মেইন ম্যেনু

বাঙালির দ্বিতীয় বিয়ে কতটা স্বচ্ছন্দ এই মুহূর্তে

‘দোজবরে’ শব্দটার সঙ্গে কি পরিচয় রয়েছে সাম্প্রতিক প্রজন্মের বাঙালিদের? একদা এই টার্মটা বাঙালির নেহাত ঘরের কথা ছিল। প্রথম বিবাহের স্মৃতি কতটা তাড়া করে এই নতুন ‘দোজবরে’-দের?

‘দোজবরে’ শব্দটার সঙ্গে কি পরিচয় রয়েছে সাম্প্রতিক প্রজন্মের বাঙালিদের? একদা এই টার্মটা বাঙালির নেহাত ঘরের কথা ছিল। অকটু বেশি বয়স হয়ে যাওয়া মেয়েদের সম্বন্ধ আসত বিপত্নীক ভদ্রলোকদের তরফ থেকে।

কুড়ি-বাইশ বছরের মেয়ে পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছরের ‘দোজবরে’-র গলায় ঠিক হাসতে হাসতে না হলেও, মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই মালা দিত। তার পরে কালের নিয়মে সেই দোজবরেটি পত্নীর আগেই বিগত হতেন।

বৈধব্য নামত তার শ্বেত আচ্ছাদন নিয়ে। ততদিনে ছেলেপুলেতে সংসার ভরে গিয়েছে। জীবনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিধবা হওয়া মেয়েটি চমৎকারভাবে মেনেও নিত সেই অবস্থা। সেই কালচারে কেউ দ্বিতীয় বিবাহকে তেমন একটা ভারী ব্যাপার বলে মনে করত না।

মানে, সামাজিক দিক থেকে ব্যাপারটা তেমন একটা আলোচ্য হয়ে উঠত না। কেবল দ্বিতীয় বিয়ের পরে বরমশাই যদি খুব বেশি স্ত্রৈণ হয়ে পড়তেন, তা হলে একটু চোখ ঠারাঠারি হত, এই যা।

কিন্তু এই সব সামাজিক সিম্পটম থেকে কি আদৌ বোঝা যায় সেই পুরুষটির কথা, যিনি কোনও না কোনও দায় থেকে এই দু’নম্বর বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন? উদাহরণ হাতের কাছে অনেক। কী মনোভাব থেকে একজন প্রৌঢ় এক তরুণীর পাণিগ্রহণ করতেন তা খুঁজতে বসলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কামতাড়না নয়, নেহাত দায়বদ্ধতাই উঠে আসছে।

কেউ নাবালক পুত্র-কন্যা নিয়ে নাজেহাল, কেউ বা একাবারে বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে। তার পরে আত্মীয়-শুভার্থীদের চাপে একটা সময়ে ছাদনাতলায় বসতে বাধ্য হলেন। বিংশ শতকে পেশাদার বিবাহ-ব্যবসায়ী কুলীনদের দেখা পাওয়া সম্ভব নয়। সে দিন বিগত অনেক কাল আগেই।

বিপত্নীক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয় বার বিবাহ করেছিলেন। বিভূতিভূষণ যখন দ্বিতীয় বার বিবাহ করেন তখন তাঁর বয়স ৪৫। পাত্রী কল্যাণীদেবীর বয়স ১৮। এই অসমবয়স্ক সখ্যে ‘পথের পাঁচালী’-র লেখক কী পরিমাণ বিড়ম্বিত ছিলেন, তা তাঁর বিভিন্ন ব্যক্তিগত লেখায় ছড়িয়ে রয়েছে।

অসামান্য অকপট সেই সব অ্যাকাউন্ট। খোলাখুলি বিভূতিভূষণ লিখে গিয়েছিলেন প্রথম বারের স্মৃতি আর দ্বিতীয় বারের সম্পর্কের টানা-পোড়েন নিয়ে। সেই বিড়ম্বনাকে মনে রেখে যদি সরে আসতে হয় পরবর্তী সময়ের দ্বিতীয় বিবাহের বঙ্গ-সন্দর্ভে, তবে একেবারেই একটা নতুন দেশে প্রবেশ ঘটে।

বিপত্নীক নন, অথচ দ্বিতীয় বার দার পরিগ্রহ করছেন, এমন বাঙালি পুরুষের সংখ্যা কি এই মুহূর্তে ক্রমবর্ধমান? বিশদ করে বললে, ডিভোর্সি পুরুষের সংখ্যাবৃদ্ধি বাঙালি সমাজে গত অর্ধশতকের অন্যতম লক্ষ্যণীয় ব্যাপার।

