মেইন ম্যেনু

বিয়ের ১০ বছর পর যৌতুকের বলি গৃহবধু : পাষন্ড স্বামী পলাতক

হামিদা আক্তার বারী, ডিমলা করেসপন্ডেট, নীলফামারী : দেখতে দেখতে বিয়ের ১০টি বছর কেটে যায়। বিয়ের প্রায় চার বছরে সংসার জীবনে কোল জুড়ে পৃথিবীতে আসে একটি পুত্র সন্তান। মা-বাবা মিলেই ফুটফুটে সন্তানটির নাম রাখে আবু সায়েম (৬)। ছেলে শিশুকে অতি যত্নে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় মা মুক্তি পারভীন (২৮)। নির্যাতনের শিকার মৃত মুক্তি’র পিতা-মৃত আব্দুল লতিফ এর বাড়ী নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী ইউনিয়নের হাজিপাড়া গ্রামে। অনেকটা ধুমধাম করে পারিবারিক আলোচনা সাপেক্ষে তরুনী মুক্তির বিয়ে হয় একই উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের চাপানীর হাট সংলগ্ন মৃত-সইদার রহমানের পুত্র রফিকুল ইসলাম রফিকের সাথে নগদ আশি হাজার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে ২০০৬ সালে। বিয়ের বেশ কয়েকটা বছর ভালোই চলছিল মুক্তি-রফিকের সংসার জীবন। বিয়ের চার বছরের মধ্যে তাদের সংসারে আসে পুত্র সন্তানটি। হাটি-হাটি পা-পা করে বড় হতে থাকে শিশু সায়েম। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে খাতে গৃহবধুঁর উপড় নির্যাতনের মাত্রা। গৃহবধুঁর পাষন্ড স্বামী ধীরে ধীরে পর নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে।

এদিকে যতই দিন যায় ততই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় গৃহবধুঁ মুক্তি’র স্বামী-শাশুড়ী এমনকি বড় ভাবীও। শত নির্যাতনেও স্বামীর বাড়ী ছাড়তে চায় না মুক্তি। নির্যাতনের সময় শিশু সায়েম কাঁদতে থাকলে তাকেও ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখতো তার বাবা। কোন কিছুতেই যখন কোন কাজ হয় না ঠিক তখনেই যৌতুকের লোভে পড়ে স্বামী রফিক। স্ত্রী মুক্তিকে চাপ দিতে থাকে বাবার বাড়ী থেকে আড়াই লাখ টাকা এনে দিতেই হবে। নইলে জীবন দিতে হবে। হয়ত তখনও বুঝত পারেনি গৃহবধুঁ মুক্তি পারভীন এভাবেই তাকে একদিন টাকা দিতে না পেরে জীবন দিতে হবে। এদিকে আবারও অন্ত:স্বত্বা হয়ে পড়ে মুক্তি।

অপরদিকে পাষন্ড স্বামী রফিক পরকীয়া প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়ে বাড়ীতে থাকা আপন ভাবীর সাথে। একদিন রফিক ভাবীর সাথে প্রেম লিলায় মেতে উঠে ঠিক তখনিই নজরে আসে গৃহবধু মুক্তির। দেবর-ভাবীর পরকীয়ার বিষয়টি হাতে নাতে ধরে ফেলে গৃহবধুঁ মুক্তি। ঘটনাটি পারিবারিক ভাবে জানায় তার আপন ছোট বোন রাবেয়া খাতুন র”বি কাছে। ছোট বোন বিষয়টি জেনে বোনের বাসায় গিয়ে ভগ্নীপতি রফিকের সাথে কথা বলে বিসয়টির মিমাংশা করতে চাইলে দেবর-ভাবী মিলে র”বিকেও মার-ডাং করে ভগ্নীপতির বাড়ী থেকে তারিয়ে দেয় তার বড় ভাবী মঞ্জুয়ারা। এ সময় ছোট বোন র”বির সামনেই বড় বোন মুক্তিকে নির্যাতন করতে থাকে ভগ্নীপতি রফিক। নির্যাতনের শিকার মুক্তি নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ছোট বোন র”বির কাছে আকুতি জানায় আমাকে বাঁচাও বোন, আমাকে বাচাঁও । আমাকে আমার স্বামী মেরে ফেলবে। এই ঘটনার দিন রফিক চিৎকার করে বলে আমি এক মাসের মধ্যে তোর বোনের লাশ তোদের বাড়ী পাঠিয়ে দিবো। তোর কি করার আছে করিস। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলি বলছিলেন মৃত মুক্তির ছোট বোন র”বি। র”বি জানায় এ ঘটনার ঠিক ১৮ দিনের মধ্যে বোনের লাশ দেখতে হলো। উক্ত ঘটনায় র”বি স্থানীয় ভাবে বিচার শালিসে স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উক্ত ঘটনাসহ বেশ কয়েক বার স্থানীয় বিচার শালিসে মুক্তিকে স্বামীর বাড়ীতে পাঠান। প্রত্যেক বিচারে রফিক বিচারকারী ও মুক্তির আত্বীয় স্বজনদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেন, আর এরকম ভূল হবে না মর্মে প্রতিশ্র”তি দিচ্ছি। এই বলে গৃহবধুঁ মুক্তিকে নিয়ে যায় তার বাড়ীতে। কিন্তু মুক্তির ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মুক্তিকে মুক্তি দেয়নি। মুক্তির পেটে ৮ মাসের বাচ্চা। অসুস্থ্য অবস্থায় মুৃক্তির প্রতি অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন বাড়াতে থাকে পরনারী লোভী রফিক।

