মেইন ম্যেনু

“প্রিয়তমা স্ত্রীকে লেখা বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের শেষ চিঠি” – এটা কি সত্য ?

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের নামে একটি চিঠি ঘুরছে ফেইসবুকে, যা ভুয়া জানিয়ে সবাইকে সচেতন করেছেন তার স্ত্রী মিলি রহমান।

‘প্রিয়তমা মিলি’ দিয়ে শুরু হওয়া ওই চিঠির সবার শেষে লেখা ‘ইতি, মতিউর/ ২০ আগস্ট, রোজ শুক্রবার, ১৯৭১’।

আবেগঘন ওই চিঠিটি অনেকে ফেইসবুকে শেয়ার করেন। তবে মূল ঘটনা জানার পর তা প্রত্যাহারও করেছেন কেউ কেউ।

তাদেরই একজন সাংবাদিক মানস ঘোষ ‘একটি ভুয়া চিঠি, একটি ভুল শেয়ার এবং …’ শিরোনামে সম্প্রতি এক স্টাটাসে লিখেছেন, ‘প্রিয়তমা মিলি’ শিরোনামে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের একটি চিঠি কয়েকদিন আগে তিনি তার টাইম লাইনে শেয়ার করেছিলেন।

“চিঠিটি বছর দু-এক আগে এই ফেইসবুকেই প্রথম পড়া। অনেক দিন পর আবার চোখে পড়ায় সবার জন্য শেয়ার করলাম। তখন জানতাম না, কতবড় একটা ভুল হয়ে গেল। মিলি রহমানের সঙ্গে আমার অনেক পুরনো সম্পর্ক। বিপত্তিটা বাঁধল এখানেই। মিলি রহমান জানালেন, চিঠিটি মতিউর এর না। এটা একটা ভুয়া চিঠি।

“মতিউর আমাদের নায়ক। তাকে নিয়ে মিথ্যে গল্প বানানোর কিছু নেই। যে বা যারা কাজটি করছেন তারা এই মিথ্যে প্রচারণা থেকে সরে আসবেন, আর আমরা যারা না জেনে এর শরিক হলাম তারা নিজেদের সংশোধন করে নেবো এটাই চাওয়া। মিলি রহমান চান এই মিথ্যে চিঠিটা ফেইসবুক থেকে মুছে যাক।”

রুদ্র সাইফুল নামে একজন ফেইসবুকে শেয়ার করেছেন মিলি রহমানের সাক্ষাৎকারের ভিডিও। যেখানে মিলি রহমান বলেন, “চিঠিটা সম্পূর্ণ ভুয়া। আমি তার স্ত্রী মিলি রহমান। আমি জানি চিঠিটা কতখানি অসত্য।
“কিছু চিঠি যেটা আমাকে লেখা ছিলো, সেটা যখন ঘটনা ঘটে। সেদিন ব্যক্তিগত সেই ফাইলটি সিল করে নিয়ে যায়। কাজেই সেই চিঠিগুলোর সবগুলোই পাকিস্তানে আটকা। আমার কাছে কিছুই নেই।”

চিঠিতে যে সময়ের (২০ অগাস্ট, ১৯৭১) কথা বলা হয়েছে, তখন স্বামীর সঙ্গেই ছিলেন জানিয়ে মিলি রহমান বলেছেন, “একই বাড়িতে একই ছাদের নিচে (ছিলাম)। চিঠি লেখার প্রশ্নই আসে না।”

তিনি জানান, ২০ অগাস্ট মতিউর রহমান বাড়ি থেকে বের হয়ে বিমান ঘাঁটিতে যান এবং সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য বিমান নিয়ে উড়াল দেন এবং দুর্ঘটনায় পড়েন। [ বিডি নিউজ ২৪, জুন ১৩, ২০১৪ ]

আসুন দেখি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া সেই ভুয়া চিঠিতে কি লেখা আছে সেটা

“প্রিয়তমা মিলি,
একটা চুম্বন তোমার পাওনা রয়ে গেলো।সকালে প্যারেডে যাবার আগে তোমাকে চুমু খেয়ে বের না হলে,আমার দিন ভালো যায় না। আজ তোমাকে চুমু খাওয়া হয় নি। আজকের দিনটা কেমন যাবে জানি না… এই চিঠি যখন তুমি পড়ছো, আমি তখন তোমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে। ঠিক কতোটা দূরে আমি জানি না।

