মেইন ম্যেনু

বাচ্চুর বিচার না হওয়ায় আস্থা কমতে পারে ব্যাংকে

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়, বেসরকারি ও বিদেশি মালিকানাধীন মোট ৫৬ টি ব্যাংক রয়েছে। যে ব্যাংকগুলোর ব্যবসার মূল শক্তিই হলো জনগণের আমানত। জনগণের আমানত না পেলে ব্যাংকগুলো ব্যবসাই করতে পারবে না। আর সেই টাকা যখন কোনো একটি ব্যাংকের বড় কর্তা নিজের ক্ষমতা খাটিয়ে স্রেফ ‘আত্মসাৎ‘ করে নিয়ে যায় তখন মানুষের মনে অনাস্থা সৃষ্টি হয়। আর আত্মসাতের ঘটনা উদঘাটিত হওয়ার পরও যদি অপরাধীকে সাজা না দেয়া হয় তাহলে একই মানুষের আস্থায় দুবার চিড় ধরে।

২০১৩ সালে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পর্ষদ সদস্যদের যোগসাজসে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ এসেছিল। যে লোটপাটকারীদের কমান্ডার হিসেবে নাম এসেছে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু’র। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের কয়েক দফার তদন্ত প্রতিবেদনে বাচ্চুর মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের প্রমাণ তুলে ধরে। যার একটিতে দেখানো হয় সাড়ে তিন হাজার কোটির ১ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা বাচ্চু গায়েব করেছে শুধুমাত্র একক ক্ষমতাবলে। এসব গোমর ফাঁস হওয়ার পর মানুষ অপেক্ষা করছিল এর বিচারের জন্য। বাচ্চুকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সে সুযোগটিও এসেছিল এ বছরেতেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনের জের ধরেই দুদক অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে বাচ্চু রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুদক বলেছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো প্রমাণ পায়নি। এ ঘটনায় আশাহত হয় সাধারণ মানুষ। এত বড় একজন রাষ্ট্রীয় অর্থ ‘লোপাটকারীর’ বিচার না হওয়াকে অনেকে ২০১৫ সালে ব্যংকিং খাতের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হিসেবে দেখছেন।

২০১৫-এর বছরজুড়ে ব্যাংকিং খাতে ছোট-বড় বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। পুরাতন ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যেও দু’একটি বেশ এলোমেলো কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। যেগুলো ধরেও ফেলছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যাংকগুলোকে প্রথমে বুঝানো হচ্ছে। এতে কাজ না হলে প্রাথমিকভাবে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তাতেও কাজ না হলে বড় আকারে শাস্তি দিয়ে অপরাধ বন্ধে কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সর্বোপরি ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে উদ্যোগও বেড়েছে। শুরু হয়েছে নতুন কিছু কাজের। যার ধারাবাহিকতায় প্রান্তিক মানুষেরা ব্যাংকিং চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একইসঙ্গে বেড়েছে সিএসআর কার্যক্রমের ব্যপ্তিও। ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা পাওয়া প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি হিজড়া সম্প্রদায়, নতুন বাংলাদেশি নাগরিকরা (সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দারা) নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখার সাহস দেখাচ্ছে।

অলস টাকা ও বিনিয়োগ স্থবিরতা: বিনিয়োগে স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে পুরো বছর জুড়েই। যা ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ঋণে সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিটে না নামা, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, গ্যাস সঙ্কট ও রাজনৈতিক কারণে বছরের শুরু থেকেই বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে আসে। আবার দেশীয় উদ্যোক্তারা বিদেশে বিনিয়োগ করতে পাড়ি জমাচ্ছে বলে আলোচনা-সমালোচনাও উঠেছিল। বিনিয়োগ স্থবিরতায় ব্যাংকিং খাতে বছর জুড়েই বেড়ে চলেছে অলস টাকার পাহাড়। যার প্রমাণ পাওয়া যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের কথাতেই। তিনি বছরজুড়েই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমরা আগে যেখানে টাকার সঙ্কটে ভুগতাম এখন সেখানে উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে হয়।’

বছরের শেষ দিকে এসে অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক অলস টাকার পাহাড়ে বসে থাকা ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগে আনতে ‘রিভার্স রেপোর’ মাধ্যমে টাকা জমা নেয়া বন্ধ রেখেছিল। তারল্য প্রবাহ ঠিক রাখতে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের মাধ্যমে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক চেয়েছিল ব্যাংকগুলো ব্যবসা ও উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়াক। সেটাই ব্যাংকের মূল কাজ। আমানতের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে রেখে মুনাফা নেয়া ব্যাংকের কাজ না। রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে থাকে। বর্তমানে রেপোর সুদের হার ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর রিভার্স রেপোর মাধ্যমে বাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে সুদ দেয়।

জানা যায়, দেশের ব্যাংক খাতে এখন অতিরিক্ত তারল্য আছে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। শুধু এ বছরই নয়, কয়েক বছর ধরে অলস টাকার এই পরিমাণ বেড়েই চলেছে।

আক্ষরিক অর্থেই টাকা নিয়ে বসে আছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু ঋণ নিচ্ছেন না শিল্পোদ্যোক্তারা। বাড়ছে না বেসরকারি খাতে ঋণ নেয়ার হার। দেশে নতুন বিনিয়োগ তেমন হচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংকে বাড়ছে অলস টাকার পরিমাণ। দেশে না করলেও উদ্যোক্তারা এখন বিনিয়োগের জন্য দেশের বাইরে যেতে চাচ্ছেন। অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, অর্থনীতির গতি বাড়লে ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত তারল্য থাকে না। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দেশের অর্থনীতিতে একধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। গতি কমেছে অর্থনীতির। যার প্রমাণ হচ্ছে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ।

