মেইন ম্যেনু

বিশ্বের ১০০ ঐতিহাসিক নগরীর একটি

বার ভূঁইয়াদের কথা কম-বেশি প্রায় সবারই জানা। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করত কিছু ভূস্বামী। ইতিহাসে তারা বার ভূঁইয়া হিসেবে পরিচিত। বার ভূঁইয়ারা একেকজন স্বাধীন রাজার মতো বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবর তার জীবদ্দশায় এই বাংলার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। প্রবল শক্তিধর মুঘল সেনাপতি মানসিংহও ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন পরাক্রমশালী ঈশা খাঁর প্রতাপের কারণে। ঈশা খাঁ (১৫২৯-১৫৯৯) ছিলেন বাংলার বার ভূঁইয়াদের নেতা। অসাধারণ বীরত্বের কারণে তিনি এই বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন। আগে সোনারগাঁওয়ের নাম ছিল সুবর্ণগ্রাম। ঈশা খাঁ ত্রিপুরার রাজকন্যা স্বর্ণময়ীকে বিয়ে করে তার নাম রাখেন ‘সোনা বিবি’। সোনা বিবির নামানুসারেই তিনি বাংলার রাজধানীর নামকরণ করেন- সোনারগাঁও।

মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদী বিধৌত সোনারগাঁও একটি প্রাচীন জনপদ। এই জনপদের বয়স কয়েক শতাব্দী। তবে প্রকৃত বয়স কত, এটি অধিকতর গবেষণার বিষয়। চৈনিক পরিব্রাজক পণ্ডিত উয়ান চুয়াংয়ের (হিউয়েন সাং) মতে, তৎকালীন সুবর্ণগ্রাম একটি উল্লেখযোগ্য ও পরিচিত জায়গা। এখানে ছিল একটি নদীবন্দর, যার পরিচিতি উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছেছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এখানে যে প্রাচীন গ্রিক নাবিকদের যাতায়াত ছিল, তার প্রমাণ মেলে গ্রিক ‘পেরিপ্লাস’ বইয়ে। এই এলাকা ছিল চারু ও কারুশিল্পজাত দ্রব্যের জন্য বিখ্যাত। ঐতিহাসিক এবং বিদগ্ধ প-িতদের ধারণা, এসব দ্রব্যের কারণেই বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বণিকরা এখানে আসত। হিন্দু পুরাণেও এ অঞ্চলের উল্লেখ আছে। সুবর্ণগ্রামের সুক্ষ্ম বস্ত্রের (মসলিন) জন্য পুরাণের রাণী ‘কৈকিয়ী’ একবার আবদার করেছিলেন। শুতরাং পণ্ডিতদের ধারণা, মিথই হোক আর ইতিহাস, সোনারগাঁওয়ের সমৃদ্ধি আসলে খৃষ্টপূর্বকাল থেকেই ছিল। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, শেরশাহর আমলে এখান থেকে তৈরি হয়েছিল একটি দীর্ঘ সড়ক পথ। সেই সড়ক নাকি চলে গিয়েছিল সুদূর সিন্ধু পর্যন্ত, যা গ্র্যান্ড ট্র্যাঙ্ক রোড নামে পরিচিত। চারু ও কারুশিল্পের ইতিহাসে সোনারগাঁও কিংবদন্তী হয়ে আছে। এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের বর্ণাঢ্য শেষ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পানাম সিটি বা পানাম নগরী।

