মেইন ম্যেনু

বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে যে স্থানটি! (ছবি সহ)

নরওয়েকে প্রশাসনিকভাবে ১৯টি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলোকে নরওয়েতে কাউন্টি বলা হয়। এর একটির নাম টেলেমার্ক। টেলেমার্কের নটোডেন অঞ্চলে প্রায় দুই শত বছর আগে গড়ে ওঠে একটি শিল্পাঞ্চল। যা আজ সারা বিশ্বে সমাদৃত। নটোডেন শুধু নয়, প্রতিবেশী রজকুন শিল্পাঞ্চলও জগদ্বিখ্যাত। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেসকো) ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পাঞ্চলকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

শিল্পবিপ্লবের শুরু আঠারো শতকের শেষের দিকে। প্রথমে ইংল্যান্ড তারপর আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপে। তারপর সমগ্র পশ্চিমে এবং এরপর সারা বিশ্বে। মানবসভ্যতায় অভ্যুদয় ঘটে নতুন যুগের। শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে পরিচিত স্ক্যান্ডেনেভিয়ান রাষ্ট্র নরওয়েতে এ বিপ্লবের হাওয়া মোটামুটি অনুভূত হয় উনিশ শতকের গোড়ার দিকে। নটোডেনের ঐতিহ্যবাহী শিল্পস্থাপনাগুলো ছিল নরওয়েতে শিল্পবিপ্লবের ধারাকে ত্বরান্বিত করার ঐকান্তিক প্রয়াস। বিশ শতকের গোড়ার দিকে নরওয়েতে মোটামুটিভাবে জলবিদ্যুৎ সহজলভ্য হয়ে ওঠে। প্রায় সমসময়ে ক্রিস্টিয়ান বেকল্যান্ড নামের একজন পদার্থবিদ বাতাস থেকে নাইট্রোজেন শোষণের প্রক্রিয়াকে উন্নত করেন। সার তৈরির অন্যতম উপাদান নাইট্রোজেন। দুইয়ে দুইয়ে যেমন চার হয়, তেমনি এই দুই প্রযুক্তির সমন্বয়ে নরওয়েতে শিল্পবিপ্লব দ্বিগুণ ত্বরান্বিত হয়।

5

পাহাড়ের পাদদেশে রজকুন শিল্পপার্কের একাংশ

নটোডেন শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। নরওয়ের টেলমার্ক প্রদেশে ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নরস্ক-হাইড্রো কোম্পানি। টেলমার্ক ছিল তৎকালীন অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ একটি জনপদ। তবে নরস্ক-হাইড্রো কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অঞ্চলটিতে আরো বেশি উন্নতির ছোঁয়া লাগতে শুরু করে। নরস্ক-হাইড্রো মূলত অ্যালুমিনিয়াম, জলবিদ্যুৎ ও সৌরশক্তির আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। এই কোম্পানিটি প্রকৃতপক্ষে আধুনিক নটোডেন শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি কৃতিত্বের দাবিদার।

4

রজকুন শিল্পাঞ্চলঘেঁষা জলপ্রপাত

আজকের দিনে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পপার্ক স্থাপনের যে ধারণা প্রসার পেয়েছে, তা সম্ভবত নটোডেন-রজকুন শিল্পাঞ্চল স্থাপনের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। শিল্পাঞ্চলটি নদী, ঝরনা ও উপত্যকাবিধৌত টেলমার্কে অবস্থিত। এটিকে শিল্পাঞ্চল না বলে শিল্পপার্ক বলাই ভালো। শিল্পাঞ্চলটির মধ্যে রয়েছে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, সার উৎপাদনের কারখানা, উৎপাদিত সার লোড ও আনলোডর চমৎকার ব্যবস্থা, পরিবহণ সুব্যবস্থা এবং সর্বোপরি কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের থাকার সুব্যবস্থা। পুরো শিল্পাঞ্চলটি ছবির মতো সাজানো। দেখে যে কারোর-ই দৃষ্টিভ্রম হতে পারে, এটা শিল্পাঞ্চল, না পার্ক?