এমন ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিবাহও একটা জলভাত ব্যাপার। ডিভোর্সের পরে অ্যাফেয়ার হল না তো কুছ পরোয়া নেই। ‘ডিভোর্সি ম্যাট্রিমনি’-জাতীয় সাইট ছট ছট করছে ইন্টারনেটে। আবার খবরের কাগজেও ‘নামমাত্র বিবাহে ডিভোর্সি’ থেকে শুরু করে খোলাখুলি ‘বিবাহ বিচ্ছিন্ন’ স্পষ্টবাদীরা কিলবিল করছেন পাত্রপাত্রী কলামে।

পাত্রীপক্ষও জানেন, এ এক এমন রাক্ষসীবেলা, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাব। আর তাঁদের ঘরের স্ত্রীধনটিও যে ঠিক কত নম্বরে রয়েছেন, সেটাও ভেবে দেখার। প্রথম বিবাহের স্মৃতি কতটা তাড়া করে এই নতুন ‘দোজবরে’-দের? একটা খোলা লব্জ এমন ক্ষেত্রে বার বার উঠে আসে ‘আগের বিয়েটায় অ্যাডজাস্টমেন্ট হয়নি তো, তাই…।’

কী হলে অ্যাডজাস্টমেন্ট হত, এই প্রশ্ন দ্বিতীয় সম্বন্ধে বা কোর্টশিপেও কেউ করেন না। ফলত, কোনও এক সন্ধ্যায় প্রায় নিরালম্ব একটা রেজিস্ট্রি সেরে পুনরায় সংসারে প্রবেশ ঘটে। সেই দ্বিতীয় ইনিংস কতদিন স্থায়ী হয়, সে প্রশ্ন অবান্তর। এই লেখার সীমা দ্বিতীয় বিবাহেই বাঁধা।

সমস্যাটা শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিবাহে স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে। কতটা সাবলীল বাঙালি আজ এই পুনর্বিবাহে? একটা প্রেম থেকে আর একটা প্রেম গড়িয়ে যাওয়ার থেকেও কি স্মুদ এই বিবাহান্তর? নাকি পিছনে পিছনে ধাবমান স্মৃতি মিছিল, তাকে রীতিমতো বিব্রত করে যখন তখন?

সাহিত্য তেমন উত্তর দেয় না। টিভি সিরিয়াল আর সিনেমাও হয় ওভার-রোম্যান্টিসাইজ করে, নয়তো পাশ কাটায়। বাঙালি পুরুষের নৈতিক ব্যারিকেডে ঠিক কতটা ফিল্টার্ড হয় এই স্মৃতির জঞ্জাল, তা বোঝার তেমন কোনও উপায় নেই।

উপায় নেই বটে, কিন্তু অন্য ছাপ তো রয়েছেই। সেই ছাপটা একান্তভাবেই নিজের অন্তর্গহনে ডুবে থাকা অবচেতনের। সেখানে এই ‘দ্বিতীয়’ শবদটা কি সেঁটে বসে থাকে না? প্রথম বারে করা ‘ভুল’গুলোর ব্যাপারে সদা-সচেতনতা কি সম্পর্কের মাঝখানে আড়াল তোলে না?

একটু খিটিমিটিতেই কি উঠে আসে না আগের বউ কেন ছেড়ে গিয়েছে, হাড়ে হাড়ে বুঝছি এখন-মার্কা উক্তি? সাবধানে পা ফেলতে হয়। এ যেন এক টাইট-রোপ ওয়াকিং। একপাশে স্মৃতি আর অন্য পাশে সত্তার আঁধারকে রেখে কঠিন সার্কাস।

কিন্তু কোথায় নিয়ে যায় সেই দড়িপথ? আদৌ কোথাও নিয়ে যায় কি? দিনের শেষে ক্লান্তি আসে। ঘুম নামক এক পদার্থ চুঁইয়ে নামে মগজ থেকে। জাগরণ আর ঘুমের মাঝখানের একটা ছমছমে জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে স্মৃতি, তার মোকাবিলা না-করে ঘুমোনো যায় না। করলেও কি যায়? কে বলবেন, সকলে তো বিভূতিভুষণের মতো ‘সাহসী’ নন!-এবেলা



« (পূর্বের সংবাদ)