই চার স্বেচ্ছাসেবী মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার। ঘটনার পর পর পুলিশের দেয়া তথ্য এবং মনিরের অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রায় সকল টিভি, অনলাইন এবং পরদিন অধিকাংশ পত্রিকায় ছাপা হলো ‘১০ শিশুসহ চার মানবপাচারকারী আটক’। খুবই আকর্ষনীয় নিউজ। ভালো কাভারেজও পেল। আর এই সুযোগটাই নিল পুলিশ। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন, নির্যাতন না করার জন্য কিছু ঘুষ-টুষও আদায় হলো। সবাই সত্যিটা বুঝতে পারলেও তাদের মুক্তি মিলল না আইনের মারপ্যাচে। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খুব শক্ত। আর আনাড়ি ছেলেময়েগুলো অদম্য বাংলাদেশের যথাযথ সরকারি অনুমোদনও নেয়নি। তাই আইন নাকি এখানে অন্ধ। দুদিনের রিমান্ড শেষেও তাদের জামিন মেলেনি। পুলিশ বলছে, তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাদের ছেড়ে দিলে পরে সত্যিকারের মানবপাচারকারীরাও এর সুযোগ নিতে চাইবে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই এই নিরপরাধ অদম্য তরুণেরা যে শাস্তি পাচ্ছে, তার প্রতিকার কে করবে?

এই যদি হয় আমাদের পুলিশ আর আইনের প্যাচ, তাহলে তো ভবিষ্যতে আর কেউ স্বেচ্ছাশ্রমে সমাজের কাজ করতে আসবে না। তারাও ঘরের খেয়ে ঘরেই ঘুমিয়ে থাকবে। তাহলে যে বুনো মোষ তছনছ করে দেবে আমাদের সাজানো বাগান। এই মোষ তাড়ানো অদম্য তারুণ্য না থাকলে আমাদের পৃথিবীটা এত বাসযোগ্য থাকবে না। আমরা এত আরামে এত গ্লানিমুক্ত জীবন যাপন করতে পারব না।

তবে এই ঘটনায় পুলিশের দোষ দেয়ার আগে আমি আমাদের নিজেদের দিকে আঙ্গুল তুলতে চাই। আমরা ভালোমত যাচাই না করেই চারটি নিরপরাধ তরুণকে মানবপাচারকারী বানিয়ে দিলাম। গণমাধ্যমের শক্তি অনেক। মানবপাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রচারণার ফলেই পাচার অনেক কমে এসেছে। এটা যেমন সত্যি। তেমনি গণমাধ্যমের ক্ষতি করার শক্তিটাও কম নয়। এই চার তরুণ-তরুণী স্রেফ মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হয়ে কারাভোগ করছে। গণমাধ্যমে নিউজ করাটা অনেকটা গুলি করার মতো। একবার বেরিয়ে গেলে আর খুব কিছু করার থাকে না। এখন আমরা যতই তাদের পাশে দাঁড়াই না কেন, গত কদিনের যে দুঃস্বপ্ন, রিমান্ড, কারাগার- তা কে ফিরিয়ে দেবে। নিশ্চয়ই আমাদের উচিত কোনো নিউজ সম্প্রচার করার আগে তা পুরোপুরি নিশ্চিত করা। আমরা ভুল মানুষকে ভুলভাবে চিত্রিত করছি না তো, নিরপরাধ মানুষের ছবি দাগী অপরাধীর মতো ছাপিয়ে দিচ্ছি না তো?

আমরা তাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। কিন্তু আমার শঙ্কা হলো কারাগার আর রিমান্ডের দুঃসহ স্মৃতি এই অদম্য তারুণকে দমিয়ে দেবে না তো। আমি আরিফ, জাকিয়া, সবুজ আর শুভর প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি, পথে নামলে অনেক বাধা বিপত্তি পোহাতে হয়। কিন্তু আপনারা আপনাদের লক্ষ্য খেকে দূরে সরে যাবেন না। পথশিশুদের পাশে আপনারা থাকুন, আমরা আপনাদের পাশে থাকবো, কথা দিচ্ছি।

প্রভাষ আমিন: অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