মেইন ম্যেনু

বাসা থেকে পালিয়ে গিয়ে ‘জঙ্গি’ হয়ে ওঠে চার তরুণ

গুলশান হামলায় অংশ নিয়ে নিহত ৫ হামলাকারীই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। এরা সবাই বেশকিছুদিন ধরে নিখোঁজ ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরইমধ্যে চার জনের পরিচয় প্রকাশ করে দিয়েছেন তাদের পরিচিতজনরা। আইএসের বরাত দিয়ে সাইট ইন্টিলিজেন্স তাদের যে ছবি প্রকাশ করে, সে ছবির সঙ্গে পুলিশের দেওয়া ছবির মিলও পাওয়া গেছে। পুলিশও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

জানা গেছে, বেশ কিছুদিন আগে এরা প্রত্যেকেই বাসা ছেড়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। এদের তিনজন রাজধানীর বিভিন্ন নামী-দামি স্কুল-কলেজে পড়েছেন বলে তাদেরই বন্ধুরা দাবি করেছেন।

তারা চিঠি লিখে বাসা ছেড়েছে বলেও তাদের বন্ধুরা ফেসবুকে দাবি করছেন। এরা গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। এরা হলো- নিবরাস ইসলাম, রোহান ইমতিয়াজ, মীর সামিহ মোবাশ্বির ও তাসিন রওনক। তাসিনের বিষয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি।

মীর সামিহ মোবাশ্বির

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টার দিকে মীর সামিহ মোবাশ্বির কোচিংয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়িতে করে বাসা থেকে বের হয়। যানজট থাকায় কোচিং সেন্টারের আগেই গাড়ি থেকে নেমে যায়। পরে সন্ধ্যা ৬টার দিকে গাড়িচালক জুয়েল তাকে কোচিং থেকে আনতে গেলে তাকে আর পাওয়া যায়নি। পরে মোবাশ্বিরের বাবা মীর এ হায়াত কবীর ওই দিনই গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (নম্বর ১৮৪৮) করেন। পুলিশ তার খোঁজ করতে গিয়ে গুলশান এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পায়, মোবাশ্বির গাড়ি থেকে নামার পর একটি রিকশা নিয়ে বনানীর ১১ নম্বর সড়কের দিকে চলে যাচ্ছে।

মোবাশ্বিরমোবাশ্বিরের ছবি শেয়ার করে ফেসবুকে নিঝুম মজুমদার লিখেছেন, আমার ফেসবুকের বন্ধু/ছোটভাই (নাম বলছি না) আমাকে কনফার্ম হয়ে জানাল, এই ছেলেটির নাম মীর সামিহ মোবাশ্বির। আমার সেই বন্ধুর ছোট বোন পড়ে, তারই বন্ধু। সুতরাং তিনিই এই দাবি করেছেন যেহেতু দীর্ঘদিন একজন আরেকজনকে চেনেন। এই ছেলেটি এই বছরের মার্চ মাস থেকে মিসিং। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এ লেভেল পরীক্ষার আগ থেকেই মিসিং ছিলো। ঢাকায় নিহত হামলাকারীদের যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে তা দেখেই তারা শনাক্ত করেছেন। ছবিটি আইডেন্টিফাই করা ব্যক্তি এও বলেছেন, ছেলেটাকে একটু মোটা লাগছে কিন্তু প্রচুর মিল আছে তা বলা বাহুল্য। তিন মাস যদি মিসিং থাকে তাহলে এই সময়ের ট্রেনিংয়ে শারীরিক এই অবয়ব হয়তো সম্ভব।

নিবরাস ইসলাম

হামলাকারীদের আরেক জন নিবরাস ইসলাম নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। সাবেক সহাপাঠীরা শনাক্ত করে তার ছবি ও পরিচয় সামনে এনেছেন।

দ্য এশিয়া ফয়েলসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ নেওয়াজ লিখেছেন, আমি আমার চিন্তাগুলোকে এক জায়গায় করতে চেষ্টা করছি। হামলাকারীদের মধ্যে অন্তত দুই জনকে আমাদের অনেকেই চেনে। কয়েকবছর আগে এদেরই একজনকে (নিবরাস ইসলাম) আমি কাছ থেকেই দেখেছি। এদেরই একজন ফুটবল খেলতে পছন্দ করতো, তার আচরণের জন্য বেশ জনপ্রিয় ছিল। এই ছেলেই কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে চেক-ইন দিতে পছন্দ করতো। দুজনকেই গত ফেব্রুয়ারি থেকে পাওয়া যাচ্ছিল না।

