মেইন ম্যেনু

বাঁশখালীতে নিহতের সংখ্যা নিয়ে লুকোচুরি

বাঁশখালীতে পুলিশ-গ্রামবাসী সংঘর্ষে তিনজন নিহতের কথা প্রশাসন স্বীকার করলেও প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৭ জন বলে জানান আন্দোলনকারীরা। ঘটনার প্রথম দিকে নিহতের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কথা না বললেও রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সংবাদ মাধ্যমের কাছে তিনজন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পুলিশ, গ্রামবাসী ও বিদ্যুৎ প্রকল্প কর্তৃপক্ষের ত্রিপক্ষীয় সংঘর্ষে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশাসনের এহেন লুকোচুরির ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন কার স্বার্থে প্রশাসনের এমন লুকোচুরি।

গ্রামবাসী জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় গন্ডামারা গ্রামের মৃত আশরাফ আলীর ছেলে মরতুজা আলী (৫২), তার ভাই আংকুর আলী (৪৫), নুর আহমদের ছেলে জাকের আহমদ (৩৫) নিহত হয়েছেন।

তবে বসতভিটা রক্ষা কমিটির নেতৃত্বদানকারী লেয়াকত আলী জানান, এ তিনজন ছাড়াও উমেদ আলীর ছেলে জাকের আহমদ (৪০), আবুল খায়েরের ছেলে জহির, ছুফি আলমের স্ত্রী কুলছুমা বেগম, পাঠান নামে এক ব্যক্তির ছেলেসহ মোট সাতজন মারা গেছে।

বাঁশখালীর গন্ডামারা ইউনিয়নে এস. আলম গ্রুপের নির্মিতব্য কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে ডাকা সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুলিশ, আনসার ও গ্রামবাসীর মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশ তিনজন নিহত হওয়ার কথা জানালেও মোট সাতজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এ ঘটনায় আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। তবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও বাঁশখালী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে পুলিশ, আনসারসহ ২৫ জন।

সোমবার বিকেলে গন্ডামারা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের হাদিরপাড়া স্কুল মাঠ এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, সমাবেশকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষ মুখোমুখি হলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এসময় পুলিশকে লক্ষ্য করে স্থানীয় জনতা গুলি ছুঁড়লে পুলিশও আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুঁড়ে। এতে তিনজন মারা গেছে বলে আমরা শুনেছি।

গন্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী বলেন, গত রোববার স্থানীয় কিছু সাধারণ জনতাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। এর প্রতিবাদে হাদিরপাড়া স্কুল মাঠে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখানে পুলিশ ও স্থানীয় ডাকাতদের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেয়া জনগণের উপর হামলা চালিয়েছে। এতে পুলিশের গুলিতে জাকের আহমদ, মর্তুজ আলী, আনোয়ার মিয়া, জাকের, জহির, কুলছুমা বেগমসহ মোট সাতজন মারা যায়।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, হাদিরপাড়া স্কুলের মাঠে সমাবেশকে ঘিরে উত্তেজনা দেখা দিলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। এ নিয়ে সকাল থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকায় বিপুল পরিমাণ পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিকেলে উত্তেজিত জনতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একে অপরের উপর হামলা চালালে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এতে পুলিশও পাল্টা গুলি ছুঁড়লে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

বাঁশখালী হাসপাতাল সূত্র জানায়, সংঘর্ষের ঘটনায় ১৪ জন পুলিশ সদস্য ও চারজন সাধারণ মানুষ ও একজন আনসার সদস্যকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে আটজন ও চমেক হাসপাতালে তিনজনকে প্রেরণ করা হয়েছে।

আহতরা হলেন পুলিশের উপ-পরিদর্শক বেলাল হোসেন (৩৫), মো. বাহার (৩২), মো. মুজিবুল ইসলাম (৩০), সহকারী উপ-পরিদর্শক মো. আনোয়ার হোসেন (২৯), কনস্টবল মো. ওয়াসিম (২২), কনক চন্দ্র সিংহ (২৪), খোরশেদ আলম (৫০), মো. নুরুল কবির (২৯), মিরাজ উদ্দিন (২৮), মিনহাজুল ইসলাম (৪৮), চন মুং মারমা (৪৮), রূপবন্ধু চাকমা (৪৭), শহীদুল ইসলাম (৩৫), নায়েক এল.এম হোসেন (৪০), সাধারন জনতা আবদুল খালেক (২৭), মো. ছগীর (৩৫), মো. জহির (৩৫), জিয়াদ রহমান (২৪), আনসার সদস্য আবদুল মোতালেব (২৩)। এরমধ্যে মো. জহির, আবদুল খালেক ও আনসার সদস্য আব্দুল মোতালেবকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

বাঁশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. আসমা তাসনিম বলেন, বিকেলের পর থেকে হঠাৎ করে গন্ডামারায় সংঘর্ষে আহত রোগী আসতে থাকে। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তিনজনকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হলেও আটজনকে বাঁশখালী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনচার্জ জহির উদ্দিন বলেন, গন্ডামারায় সংঘর্ষের ঘটনায় খালেদ, জহির, আবু খান, আনছার উদ্দিন, মুজিব ও জাকের নামে একজনকে হাসপাতালে আনা হয়। এরমধ্যে জাকের আহমদ মারা গেলেও বাকি পাঁচজনকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামসুজ্জামান রাত সাড়ে ৮টার দিকে জানান, এখনো পর্যন্ত গন্ডামারার পরিস্থিতি থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। নিহত ও আহতের বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সাংবাদিকদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, তিনজন মারা যাওয়ার বিষয়টি শুনেছি।

এর আগে গত শনিবার বিকেলে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংশ্লিষ্টরা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় লোকজন তাদের উপর হামলা চালায়। এসময় উত্তেজিত জনতা তাদের ব্যবহৃত দুটি সিএনজি বেবিট্যাক্সি ও ৩টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এনিয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ মামলা করলে পুলিশ সোমবার ভোরে অভিযান চালিয়ে গন্ডামারা থেকে আসত আলী, হুমায়ুন কবির, শাহ আলম, বখতেয়ার ও লোকমানসহ ৭ জনকে আটক করে।

তাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে সোমবার বিকেল ৩টায় এ সমাবেশের ডাক দেয় বসতভিটা রক্ষা কমিটি। এসময় একই স্থানে প্রকল্পের পক্ষ নিয়ে অপর একটি গ্রুপ সমাবেশের ডাক দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এতে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে প্রাণ হারান আন্দোলনকারী সাধারণ মানুষ।

বাঁশখালীর গন্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকায় দেশের অন্যতম শিল্পগ্রুপ এস আলম ও চায়না সেবকো এইচটিজি যৌথভাবে কয়লাভিত্তিক এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পটি ঘিরে ব্যাপক তৎপরতা চলছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এ প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ প্রকল্পে ৭০ শতাংশ মালিকানা এস আলম গ্রুপের বাকি ৩০ শতাংশ মালিকানা দুটি চীনা প্রতিষ্ঠানের। এ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ শেষ হলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে মিছিল, সমাবেশ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটছিল।

গত দুই মাস ধরে কয়েকদফা সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন মানুষ আহত হয়। জীববৈচিত্র ধ্বংস, লবণ ও চিংড়ি চাষে জড়িতরা বেকার হওয়া, পরিবেশের বিপর্যয় ও বসতি হারানোর আশঙ্কা প্রকাশ করে বসতভিটা রক্ষা কমিটি নাম দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল স্থানীয় জনতা।