মেইন ম্যেনু

বিশ্বাসঘাতক ব্লেয়ার

লিবিয়াতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক কর্নেল মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির পতনে বিদ্রোহীদের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল যুক্তরাজ্য। অথচ এর আগ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল বেশ উষ্ণ। এই সম্পর্ক সৃষ্টির পেছনের ঘটনা এবং গাদ্দাফির পতনে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা নিয়ে শুক্রবার এক নিবন্ধ প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।

‘এ ব্রিফ হিস্টোরি অব ইউকে-লিবিয়া রিলেশন্স’ অর্থাৎ ‘যুক্তরাজ্য-লিবিয়া সম্পর্কের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ শিরোনামে এ নিবন্ধে উঠে এসেছে দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক।

এক সময় অনেক গাদ্দাফি বিরোধীকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের কারাগারে আটকে রেখে নির্যাতন করেছে। মার্কিন গোপন নথিতে এমন তথ্যই মিলছে। অথচ গাদ্দাফি পতন আন্দোলন শুরু হলে এই বিদ্রোহীদের দেশে ফেরার সুযোগ করে দেয় যুক্তরাজ্য সরকার।

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারির কোনো এক রোববার ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী উইলিয়াম হেগ একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ফোনকল পান। কলটি ছিল গাদ্দাফির সবচেয়ে ঘনিষ্ট পুত্র সাইফ আল ইসলামের।

এই ফোনে গাদ্দাফি সরকারের পক্ষে তিনি যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তা কামনা করেন। তবে তিনি প্রত্যাখ্যাত হন।

গত সপ্তাহে ব্রিটেনের সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক এবং গাদ্দাফির পতনে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপ বিষয়ে সংসদীয় তদন্ত কমিটির জেরার মুখে হেগ সে সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘সে (সাইফ আল ইসলাম গাদ্দাফি) বলছিল, লিবিয়াতে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিদ্রোহীদের দমনে সে তার সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্য এবং পশ্চিমাদের সাহায্য চেয়েছিল।’

হেগ বলেন, ‘সে আমাকে বোঝাতে চাইলো, তার দেশ আমাদের জন্য বন্ধুভাবাপন্ন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকা কোনো বন্ধু দেশ বিপদে পড়লে তার সাহায্যে এগিয়ে আসা কর্তব্য।… আমার মনে হয় সে ভুল বুঝেছে। তবে তার ভুল ভাঙতে বেশি দেরি হলো না।’

হেগের এই বক্তব্যই প্রমাণ করে গাদ্দাফির সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে ছিল! যদিও ১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকারবিতে একটি মার্কিন বিমানে লিবীয় নাগরিকের বোমা হামলা, ১৯৮৪ সালে লন্ডনে লিবিয়ার দূতাবাস থেকে গুলি করে এক নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা এবং ১৯৮৬ সালে যুক্তরাজ্য লিবিয়াতে মার্কিন বিমান হামলা সমর্থন করার ঘটনায় দশকব্যাপী বৈরী সম্পর্ক বিরাজ করছিল। পরবর্তীতে কিছু ঘটনা যুক্তরাজ্য এবং লিবিয়ার সরকারের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ট করে।

২০১১ সালে লিবিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয়গুলো থেকে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন কাগজপত্র থেকে জানা যায়, মিত্রতার নমুনা হিসেবে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করা লিবিয়ার গাদ্দাফি বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল দেশটি। অনেককে গৃহবন্দিও করে রাখা হয়েছিল।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘ডিল ইন দ্য ডেজার্ট’ খ্যাত দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি। ২০০৪ সালে ত্রিপোলির এক শহরতলীতে একটি তাঁবুতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার গাদ্দাফির সঙ্গে এক চুক্তি করে যা ‘ডিল ইন দ্য ডেজার্ট’ বা ‘মরু প্রান্তরে চুক্তি’ নামে খ্যাত। এই চুক্তি গাদ্দাফিকে তাদের একজন আন্তর্জাতিক শত্রু থেকে ঘনিষ্ট মিত্রতে পরিণত করে।

২০০৭ সালের মে মাসের ছবি, লিবিয়াতে তোলা

২০০৭ সালের মে মাসের ছবি, লিবিয়াতে তোলা

ধারণা করা হয়, ব্লেয়ারের মধ্যস্থতায় গাদ্দাফিকে তার পরমাণু এবং রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে রাজি করানোর কয়েক মাস পর হওয়া এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের লিবিয়া অভিযানের বিষয়ে দুই দেশকেই জটিলতায় ফেলে।

তবে এই লাভজনক চুক্তিতে উপকৃত হয়েছিল যুক্তরাজ্যের তেল কোম্পানিগুলো। গাদ্দাফিও তার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লন্ডনে সরিয়ে ফেলেন এবং সেখানকার প্রভাবশালীদের সঙ্গে মেশার সুযোগ পান। তার ছেলে লন্ডনের স্কুল অব ইকোনোমিকস থেকে পান একটি পিএইচডি।

এতে গাদ্দাফি এবং ব্লেয়ারের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ট হয়। তবে অনেকেই ব্লেয়ারের এ কাজের সমালোচনা করেন।