রোহান ইমতিয়াজ

আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর কমিটির যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক ইমতিয়াজ খান বাবুলের ছেলে রোহান ইমতিয়াজ। ফেসবুক দেখে বোঝা যায়, তিনি কিছুদিন ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি ফেসবুকে ছেলের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘প্লিজ কাম ব্যাক’

রোহান ইমতিয়াজের পরিচয় প্রকাশ করেন মুন্সী বাধন নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী। সাইটের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে তার এক বন্ধুর মাধ্যমে। কিন্তু পুলিশের পরিচয়ের সঙ্গে এর মিল নেই। এ প্রশ্নে মুন্সী বলেন, কোনও ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের সঠিক পরিচয় তুলে ধরাটাই আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ। যখন তারা আমাদের ভুল তথ্য দেন, তখন আসলে প্রশ্ন জাগে, আমাদের ইন্টেলিজেন্সের দায়িত্বে থাকা বাহিনীর ব্যর্থতার কারণেই জঙ্গি হামলাগুলো হচ্ছে কি না।

তবে রোহান ইমতিয়াজ ও ইমতিয়াজ খান বাবুলের একসঙ্গে ছবি পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে ইমতিয়াজ খান বাবুলের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তাসিন রওনক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। এছাড়া আরেক তরুণের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি।

তাসিন রওনকঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার মাহবুবুল আলম এ বিষয়ে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চার হামলাকারীর যে পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে তা ঠিক আছে।’

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরামের পক্ষ থেকে ড. রায়হান রশিদ বলেন, ‘আমরা যদি মনে করি জিম্মি পরিস্থিতির অবসানের সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে, তাহলে ভুল করবো। ভয়ংকর এক জিম্মি পরিস্থিতির অবসান হয়েছে মাত্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর এখন আরও কঠিন দায়িত্ব বর্তেছে এই মুহূর্তে- আর তা হলো অংশগ্রহণকারী এই ৫ জঙ্গির ব্যক্তিগত, পারিবারিক নেটওয়ার্ক ও সামাজিক পরিমণ্ডলের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। ৫ তরুণ বিচ্ছিন্নভাবে হঠাৎ করে জঙ্গি অপারেশন করে বসে না; তাদের কর্মকাণ্ডের পেছনে একটি সাপোর্ট নেটওয়ার্ক থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তাই ভবিষ্যতের নিরাপত্তার স্বার্থেই তাদের সেই নেটওয়ার্কটির ওপর সঠিক তদন্ত হওয়ার দরকার। তবে সেক্ষেত্রেও এটুকু নিশ্চিত করে যে কোন অবস্থাতেই যেন কারও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত না হয়।

পরিচয় পাওয়া যায়নি অমি রহমান পিয়াল লিখেছেন, একটা প্যাটার্ন কিন্তু চোখে পড়তেছে। নাস্তিক হত্যার নামে ব্লগার খুন কিংবা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা আসলে নৃশংসতার প্রথম পাঠ। হাতেখড়ি। যোগ্যতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় উত্তরণ। এরপর বিদেশে তাদের নিবন্ধন, ট্রেনিং এবং বড় কিছু ঘটানোর জন্য দেশে ফিরে আসা।

গুলশান হামলায় জড়িত প্রত্যেকেই চার পাঁচ মাস ধরে নিখোঁজ ছিলো। কিছুদিন আগে মাদারীপুরে ধরা পড়া জঙ্গি ফাহিম বাড়িতে ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলো সে বিদেশ যাচ্ছে। তারও কিছুদিন আগে সিঙ্গাপুরে ধরা পড়ে সে দেশে প্রশিক্ষণ নেওয়া বেশ কজন জঙ্গি। পাকিস্তান বা আফগানিস্তান নয়। জঙ্গিদের অভয়ারণ্য এখন সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া। তাদের কাগজপত্র রেডি থাকে। ঘটনা ঘটিয়েই চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে চড়ে বসে তারা। আমার মনে হয় এদের শেকড় উপড়াতে এই জায়গাগুলোতেই নজরদারি এবং গোয়েন্দা সংশ্লেষ বাড়ানো জরুরি…। খবর: বাংলা ট্রিবিউন।