মেইন ম্যেনু

বাংলাদেশে আরো ফ্যাক্টরি করবে ইন্দোনেশিয়ানরা

বেশ কিছু ইন্দোনেশিয়ান গার্মেন্টস কোম্পানি ইতোমধ্যে রয়েছে ঢাকা ইপিজেডে। দেশটির সর্ববৃহৎ টেক্সটাইল মেশিনারিজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘আগানসা প্রিমাতামা’ এর মধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশে তাদের ফ্যাক্টরি স্থাপন করতে। ‘কুসুমা মুলিয়া’ নামক বড় আরেকটি বুনন টেক্সটাইল কোম্পানিও ইন্দোনেশিয়া থেকে তাদের উৎপাদন বাংলাদেশের একটি ইপিজেডে স্থানান্তর করতে আগ্রহী।

এসব সুসংবাদ দিলেন জাকার্তায় দায়িত্বরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাজমুল কাওনাইন। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি জানান, ‘উভয় প্রতিষ্ঠানই এখানে আমাদের দূতাবাস এবং ঢাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।’

রাষ্ট্রদূত নাজমুল কাওনাইন জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শহরতলীগুলোর উন্নয়ন এবং পর্যটন কেন্দ্রসমূহকে আরো আকর্ষণীয় করতে গত আড়াই বছরে জাকার্তার বাংলাদেশ দূতাবাসের তরফ থেকে ইন্দোনেশিয়ান বিনিয়োগকারীদের সাথে আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশে জয়েন্ট ভেঞ্চারের সম্ভাবনা নিয়ে। ‘সিপুত্রা গ্রুপ’ এ ব্যাপারে তাদের আগ্রহ দেখিয়েছে।

অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ান টেক্সটাইল বর্জ্য রিসাইকেল কোম্পানি ‘মিত্রা সারুতা’ চট্টগ্রামে ইনভেস্ট করতে আগ্রহী এবং এই প্রক্রিয়ায় তারা নিজেরা বাইয়িং হাউস খুলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের টেক্সটাইল বর্জ্য ক্রয় করবে। একই সাথে তারা প্রেস মেশিনের মাধ্যমে সেটা প্যাকিং করে চট্টগ্রাম থেকে রপ্তানী করবে ইন্দোনেশিয়াতে।

‘মিত্রা সারুতা’ কোম্পানির বিষয়টি বাংলাদেশ বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট (বিওআই) এবং বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন্স অথরিটি (বেপজা) দেখভাল করছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত।

পেশাদার এই কূটনীতিক আরো বলেন, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের পর্যটন ও ব্যবসায়িক স্বার্থকে উৎসাহিত করতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা চলছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং ইন্দোনেশিয়ান ‘গারুদা’র মধ্যে আগেই সম্পাদিত এয়ার সার্ভিস এগ্রিমেন্টটি আমাদের এখন বাস্তবায়ন করতে হবে। বেপজা এবং বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন্স অথরিটি (বেজা)’র প্রতিনিধিরা সাম্প্রতিককালে এদেশ সফর করেছেন এবং স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছেন বাংলাদেশে তাদের জন্য যেসব সুযোগ সুবিধা ও ইনসেন্টিভ অপেক্ষা করছে সরকারের তরফ থেকে।

এদিকে বাংলাদেশে-ইন্দোনেশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ইতোমধ্যে ১.৪০ বিলিয়ন ইউএস ডলারে উন্নীত হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত নাজমুল কাওনাইন।