টনি ব্লেয়ারের প্রথম লিবিয়া সফরের কয়েকদিন আগে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পথে মালয়েশিয়াতে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীসহ আটক হওয়া দেশটির বিরোধী দল লিবিয়ান ইসলামিক ফাইটিং গ্রুপের (এলআইএফজি) নেতা আবদেল হাকিম বেলহাজিকে ত্রিপোলিতে ফিরিয়ে দেয় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।

ওই সময় যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ এর সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের প্রধান মার্ক অ্যালেন লিবিয়ার গোয়েন্দা প্রধান মুসা কুসাকে দেয়া এক ফ্যাক্স বার্তায় বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের সৃষ্ট এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে তোমাদের জন্য আমরা যা করতে পারি এটা তার ন্যূনতম নমুনা।’

এরপর ছয় বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয় বেলহাজকে। কারাগারে তাকে নির্যাতন করার অভিযোগও রয়েছে। ২০১৩ সালে তিনি জানান, তাকে ব্রিটিশ গোয়েন্দারাও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

এলআইএফজির আরেক নেতা সামি আল সাদিকেও হংকং থেকে সস্ত্রীক আটক করে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা। ২০১২ সালে তাকে আটকের দায় অস্বীকার করে ৩.৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে আদালতের বাইরে সমঝোতায় রাজি হয় যুক্তরাজ্য সরকার। তবে তার আটকের বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের ক্ষমা চাওয়ার মামলাটি এখনো দেশটির উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অর্গানইজেশনের নীতিনির্ধারণী পরিচালক করি ক্রাইডার বলেন, ‘বেলহাজ এবং আল সাদির পরিবারকে গাদ্দাফি সরকারের কাছে প্রত্যর্পণ টনি ব্লেয়ারের এমআই-৬ ছাড়া অসম্ভব ছিল।’

অপর এক এলআইএফজি সদস্য জায়েদ হাশেম জানান, কোনো মামলা ছাড়াই তাকে ১৮ মাস যুক্তরাজ্যের কারাগারে আটকে রাখা হয়। ধারণা করা হয়, লিবিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাই তাকে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘বিপ্লব শুরু হলে ব্রিটেনের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায়। আমার প্রতি তাদের কথা বলার ধরনে পরিবর্তন আসে। তারা আমাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্রিটেনে থাকতে বলে। এমনকি আমাকে নাগরিকত্বও দিতে চায়!’

গাদ্দাফির সঙ্গে ‘ডিল ইন দ্য ডেজার্টে’র পরে যেসব নির্বাসিতকে ধরা হয় তাদের অনেককেই গাদ্দাফি বিরোধী আন্দোলনের সময় নিজ দেশে ফিরে যেতে দেয়া হয়।

তবে এ চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে নিজের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই বলে ২০১১ সালে এ সাক্ষাৎকারে জানান টনি ব্লেয়ার। তিনি বলেন, ‘গাদ্দাফির ভুলের কারণেই তার পরাজয় ঘটেছে এবং তার দেশে অভ্যন্তরীণ সংস্কার এসেছে।’

মানবাধিকার সংগঠন সিএজিই’র প্রচার সম্পাদক মোয়াজ্জেম বেগ বলেন, ‘বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য অনেক সাবেক এলআইএফজি নেতাকে দেশে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং ত্রিপোলি বিজয়ে বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেন বেলহাজ। হাস্যকার বিষয় হচ্ছে, এক সময়ের শত্রু তখন সরসরি যুক্তরাজ্য সরকারের বিমান সহায়তা পায়।’

তবে চুক্তি থাকা সত্ত্বেও গাদ্দাফি বিরোধী আন্দোলনের সময় তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার বিষয়কে ‘নীতিগত ভুল’ বলতে নারাজ ২০০২ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এমআই-৫ এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এলিজা ম্যানিংহাম বুলার। ২০১১ সালে এই নারী গোয়েন্দা বলেন, ‘গাদ্দাফিকে তার অস্ত্র কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে তার সাথে চুক্তি এবং পরে ভঙ্গ করা কোনো নীতিগত ভুল নয়।’

সম্প্রতি সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ফাঁস হওয়া এক ইমেইল থেকে জানা যায়, গাদ্দাফির সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ত্রিপোলিতে বিদ্রোহের সময় যখন ফোনে গাদ্দাফি যুক্তরাজ্যের সহায়তা চান তখন টনি ব্লেয়ার তা অস্বীকার করে তাকে জানিয়ে দেন, তার যাওয়ার নিরাপদ কোনো জায়গা থাকলে তিনি যেন সেখানে চলে যান।

এভাবে যুক্তরাজ্যের এক সময়কার ঘনিষ্ট মিত্র থেকে গাদ্দাফি তাদের শত্রুতে পরিণত হয় এবং গাদ্দাফির পতনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে দেশটি। অবশ্য যে আশাতে পশ্চিমারা গাদ্দাফির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাতে খুব একটা লাভবান হতে পারেনি। লিবিয়া এখনো অস্থির। দেশটির নাগরিকদের অনেকেই নতুন করে স্মরণ করছে গাদ্দাফিকে।