নিয়মানুযায়ী দেশের ব্যাংকগুলোকে নগদ ও বিধিবদ্ধ (সিআরআর ও এসএলআর) বিভিন্ন উপকরণে অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। সব মিলিয়ে এ জন্য রাখতে হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য রাখতে হয় আরও কিছু নগদ অর্থ। অথচ এখন আছে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নগদ অর্থ বেশি আছে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। বিনিয়োগ স্থবিরতায় অলস টাকা তিন গুণ বেড়েছে বলেই ব্যাংকাররা জানান। দেশে বিনিয়োগ না করলে দেশের বাইরে বিনিয়োগের জন্য অনেকেই যাচ্ছে বলে জানা যায়।

সূত্র জানায়, বেসরকারি বিনিয়োগে সবচেয়ে বেশি হতাশা বিরাজ করছে। ২০০৯ সালে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর এখন সেই বিনিয়োগ মাত্র দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২২ দশমিক ০৭ শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগ মূলত বছরের পর বছর একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না বলেই জিডিপির প্রবৃদ্ধির হারও ৬ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। কিন্তু বিনিয়োগ স্থবিরতায় ১২ বছর ধরে দেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরেই আটকে আছে। এটিকে এখন বলা হচ্ছে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ফাঁদ।

এদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতার জন্য সরকার কয়েক বছর ধরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়েছে। এর ফলে ২০০৮-০৯ সময়ে জিডিপিতে সরকারি বিনিয়োগ ছিল ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ, আর এখন সেটি হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। যদিও সরকারি বিনিয়োগের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এখন বিনিয়োগের হার প্রায় ২৯ শতাংশ।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বিনিয়োগ স্থবিরতার চিত্র পাওয়া যায়। ২০১০-১১ অর্থবছরেও বেসরকারি খাতে ঋণ নেয়ার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ শতাংশেরও বেশি। সেটি এখন ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য ছিল সাড়ে ১৫ শতাংশ।

৫ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ: শৃঙ্খলা ফেরাতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় প্রথমে। এর পরের সপ্তাহেই পর্যবেক্ষক প্রদান করা হয় কৃষি ব্যাংকে। এর ফলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ক্রেডিট ও অডিট কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব বৈঠকে পর্যবেক্ষকরা উপস্থিত থেকে ব্যাংকগুলোকে মনিটরিং করবে। আর্থিক সূচকের ক্রমাবনতি থেকে রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। নানা সুযোগ-সুবিধার পরও এসব ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে পারেনি। এমনকি ব্যাংকগুলো সুশাসন নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হয়েছে।

রিজার্ভ: এ বছরটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়নে (রিজার্ভ) বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে। প্রথমবারের মত ২৭ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে পৌঁছেছে এ রিজার্ভ। যা দিয়ে এখন সাত মাসের আমদানি ব্যয়ের খরচ মেটানো সম্ভব। মে-জুন মাসে রিজার্ভ ২৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসে জুলাইতে ফের ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। এর পর আগস্টে বাংলাদেশের রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে ১০ বিলিয়নের মাইলফলক ছাড়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়। আর ১৫ বিলিয়ন ছাড়িয়েছিল ২০১৩ সালের পাঁচ মে।

৫ টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত: বর্তমানে প্রচলিত ১ ও ২ টাকার মুদ্রার সঙ্গে ৫ টাকার মুদ্রা প্রচলনের দায়িত্ব সরকারের হাতে এসেছে, যা এতদিন ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বে। অর্থাৎ সরকারি মুদ্রায় যুক্ত হচ্ছে ৫ টাকা। এ সংক্রান্ত বিলটি সংসদে পাস হয়িএ বছরেই।

স্কুল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পুরস্কার: যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে দেশ, দেশের অর্থনীতি। সেই সঙ্গে অর্থনীতির মূল স্রোতে বাড়ছে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ। সেই স্রোতে পিছিয়ে নেই স্কুলের শিশু-কিশোররাও। এখন তারা মাটির হাড়িতে নয় টাকা রাখছে ব্যাংকে। যার নাম দেয়া হয়েছে ‘স্কুল ব্যাংকিং‘। ধারণাটি এসেছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকেই। বাস্তবায়নটাও করেছে তারাই। সঞ্চয়ের মনোভাব নিয়ে বড়দের সঙ্গে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও ব্যাংকিংয়ের আওতায় আসুক এমন ধারণা থেকেই কাজ শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। যাতে এখন প্রায় সাড়ে ৮ কোটি শিক্ষার্থীর রয়েছে সাড়ে ৮শ কোটি টাকার সঞ্চয়।

স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মধ্যে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেয়ার স্বীকৃতি হিসেবে ‘চাইল্ড অ্যান্ড ইউথ ফাইন্যান্স ইন্টারন্যাশনালের’ (সিওয়াইএফআই) ‘কান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড’ পায় বাংলাদেশ। লন্ডনের হাউজ অফ লর্ডসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার দেয়া হয়।

ব্যাংকিং মেলা: চলতি মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশে প্রথমবারের মত আয়োজন করেছিল ব্যাংকিং মেলা। পাঁচদিনব্যাপী এ মেলার উদ্যেশ্য ছিল মানুষের কাছে ব্যাংক ভীতি দূর করে তাদেরকে ব্যাংকমুখী করা।