মেইন ম্যেনু

বহুজাতিক ব্যবস্থাপনায় হজ দাবি ইরানের

বছরের পর বছর ধরে সৌদি আরব এককভাবে হজ ব্যবস্থাপনা করে আসছে। প্রতিবছর হজ থেকে তারা আয় করছে কয়েক বিলিয়ন ডলার। সারা বিশ্ব থেকে যাওয়া হাজিদের কাছ থেকে এত টাকা আয় করেও হাজিদের নিরপাত্তার ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন সৌদি সরকার। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম ও মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রকে।

মিনায় পদদলনে সাড়ে ৭ শরও অধিক হাজির মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র ইরান। মর্মান্তিক এ ঘটনায় ইরানের ১৩১জন হাজি মৃত্যুবরণ করেছেন বলে তারা দাবি করেছে। মিনার এ ঘটনার জন্য সৌদি সরকারের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনাকেই দায়ি করেছে দেশটি। এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদও জানিয়েছে তারা। একইসঙ্গে হাজিদের নিরাপত্তা দিতে সৌদি সরকার যে ব্যর্থ তারও ইঙ্গিত দিয়ে ইরান বলেছে, এককভাবে সৌদি আরবের ব্যবস্থাপনায় নয়, ‘বহুজাতিক’ ব্যবস্থাপনায় হজ হওয়া দরকার।

অনেকে মনে করছেন, ইরানের এমন মন্তব্যে সৌদি সরকারের পিলে চমকানোরই কথা। কারণ এককভাবে সৌদি সরকারই হজের মতো বিশাল যজ্ঞের ব্যস্থপনার দায়িত্বে রয়েছে এবং এর থেকে প্রাপ্ত অর্থের মালিকও তারা। সৌদি রাজতন্ত্রের আরাম-আয়েশ ও শান-শওকাতের বিশাল অর্থ যোগান দেয় এই হজ। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উপর এক ধরনের মনস্তাত্বিক প্রভাবও রাখতে সক্ষম তারা। কারণ মুসলমানদের দুই প্রধান তীর্থভূমি মক্কা ও মদিনা সৌদি আরবেই অবস্থিত। সবচেয়ে বড় কথা পবিত্র মক্কা মুনওয়ারা হচ্ছে মুসলমানদের কেবলা। সেদিকেই সেজদা দেয় সারা পৃথিবীর মুসলমানরা। বিষয়টি সৌদি রাজপরিবার এভাবেই উপভোগ করে থাকে যেন- বিশ্বের মুসলমানরা তাদেরকেই সেজদা করছে, তাদেরকেই অনুকরণ ও অনুসরণ করেছ। ফলে তাদের ‘বাধ্যগত’ ‘অনুগামী’ ও ‘অনুসারি’ মুসলমানদের তারা মধ্যযুগীয় ভাবনায় প্রজা হিসেবেই দেখে থাকে। মধ্যযুগীয় প্রবণতায় প্রজাদের জীবন-মানের প্রতি রাজাদের অবজ্ঞা-অবহেলা একটি সাধারণ ব্যপার। অনেকেই মনে করেন সৌদি আরব মূলত তারই চর্চা করে চলেছে এখনো।

মিনায় পদদলিত হয়ে হাজিদের মৃত্যুর ঘটনাকে অনেকটা ‘ভাগ্যদোষ’ বলে ইঙ্গিত করেছেন সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা গ্রান্ড মুফতি শেখ আব্দুল আজিজ বিন আবদুল্লাহ আল শেখ। তিনি বলেছেন, মিনার এই প্রাণহানির ঘটনায় ‘মানুষের হাতে ছিল না’। এ ঘটনার জন্য সৌদি উপপ্রধানমন্ত্রী ও সুপ্রিম হজ কমিটির প্রধান ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে দায়ী করা ঠিক হবে না বলেও তিনি মত দেন।

কিন্তু গ্রান্ড মুফতির এ বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করলেন, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি এই ঘটনার দায় সৌদি সরকারকেই নিতে হবে বলে জানান। অপরদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি শনিবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এক দীর্ঘ বক্তৃতায় মিনার ঘটনার তদন্ত দাবি করেছেন।

অবশ্য সত্যিই সত্যিই ইরানের মন্তব্যে নড়েচড়ে বসেছে সৌদি আরব। মিনায় পদদলনে প্রায় আটশ হাজির মৃত্যুর ঘটনায় সৌদি আরবের ‘লুকোচুরি’ নিয়ে ক্ষিপ্ত ইরান বলেছে সৌদি আরব সঠিক তথ্য প্রকাশ করছে না। পদদলনে কমপক্ষে দুই হাজার হাজির মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করছে তারা।

এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় বেতারে বলা হয়, সৌদি বাদশাহর ছেলের গাড়িবহর ‘মিনার কেন্দ্রস্থলে আসায়’ তীব্র ভিড়ে পদদলনের ঘটনা ঘটেছে।

তারা দাবি করেছে, হজযাত্রীরা যেসব সড়ক দিয়ে এসে শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর মেরে ওই এলাকা থেকে চলে যান, হঠাৎ সেইসব সড়কের মধ্যে দুটি সড়ক বন্ধ থাকায় হজযাত্রীরা ভিড় এড়াতে বা সরে যেতে ব্যর্থ হন।

অন্যদিকে সৌদি হজ কমিটির প্রধান প্রিন্স খালেদ আল-ফয়সাল হুড়োহুড়ির জন্য ‘আফ্রিকান নাগরিকসহ হাজিদের একটি দল’কে দায়ী করেন। সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, হাজিরা নির্দেশনা ঠিকমত অনুসরণ না করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।

ঘটনা ঘটেছে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত সৌদি সিভিল ডিফেন্স ৭১৭ জন নিহত হওয়ার খবর দেয়। তখন পর্যন্ত আহতের সংখ্যা জানানো হয়েছিল ৮৬৩। এরপর শুক্রবার পুরো দিন সৌদি সরকার নিশ্চুপ ছিল। হতাহতের হালদাগাদ তথ্য জানাচ্ছিল না। এতে মিনা ট্র্যাজেডি নিয়ে সৌদি আরবের ‘লুকোচুরি’ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় ইরানের ‘দাওয়াই’ কাজ করে বসে। ইরানের সঙ্গে যোগ দেয় আরেক মুসলিম প্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়া। তারাও মিনা ট্র্যাজেডির জন্য সৌদি সরকারকে দায়ি করে।

সৌদি সরকার অনেকটা সমালোচনা থেকে বাঁচতে শনিবার মিনায় হতাহতের একটা হালনাগাদ তথ্য দেয়। তাতে জানানো হয় নিহতের সংখ্যা ৫২ জন বেড়ে হয়েছে ৭৬৯ জন। আর আহত হয়েছেন মোট ৯৩৪ জন।

এভাবে একর পর এক, বছরের পর বছর এসব দুর্ঘটনা এড়াতে আরো কার্যকর হজ ব্যবস্থাপনা দরকার বলে ইরান মনে করছে। ইরান দাবি করেছে সৌদি আরব ও ইরান- দুই দেশই মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের দাবিদার। বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলারের হজ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এককভাবে সৌদি আরবের হাতে না রেখে ‘বহুজাতিক’ ব্যবস্থাপনায় হওয়া উচিত।