মিলি, তোমার কি আমাদের বাসর রাতের কথা মনে আছে? কিছুই বুঝে উঠার আগে বিয়েটা হয়ে গেলো। বাসর রাতে তুমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে যখন কাঁদছিলে, আমি তখন তোমার হাতে একটা কাঠের বাক্স ধরিয়ে দিলাম। তুমি বাক্সটা খুললে… সাথে সাথে বাক্স থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকী বের হয়ে সারা ঘরময় ছড়িয়ে গেলো। মনে হচ্ছিলো আমাদের ঘরটা একটা আকাশ… আর জোনাকীরা তারার ফুল ফুটিয়েছে! কান্না থামিয়ে তুমি অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলে, “আপনি এতো পাগল কেনো!?” মিলি, আমি আসলেই পাগল… নইলে তোমাদের এভাবে রেখে যেতে পারতাম না।

মিলি, আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় দিন প্রিয় কন্যা মাহিনের জন্মের দিনটা। তুমি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলে। বাইরে আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি… আমি বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে কষ্টে পুড়ে যাচ্ছি। অনেকক্ষণ পরে প্রিয় কন্যার আরাধ্য কান্নার শব্দ… আমার হাতের মুঠোয় প্রিয় কন্যার হাত! এরপর আমাদের সংসারে এলো আরেকটি ছোট্ট পরী তুহিন…. মিলি, তুমি কি জানো… আমি যখন আমার প্রিয় কলিজার টুকরো দুই কন্যাকে এক সাথে দোলনায় দোল খেতে দেখি, আমার সমস্ত কষ্ট – সমস্ত যন্ত্রণা উবে যায়। তুমি কি কখনো খেয়াল করেছো, আমার কন্যাদের শরীরে আমার শরীরের সূক্ষ্ম একটা ঘ্রাণ পাওয়া যায়? মিলি… আমাকে ক্ষমা করে দিও।

আমার কন্যারা যদি কখনো জিজ্ঞেস করে, “বাবা কেনো আমাদের ফেলে চলে গেছে?” তুমি তাঁদের বলবে, “তোমাদের বাবা তোমাদের অন্য এক মা’র টানে চলে গেছে… যে মা’কে তোমরা কখনো দেখো নি। সে মা’র নাম ‘বাংলাদেশ’; মিলি… আমি দেশের ডাককে উপেক্ষা করতে পারি নি। আমি দেশের জন্যে ছুটে না গেলে আমার মানব জন্মের নামে সত্যিই কলঙ্ক হবে। আমি তোমাদের যেমন ভালোবাসি, তেমনি ভালোবাসি আমাকে জন্ম দেওয়া দেশটাকে। যে দেশের প্রতিটা ধূলোকণা আমার চেনা। আমি জানি… সে দেশের নদীর স্রোত কেমন… একটি পুটি মাছের হৃৎপিন্ড কতটা লাল, ধানক্ষেতে বাতাস কিভাবে দোল খেয়ে যায়….!

এই দেশটাকে হানাদারের গিলে খাবে, এটা আমি কি করে মেনে নিই? আমার মায়ের আচল শত্রুরা ছিঁড়ে নেবে… এটা আমি সহ্য করি কিভাবে মিলি? আমি আবার ফিরবো মিলি… আমাদের স্বাধীনদেশের পতাকা বুক পকেটে নিয়ে ফিরবো। আমি, তুমি, মাহিন ও তুহিন… বিজয়ের দিনে স্বাধীন দেশের পতাকা উড়াবো সবাই। তোমাদের ছেড়ে যেতে বুকের বামপাশে প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছে… আমার মানিব্যাগে আমাদের পরিবারের ছবিটা উজ্জ্বল আছে… বেশি কষ্ট হলে খুলে দেখবো বারবার।

ভালো থেকো মিলি… ফের দেখা হবে। আমার দুই নয়ণের মনিকে অনেক অনেক আদর।

ইতি,
মতিউর।”