মেইন ম্যেনু

বিয়ের জন্য নারী পাচার

‘আমার যখন ঘুম ভাঙে তখনও আমি বুঝতে পারিনি যে আমি চীনে চলে এসেছি’ ল্যান সেই রাতের কথা আমাদের বলছিলেন যে রাত তার জীবনের মোড় চিরদিনের জন্য ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ভিয়েতনামের ল্যান কলেজ পাঠ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য চেষ্টা করছিলেন। তখনই অনলাইনে এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হয় এবং সেই বন্ধু তাকে একটি গ্রুপে খাবারের জন্য দাওয়াত দেয়। সেখানে যাবার পর খাওয়া দাওয়া শেষে যখন ল্যান বাড়িতে আসতে চাইছিল তখন তাকে আরও কিছুক্ষণ থাকতে এবং পানীয় পান করার জন্য জোরাজুরি করা হয়। এরপর আর তার কিছু মনে নেই। ল্যান যখন ঘুম থেকে উঠলেন তখন ততক্ষণে তিনি চীনে চলে এসেছেন মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে।

‘পরিস্থিতি বুঝে উঠতেই আমি পালিয়ে যেতে চাইছিলাম। কিন্তু গাড়িতে আমার সঙ্গে আরও অনেক মেয়ে ছিল এবং আমাদের সবাইকে পাহাড়া দেয়া হচ্ছিল।’ চীন-ভিয়েতনাম সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো মানবপাচারকারীদের শিকারের অন্যতম স্থান। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে এবং মাদক প্রয়োগ করে তাদের নৌকা, মোটরবাইক অথবা গাড়িতে করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে নিয়ে আসা হয় চীনে। ভিয়েতনামি নারীদের চীনে খুব চড়া মূল্যে বিক্রি করা হয়। চীনে এক সন্তান নীতির কারণে মেয়ে শিশুর সংখ্যা অনেক কম। যে কারণে পাশ্বর্বর্তী দেশগুলো থেকে নারীদের পাচার করে আনা হয় চীনা পুরুষদের জন্য।

জাতিসংঘের মানবপাচার প্রতিরোধ বিষয়ক সংস্থার ভিয়েতনাম শাখা সমন্বায়ক হা থাই ভান খান ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সাধারণ কোনো চীনা পুরুষ যদি কোনো চীনা মেয়েকে বিয়ে করতে চায় তবে অনেক টাকা গুনতে হয়। আর এই কারণেই তারা চেষ্টা করে পাশ্বর্বর্তী দেশ থেকে পাচার করে আনা নারীদের কিছু অতিরিক্ত টাকা দিয়ে হলেও কিনে নিয়ে বিয়ে করতে।’ চীনে বিয়ের পর পুরুষকে অবশ্যই নিজস্ব থাকার স্থান ব্যবস্থা করতে হয় এবং কণ্যাপক্ষকে একটা মোটা অংকের যৌতুকও দিতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রামীন চীনা পুরুষরা অর্থনৈতিক এই মন্দা পরিস্থিতিতে এত টাকা দিতে পারে না।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর সংবাদ মতে, ভিয়েতনামী নারীরা সাধারণত তিন হাজার ডলারের কাছাকাছি বিক্রি হয়। চীনের পুরুষদের কাছে ভিয়েতনামী মেয়েরা অনেক আকর্ষণীয় হবার কারণ মূলত দুই দেশের সংস্কৃতিগত মিল। এই সংস্কৃতিগত মিল থাকার কারণে একটু বেশি অর্থ হলেও ভিয়েতনামী নারীদেরই কিনতে চায় অবিবাহিত চীনা পুরুষরা। তবে পাশ্বর্বর্তী দেশ কম্বোডিয়া ও ভারত থেকে পাচার করে নিয়ে যাওয়া নারীদের অতটা কদর নেই চীনে। যে কারণে খুব অল্প দামেই তাদের বিক্রি করে দেয় পাচারকারীরা। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ভিয়েতনামী নারীদের বাদ দিলে অন্যান্য নারীদের শেষমেষ স্থান হয় কোনো যৌনপল্লীতে।

১৬ বছর বয়সী গুয়েনকে তার ছেলেবন্ধু জোর করে বিক্রি করে দেয়। চীনের একটি পরিবার তাকে মোটা টাকার বিনিমেয়ে কিনে নেয়। কিন্তু প্রায় তিন মাস প্রতিবাদ প্রতিরোধ করে বিয়ে আটকে রেখেছিল গুয়েন। কিন্তু এরফলে পরিবারটি তাকে শারিরীকভাবে অত্যাচার করতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে খাবার দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয় গুয়েনের। শেষমেষ বিয়েতে রাজি হতে বাধ্য হয় গুয়েন। যদিও তার বক্তব্য অনুযায়ী, তার চীনা স্বামী তাকে অনেক ভালোবাসেন এবং শান্তিতেই রেখেছেন। তবে তাই বলে আজও দেশে ফিরে যাবার আশা ত্যাগ করেননি তিনি। যার সঙ্গে গুয়েনের কোনো মানসিক সম্পর্ক নেই সেই মানুষের সঙ্গে বাস করতে চান না তিনি। গুয়েন যে তার স্বামীকে মেনে নিতে পারছেন না এটা বুঝতে পারেন তার শাশুড়ি। শেষমেষ আবারও তাকে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়া হয় এবং পাচারকারীরা জোর করে তাকে আবারও বিয়ে দেন।

ভিয়েতনামের পুলিশ প্রায়শই মানবপাচারকারীদের ধরতে সক্ষম হয়। গত বছর ভিয়েতনাম-চীন সীমান্ত থেকে মোট ১০৯জন ভিয়েতনামী মেয়েকে উদ্ধার করেছে সীমান্ত পুলিশ। কিন্তু অধিকাংশ মানবাধিকার সংস্থার মতে, সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে মানবপাচারকারীরা এতটাই শক্তিশালী যে খুব কম সময়ের ব্যবধানে নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলে তারা এবং আবার নারী পাচার করতে শুরু করে। এমনও হয়েছে যে, একবার পাচার হবার সময় পুলিশের হাতে ধরে পরা ভিয়েতনামী নারীকে আবারও পাচার করে দেয়া হয়েছে কিছুদিন পরেই।