ঘটনার দিন ৯ আগষ্ট/১৬ দুপুরে মুক্তিকে ঐ যৌতুকের টাকা আনার উছিলা করে টাকা আনতে চাপ সৃষ্টি করে। এ সময় টাকা আনতে অস্বীকার করায় স্বামী রফিক ও বাড়ীতে থাকা বড় ভাবী মঞ্জুয়ারা বেগম মুক্তিকে শারিরীক নির্যাতন করতে থাকে। এক পর্যায়ে রফিক স্ত্রী মুক্তিকে পিছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দেয়ায় ৮ মাসের অন্ত:স্বত্বা মুক্তি নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সেই পড়া আর উঠতে পারেনি গৃহবধুঁ মুক্তি। জীবন সংসার থেকে একবারেই মুক্তি পেয়ে যায় জীবন সংগ্রামী গৃহবধুঁ মুক্তি।

স্থানীয় এলাকাবাসী মনোয়ার”ল ইসলাম,কাজল হোসেন,মিজানুর রহমান,হামিদুর রহামান ও আব্দুল মুহিত সজলসহ আরো অনেকেই মুক্তির হত্যাকান্ডের বর্নণা করেন এভাবেই। তারা জানান, মৃর্ত্যূর পর মুক্তির প্রসাবের রাস্তা দিয়ে প্রচুর রক্ত ক্ষরন হয়েছে। প্রাথমিক সুরত হালে পুলিশ মহিলা পুলিশ না আনায় স্থানীয় মহিলা দিয়ে প্রাথমিক সুর”ত হাল সম্পন্ন করা হয়েছে। এ সময় আমরা দেখেছি মৃত মুক্তির দেহে অসংখ্য মার-ডাং এর চিন্ন। কিন্তু প্রশাসন নিরব। স্থানীয় নারী নেত্রী বিথী আক্তার জানান, এভাবে প্রকাশ্যে হত্যা করে ঘটনাটি ধাঁমা-চাপা দিয়ে যাচ্ছে গৃহবধুঁর স্বামী ও একটি প্রভাবশালী মহল। কিন্তু সৃষ্টি কর্তা বলে একজন আছেন। একদিন ঠিকই এই হত্যা কান্ডের বিচার হবেই। এদিকে স্ত্রীর মৃত্যুতে বেগতিক হয়ে পড়ে পাষন্ড স্বামী রফিক। বিষয়টি ধামা-চাপা দিতে উঠে পড়ে লেগে যায় সে। তারাহুরা করে মুক্তিকে ভ্যানে করে একাই জলঢাকার দিকে চলে যায়। কিছুক্ষন পরেই রাস্তা থেকে ফিরে এসে রফিক তার স্ত্রী মুক্তির মৃত দেহ চাপানীর হাট সংলগ্ন বাড়ীতে রেখে পালিয়ে যায়। সে থেকে আজোবধি পলাতক পাষন্ড স্বামী রফিক। ঘটনার দিন মুক্তির বাবার বাড়ীর লোকজন খবর পেয়ে মুক্তির শশুড় ব্ড়াীতে এসে মুৃক্তির লাশ দেখতে প্য়া। ডিমলা থানা পুলিশ খবর পেয়ে গৃহবধুঁ মুক্তির মৃত দেহ উদ্ধার করে থানায় একটি সাধারন ডাযেরী করে লাশ ময়না তদন্তে প্রেরণ করেন। এ ঘটনায় মুক্তির আপন ভাই মোক্তাদির”ল মবিন মিঠু থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করতে চাইলে পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান। পুলিশ জানায় ময়না তদন্তের রিপোর্ট আসলে মামলা করা হবে। এ ঘটনায় এলাকায় চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কিন্তু কে শুনে কার কথা ? বিচারের বানী নিভৃতে কাঁদে।

মৃক্তির ভাই পায়েল জানান, আমরা এর বিচার চেয়ে প্রয়োজনে কোর্টের আশ্রয় নিবো। আমার বিশ্বাস ন্যায় বিচার আমরা পাবোই। গত শুক্রবার সকালে মৃত গৃহবধুঁর বাবার বাড়ী, যেখানে মুক্তিকে কবর দেয়া হয়েছে হাজিপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মুক্তির মা, মেয়ের এ অকাল মৃর্ত্যুতে পাগল প্রায়। যখনই মেয়ের কথা মনে পড়ছে মা ছুটে যাচ্ছে গোরস্থানে। যেখানে মুক্তিকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। ছোট্ট শিশু সায়েম নানুর বাড়ীতেই আছে। যখনই কচি মনে মায়ের মুখটা দোলা দিচ্ছে ঠিক তখনই সায়েম দৌড়ে গিয়ে মায়ের কবরের পাশে ছুটে গিয়ে মা-মা বলে চিৎকার করছে। নির্মম নির্যাতনের শিকার গৃহবধুঁ মুক্তি হত্যাকান্ডের বিচার কি তাহলে হবে না ? মুক্তির মা ও শিশু সন্তানের চিৎকার কি কেউ শুনতে পাবে না ? তাহলে এভাবেই কি শেষ হয়ে যাবে মুক্তি হত্যা কান্ডের বিচারের শেষ আশাটুকু ? মুক্তি হত্যাকান্ডের বিচার কি এলাকাবাসী দেখে যেতে পারবে না? এ রকম হাজারও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে মুক্তির মৃর্ত্যৃতে এলাকাবাসীর মনে।