3

নটোডেন শিল্পাঞ্চল, যার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ছোট নদী

প্রায় দুই শতাব্দী ধরে টিকে থাকা নটোডেন শিল্পাঞ্চল এতটাই সুন্দর যে, দেখলে মনে হবে কোনো চিত্রকর একটি কল্পিত শিল্পপার্ক তার রংতুলিতে ফুটিয়ে তুলেছেন আপন খেয়ালে। আবার কারো মনে হতে পারে, প্রকৃতি যেন একটু বেশি সহায় হয়েছে নটোডেনের জন্য। এই ভাবালুতা কাজ করতে পারে যে কারো। কিন্তু মূল বিষয় হলো- মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সাজানো হয় এই শিল্পাঞ্চল। শিল্পের জঞ্জালে যেন মানুষ হুমকির মুখে না পড়ে, সে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে নটোডেনে। যে কারণে এই শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত। শ্রম বিনিয়োগের জন্য শ্রমিকদের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আগে।

2

রজকুনে পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, যা শিল্পপার্কে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে

নরওয়ের টেলমার্ক প্রদেশের নটোডেনে গেলে দেখা যাবে একদিকে পাহাড়ি ঝরনা, তো অন্যদিকে নদীবিধৌত সমতলভূমি। চোখ ফেরালেই উপত্যকার মাঝে ছড়ানো দৃষ্টিনন্দন কারখানা ও বাড়ি। দিনে কোলাহল, রাতে নিঝুম নিস্তব্ধতা। আছে পাহাড়ি সৌন্দর্যের হাতছানি। আবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসার রোমাঞ্চর অনুভূতি দাগ কেটে যাবে মনে। নটোডেনের মধ্যে প্রবাহিত নদীগুলোতে ঘোরা যায় অল্প খরচে। নদী পার হওয়ার জন্য আছে ফেরি ও নৌকা। সবমিলিয়ে পার্কের মতো সবকিছু সাজানো-গোছানো, সুনসান-পরিপাটি।

index1

নটোডেনে নদীতীরে গড়ে ওঠা ইন্ডাস্ট্রি

নটোডেন ও রজকুনে যেসব পাহাড়ের পাদদেশে ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে, সেসব পাহাড়ের ওপরের ভাগ যেন দিগন্তজোড়া সবুজের হাতছানি দিয়ে যায়। পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ অন্যরকম তৃপ্তি দেয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, পাহাড় কেটে নটোডেনবাসী তৈরি করেছে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। পর্যটকরা পাহাড় বেয়ে উঠে তা দেখে আসতে পারেন।

index

নটোডেনের প্রকৃতি

পাহাড়-নদী-ঝরনার অপূর্ব সন্নিবেশে আর মানুষের পরিকল্পনায় নরওয়ের এই শিল্পাঞ্চল জগদ্বিখ্যাত। কলকারখানার ভেতরটা কর্মব্যস্ত। বের হলেই পাহাড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে নিস্তব্ধতা উপলব্ধি করার সুযোগ রয়েছে। আবার পাহাড়ি ঝরনা থেকে সৃষ্ট নদীতে আলগা বাতাস গায়ে লাগিয়ে নিতে পারেন যে কেউ। সত্যিই মন হারাতেই হবে।

ইউনেসকোর ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, রজকুন-নটোডেন শিল্পাঞ্চলটি ব্যতিক্রমী শিল্পস্থাপনার পরিচয় বহন করে। বিশ শতকের যেকোনো শিল্পাঞ্চলের জন্য নটোডেন ছিল দৃষ্টান্ত। বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর অনেকেই নটোডেনের শিল্পসৌন্দর্য দেখতে যাচ্ছেন। তাদের জন্য অগ্রিম কিছু তথ্য যদি এই লেখার মধ্য দিয়ে দিতে পারি, তবেই ধন্য হব।