মেইন ম্যেনু

বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন এবং বিপজ্জনক পেশা

গত মাসখানেক ধরে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিবিদদের নির্ঘুম অবস্থা চলছে। ২০১১ সালের বাজার অর্থনীতির ধসের পর চলতি বছর শুরু হয়েছে স্বর্ণ মূল্যের অবনমন। প্রতি সপ্তাহেই আনুপাতিক হারে কমছে স্বর্ণের দাম। যেহেতু স্বর্ণের উপর মুদ্রার তারল্যমান নির্ভর করে তাই ঠিক কবে নাগাদ স্বর্ণের দাম বাড়বে সেই চিন্তায় অনেকের ঘুম হারাম। স্বর্ণের দাম বাড়া কিংবা কমা আমাদের আলোচ্য বিষয় না হলেও এই স্বর্ণ উত্তোলনের যে পেশা এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোই বরংচ আমাদের আলোচনার বিষয়।

একটা কফিনও ঠিক মতো প্রবেশ করানো যাবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু নরম মাটির ভেতর এরকমই ছোটো ছোটো সুরঙ্গের মাঝে দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন একদল মানুষ স্বর্ণ উত্তোলনের জন্য। খনির বাইরে প্রচণ্ড নিরাপত্তা ব্যবস্থা যতটা বাইরের অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য, ঠিক তার চেয়েও বেশি হলো খনি শ্রমিকদের জন্য। খনি শ্রমিকরা যাতে বাইরে যেতে না পারে এবং কোনো স্বর্ণ নিয়ে যেতে না পারে তাই এই ব্যবস্থা।

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের স্বর্ণ খনি বিশ্ব বিখ্যাত। বিশ্বের মোট স্বর্ণ চাহিদার বিশাল অংশ একাই সরবরাহ করে দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রতিদিন হাজারখানেক খনি শ্রমিক এই স্বর্ণ উত্তোলনের কাজ করেন। একটা সময় ছিল যখন আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ জোহানেসবার্গের খনিগুলোতে কাজ করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, আফ্রিকার শ্রমিকদের তুলনায় অন্যান্য মহাদেশ থেকে আগত অভিবাসী শ্রমিকরাই অধিক কাজ করছে খনিগুলোতে।

স্বর্ণ খনির জীবন প্রচণ্ড অমানবিক জেনেও প্রতিদিন অনেক অভিবাসী শ্রমিক এই প্রাণঘাতী কাজে নাম লেখাচ্ছে। অথচ তাদেরই উত্তোলিত স্বর্ণ বিশ্বের অগুনতি মানুষের বিলাস ব্যসনের প্রয়োজনীয়তা মেটাচ্ছে। এমনও অনেক শ্রমিক আছেন যারা দক্ষিণ আফ্রিকা এসেছিলেন উন্নত ভাগ্যের আশায়। সম্মানজনক কোনো পেশার মাধ্যমে পরিবারকে সহায়তা করার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা অবৈধ উপায়ে দক্ষিণ আফ্রিকা আসে।

কিন্তু প্রশাসনিক তৎপরতা আর বিভিন্ন চক্রের কারণে ওই অভিবাসী শ্রমিকদের বাধ্য হয়ে খনিতে কাজ করতে হয়। খনিতে কাজ করলে তাদের জোর করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয় না, আর যদি কেউ খনিতে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায় তখন তাকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে কোনো অভিবাসী যদি সম্মনজনক কাজের বিনিময়ে প্রশাসনকে মোটা অর্থ ঘুষ দেয় তাহলে তাকে খনিতে কাজ করতে হয় না। কিন্তু এই উৎকোচ দেয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।

জোহানেসবার্গের একটি স্বর্ণখনির শ্রমিক দাভলু। তিনিও কাজের আশায় অবৈধ উপায়ে দক্ষিণ আফ্রিকা এসেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য তার এসে দাড়িয়েছে খনির অন্ধকারাচ্ছন্ন কুঠুরির সামনে। ‘প্রায়শ মাটি এবং পাথর আমাদের চাপা দিয়ে দেয়। এর মাঝেও যদি আমরা কাজ বন্ধ করে দেই তাহলে আমাদের বেধরক মারধর করা হয়। এই কাজ খুবই কঠিন এবং বিপজ্জনক।

স্থানীয় ভাষায় স্বর্ণ খনি শ্রমিকদের বলা হয় ‘জামা জামা’। গত ২০১৪ সালে বিরোধী একদল সশস্ত্র গোষ্ঠী খনির স্বর্ণ চুরি করে নিয়ে যায় এবং প্রায় দুই শতাধিক জামা জামাদের খনির মধ্যে ফাঁদে আটকে রেখে আসে। ওই ঘটনায় কিছু সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিককে উদ্ধার করা হলেও, অগুনতি সংখ্যক মানুষকে উদ্ধার করা যায়নি। খনির প্রকোষ্ঠে তাদের কবর রচনা হয়ে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এই ঘটনা এত সচরাচর ঘটে যে, কোনো গণমাধ্যমে পর্যন্ত এবিষয়ে কোনো সংবাদ পরিবেশিত হয়নি।

BLACK

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রশাসন অদ্ভুত নির্লজ্জতার সহিত এই ঘটনাগুলোকে স্রেফ চেপে যায়। এমনকি এরকম ঘটনা ঘটলে উল্টো অভিবাসী শ্রমিকদেরই জেল-জরিমানা করা হয়। তবে কিছুক্ষেত্রে বিরোধী খনি শ্রমিকদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালাতে হয় পুলিশকে। কিন্তু খনির প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে, এই কারণে পুলিশেরাও খনিগুলোতে প্রবেশ করতে চায় না।