বাণিজ্য ভারসাম্য (Balance of trade) অবশ্য এক্ষেত্রে খুব ব্যাপকভাবে ইন্দোনেশিয়ার অনুকুলে। আশাবাদ ব্যক্ত করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০১৭ সালে এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২ বিলিয়ন ইউএস ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ইন্দোনেশিয়া থেকে বাংলাদেশ যেসব পন্য আমদানি করে থাকে তার বেশির ভাগই হচ্ছে ক্লিংকার, রাবার, পাম অয়েল, খনিজ বা রাসায়সিক সার এবং পলি কার্বনেট। এসব পণ্যের অধিকাংশই দেশের শিল্পকারখানায় উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ যেসব সামগ্রী ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করে থাকে তার মধ্যে রয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্য, গার্মেন্টসের মেশিনারিজ ও কেমিক্যাল, অ্যানিমেল ফ্যাট, ফার্মাসিউটিক্যালস, লোহা ও ইস্পাতের সামগ্রী। তা ছাড়া অর্গানিক কেমিক্যাল, টেক্সটাইল থেকে তৈরি পণ্য, রং করার সামগ্রী, বিশেষ ধরনের সুতা, টেক্সটাইল ফেব্রিক্স, আইসি ইঞ্জিন পিস্টন এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইকুইপমেন্ট রপ্তানি করেও বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে দুই দেশের ব্যবসায়ী সমাজের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে জাকার্তায় আমাদের দূতাবাস। বাংলাদেশ থেকে ইন্দোনেশিয়াতে রপ্তানির জন্য ইতিমধ্যে বেশ কিছু নতুন আইটেম শনাক্ত করেছি আমরা। তার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন কোয়ালিটির সূতার লুঙ্গি যেমন প্লেইন সিল্ক এবং ফাইন পাবনা কটন। সিল্ক এবং কাতানের সামগ্রী ও পোশাক, পুরুষের ফতুয়া, প্লাস্টিক ও মেলামাইন পন্য, সিরামিক ও মৃৎশিল্প, পিতলের হস্তশিল্প, কৃষি ও ডেইরি প্রোডাক্ট এবং বিশেষ করে লিচু ও আমসহ বাংলাদেশী খাদ্যসামগ্রীও আছে এই তালিকায়।’

ফার্মাসিউটিক্যালস সামগ্রী এবং মাংস এমনকি জীবিত গবাদিপশুও বাংলাদেশ থেকে ইন্দোনেশিয়াতে রপ্তানি হবার সম্ভাবনা বাড়ছে। দূতাবাসের আন্তরিকতার ফসল হিসেবে ইন্দোনেশিয়ান ব্যবসায়ীদের মাঝে বাংলাদেশি ফার্মাসিউটিক্যালস ও হালাল মাংসকে ঘিরে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সফর বিনিময় আশাব্যঞ্জক হারে বেড়েছে গত কয়েক বছরে। বাংলাদেশ থেকে অনেক কোম্পানিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্দোনেশিয়াতে বিভিন্ন ট্রেড ফেয়ারে অংশ নিয়েছে।

বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংবাদ মাধ্যম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যুব বিষয়ক এবং খেলাধুলা সংক্রান্ত পারষ্পরিক সহযোগিতা আরো বাড়াতে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত নাজমুল কাওনাইন।

তিনি বলেন, ২৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়াতে কৃষি, কনস্ট্রাকশান বা যে কোন নন-স্কিল্ড প্রফেশনে যে জনবলের প্রয়োজন হয়, তা খুব সস্তায় পূরণ করা হয়ে থাকে স্থানীয় বিশাল জনগোষ্ঠী থেকে। সঙ্গতকারণে বাংলাদেশ থেকে ঢালাওভাবে জনশক্তি রপ্তানীর সুযোগ নেই এদেশে। তবে আইটি এবং ফাইনান্সিয়াল সেক্টরে এখন নতুন দুয়ার খুলছে এখানে, যা বাংলাদেশের জন্য নবদিগন্তের সূচনা করতে পারে। ইতোমধ্যে আমাদের বেশ কিছু প্রফেশনাল লোকজন এদেশের ওষুধ, আইটি, ব্যাংকিং ও এয়ারলাইন্সসহ অন্যান্য সেক্টরে কাজ করছেন।

ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ উভয় দেশই যেহেতু বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি করে থাকে, তাই তাদের স্বার্থ রক্ষা সহ নারী গৃহকর্মীদের বিভিন্ন বিষয়াদিতে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে উভয় দেশ ঘনিষ্টভাবে কাজ করে থাকে। বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সহযোগিতা, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, সাংস্কৃতিক এবং রপ্তানিকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে দু’দেশের মধ্যে বেশ কিছু এমওইউ বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।