মেইন ম্যেনু

বুধ গ্রহে আমাদের শিল্পাচার্যের নাম!

সাফাত জামিল শুভ : বাংলাদেশে জন্মেছেন কিন্তু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নাম শুনেনি, এমন কেউ নেই বোধহয়। শিশুদের ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে উনার কথা পড়ানো হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। জয়নুল আবেদীনেরই আগ্রহে ও পরিকল্পনায় সরকার ১৯৭৫-এ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোকশিল্প জাদুঘর ও ময়মনসিংহে জয়নুল সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমান শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে দায়িত্ব দেন বাংলাদেশের সংবিধানটির অঙ্গসজ্জার জন্যে। তিনি প্রবল উৎসাহের সাথে কাজটি সমাধা করেন।

তবে তিননি সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছেন ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ নিয়ে আঁকা তাঁর অতিবাস্তব ও নির্মম ছবিগুলোর জন্য যেগুলো সে সময়ের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলেছিলো। তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা আনুমানিক ৩ হাজারেরও বেশি যেগুলো দেশ বিদেশের বিভিন্ন বিখ্যাত সংগ্রহশালা ও ব্যক্তিগত কালেকশনে আছে।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন IAU কর্তৃক ৯ জুলাই, ২০০৯ বুধ গ্রহের একটি জ্বালামুখ তাঁর মানবসভ্যতায় মানবিক মূল্যবোধ ও উপলদ্ধিকে গভীরতর করার প্রেক্ষিতে “আবেদীন জ্বালামুখ” নামে নামকরণ করা হয়। এছাড়া তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উৎসব হয় ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালায় (আর্ট গ্যালারি) শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বিশ্বের প্রাচীনতম ও সর্ববৃহৎ ব্রিটিশ নিলামকারী প্রতিষ্ঠান বনহামসে তাঁর স্কেচ বিক্রিত হয়।

আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে ছোট ও সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ হলো Mercury বা বুধ। ২০০৪ সালের ৩ আগস্ট এই গ্রহটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে Nasa একটা মিশন লঞ্চ করে যার নাম MESSENGER. অনুসন্ধানী মহাকাশযানটি ২০১১ সালের ১৭ মার্চ বুধের অরবিটালে পৌঁছায়। এই মিশন শেষ হয় ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল এবং এই পুরোটা সময়ের মধ্যে ম্যাসেঞ্জার বুধ গ্রহ থেকে প্রচুর ছবি, তথ্য, উপাত্ত পাঠায় যার সাহায্যে বিজ্ঞানীরা পুরো গ্রহটির একটা পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ তৈরী করতে পারেন এবং এর বিভিন্ন স্থানের নামকরণ করেন।

ছবিতে যে বৃত্তাকার যে জিনিসটা দেখা যাচ্ছে সেটা বুধ গ্রহের গায়ে একটা জ্বালামুখ বা Crater. এটার ব্যাস ১১০ কিলোমিটার এবং এটার অবস্থান বুধের 61.7°N 10.2°W চিহ্নিত স্থানে। পৃথিবী থেকে প্রায় দেড়শ মিলিয়ন কিলোমিটার দুরের একটা গ্রহের গায়ের জ্বালামুখ নিয়ে এত কিছু বলার কারণ হলো- এই ক্রেটারটার নাম নাসা আমাদের দেশের প্রখ্যাত চিত্রকর ও ভাস্কর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামে করেছে- Abedin Crater!

একটু অবাক হবো এই ভেবে, তার নাম বুধের জ্বালামুখে কেন, তিনি কি গবেষকও ছিলেন? আবার ভালো লাগবে নিজেদের নামগুলোর মহাজাগতিক ব্যবহার দেখে। পৃথিবীর মানুষের প্রতি ভালোবাসাই তার নাম বিশ্ববিজ্ঞানের নীতিনির্ধারকদের এখানে বসাতে উদ্বুদ্ধ করেছে। চলি্লশের দশকে সায়েন্স ফিকশন লেখকদের প্রবল প্রভাব জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাকাশ গবেষণায় ব্যাপক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ফলে মানবজাতি মহাকাশ যুগে পদার্পণ করে। তারই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহের খাদ, জ্বালামুখ, ইমপ্যাক্ট ক্রাটার সায়েন্স ফিকশন লেখকদের নামে করার একটি রীতি প্রচলন করে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন। সেই কারণে জুলভার্ন, এইচজি. ওয়েলস, আলেক্সান্দার বেলায়েভসহ অনেক লেখকের নামেই চাঁদ ও মঙ্গলের ক্রাটার বা জ্বালামুখের নাম রাখা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন এই ধারাকে আরও বিস্তৃত করে। শুধু সায়েন্স ফিকশন লেখক নয়, বিজ্ঞানীদের নামে নয়, যারা মানবসভ্যতার মানবিক বোধ ও উপলব্ধিকে গভীরতর করেছে সেসব শিল্পী-সাহিত্যিকের নামেও করার একটি উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ অনুভব করে মানুষ। তাই আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, খাদগুলোর নাম করবেন বিখ্যাত শিল্পী ও সাহিত্যিকদের নামানুসারে; যারা ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে পৃথিবীব্যাপী পরিচিত। নাম করার অন্তত তিন বছর আগে মারা গেছেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বুধ গ্রহের একটি জ্বালামুখের নামকরণ হয়েছে প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের সম্মানে।

মহাবিশ্বের নব আবিষ্কৃত নানা এলিম্যান্ট যেমন গ্রহ-উপগ্রহের বিভিন্ন অংশের নাম, এস্ট্রয়েড, ধূমকেতু ইত্যাদি বিশ্বের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্বদের নামে নামকরণের ধারাবাহিকতায় IAU বা ইন্টারন্যাশনাল এস্ট্রোনোমিকাল ইউনিয়ন এই নামকরণ করে। আবেদিন ক্রেটার ছাড়াও বুধের আর দুইটি ক্রেটারের নাম রাখা হয়েছে জিবরান ক্রেটার ও হেমিংওয়ে ক্রেটার যথাক্রমে দুই বিশ্বনন্দিত সাহিত্যিক ‘দি প্রফেট’ খ্যাত কাহলিল জিবরান ও আর্নেষ্ট হেমিংওয়ের নামে।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়






মন্তব্য চালু নেই