পানাম নগরীর অবস্থান ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায়। এই নগরীই যে প্রাচীন বাংলার রাজা, আমির-উমরাহদের বাসস্থান ছিল, তার প্রমাণ নগরীর স্থাপত্য নিদর্শনেই পাওয়া যায়। ‘ওয়ার্ল্ড মন্যুমেন্ট ফান্ড’-এর তথ্য মতে, বিশ্বের ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক নগরীর একটি হল পানাম সিটি। সংস্থাটি ২০০৬ সালে এই তালিকা প্রকাশ করে। সুতরাং পানাম সিটি কেবল বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গার একটি। এখানকার স্থাপনাগুলোতে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর প্রাধান্য দেখা যায়। তবে এতে পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণ ঘটেছে। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, এতে গ্রিক নির্মাণশৈলীরও সংমিশ্রণ আছে। প্রতিটি বাড়ির নকশা ও আকার ভিন্ন ভিন্ন। গবেষণায় জানা গেছে, এটি ছকে আঁকা কোনো নগরী নয়। সুতরাং এতে বাঙালির নিজ নিজ নির্মাণ কৌশলের ছাপ পাওয়া যায়। প্রতিটি বাড়িতে ব্যাবহার করা হয়েছে ঢালাই লোহার তৈরি ব্র্যাকেট। জানালায় ব্যবহার করা হয়েছে লোহার গ্রিল। ঘরে বাতাস চলাচলের জন্য ছিল ভেন্টিলেটরের সুবন্দোবস্ত। আরো ছিল ইউরোপের মতো কাস্ট আয়রনের নিখুঁত শিল্পকর্ম। এ ছাড়াও মেঝেতে লাল, সাদা ও কালো মোজাইকের কারুকাজ লক্ষণীয়। নগরীর ভেতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও রয়েছে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মঠ, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবার কক্ষ, বিচারালয়, গুপ্তপথ ইত্যাদি। প্রায় প্রতিটি ভবন নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থিত। ভবনগুলো প্রধানত দুটি অংশে বিভক্ত- অন্দরমহল এবং বাহির বাড়ি। একটি সরু রাস্তা নগরীর ভেতর দিয়ে চলে গেছে। বাড়িগুলো মূলত রাস্তার দুপাশ ধরে গড়ে ওঠা।

নিরাপদ পানির জন্য প্রতিটি বাড়িতেই পাতকূপের ব্যবস্থা ছিল। নগরীতে যেন পানির সমস্যা না হয়, এজন্য অতিরিক্ত পাঁচটি পুকুর খনন করা হয়েছিল। সার্বক্ষণিক নদীর পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং একই সঙ্গে নগরীতে যাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়, সে লক্ষ্যে দুটি খাল খনন করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি খাল মনিখালী নদী হয়ে মেঘনায় মিশেছে। এই খালের ওপর আদমপুর বাজারের কাছে মুঘল আমলের একটি সেতু আছে। এটি তলদেশ থেকে ২৮ ফুট উঁচু। ১৪ ফুট প্রশস্ত এবং ১৭৩ ফুট লম্বা। এ ছাড়া আশপাশে আরো দু-একটি সেতু আছে। আছে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেনশাহী আমলের একটি মসজিদ, এর নাম- গোয়ালদী হোসেনশাহী মসজিদ। কাছেই দুলালপুর নামক গ্রামে ব্রিটিশ আমলে নীল চাষের নির্মম ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে নীলকুঠি।

১৯৭১ সালের পর থেকে ইতিহাসের সাক্ষী এই ভবনগুলো ইজারা দেওয়া হয়। যথেচ্ছ ব্যবহারে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ২০০৪ সালে অবশ্য ইজারা দেওয়া বন্ধ হয়। ঠিক তার পরের বছরই দুটি বাড়ি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে আছে প্রায় প্রতিটি ভবন। মাঝের সড়ক দিয়ে নির্বিঘ্নে প্রতিনিয়ত মালবোঝাই যানবাহন চলাচল করছে, যা স্থাপনাগুলোর সাভাবিক স্থায়িত্বেও জন্য ক্ষতিকর। রাষ্ট্রের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নগরীর ভবনগুলোতে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করে সংস্কারের কাজ হাতে নিয়েছিল। কিছুদিন সংস্কারের পর তা ফেলে রাখা হয়। স্থানীয় ও সচেতন অনেকেই মনে করেন, সংস্কারের নামে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে মূল নকশা, কাঠামো, কারুকাজ।
ঐতিহাসিক নগরীর হিসেবে পানাম নগরী হয়ে উঠতে পারে একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এর জন্য যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।