মেইন ম্যেনু

বুড়িগঙ্গার প্রাণ ফেরাতে মেগা প্রকল্প

বুড়িগঙ্গা নদী দূষণমুক্ত রাখতে নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নতুন এ প্রকল্প বাস্তবায়ন তদারকি করবে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। মেগা এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়নের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২০ বছর।

‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট ইন সাউথ সিটি করপোরেশন’ প্রকল্পের আওতায় অস্তিত্ব হারাতে বসা বুড়িগঙ্গা নদী বাঁচানোর স্বপ্ন দেখছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। নদীর মূল অবস্থান অটুট রেখে সিঙ্গাপুরের কালং ও সিঙ্গাপুর নদী এবং বাংলাদেশের হাতিরঝিলের আদলে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ভাবা হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের অন্যতম কারণ বর্জ্য। আবাসিক এলাকার বর্জ্য ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের স্যুয়ারেজ লাইন হয়ে মিশছে এ নদীর পানিতে। নতুন এ প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য স্যুয়ারেজ লাইনে গড়িয়ে আসা পানি নদীতে পড়ার আগে পরিশোধন করা। পাশাপাশি মৃতপ্রায় এ নদীর নাব্য ও চারপাশ নান্দনিক করে তোলা।

প্রকল্প সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকনের নেতৃত্বে নদী সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ৬ জুন ডিএসসিসি ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধিদের মধ্যে এ নিয়ে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী নভেম্বরের শেষের দিকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। শুরু হয়েছে নকশা প্রণয়নের কাজ। নকশার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বেঙ্গল ইনস্টিটিউটকে।

সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পা দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ১৮টি স্লুইসগেট দিয়ে রাজধানী ঢাকার স্যুয়ারেজ লাইন দিয়ে গড়িয়ে আসা কয়েক লাখ টন দূষিত পানি প্রতিদিন পড়ছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। এই পানির সঙ্গে রয়েছে মাটি ও বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক বর্জ্য। এছাড়া হাজারীবাগের ট্যানারি থেকে নির্গত ক্রোমিয়াম, পারদ, ক্লোরিন, দস্তা, নিকেল, সিসা, ক্যাডমিয়াম, অ্যালকালি ও সালফাইড, এমোনিয়া, নাইট্রোজেনের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের মাত্রা আরও ভয়াভহ করে তুলছে। চামড়ার উচ্ছিষ্ট অপচনশীল বর্জ্যে দুর্গন্ধের পাশাপাশি নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে।পাশাপাশি শীত ও গ্রীষ্মে এ নদীর পানি হয়ে পড়ে ব্যবহার অযোগ্য।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতে স্যুয়ারেজ লাইন দিয়ে গড়িয়ে আসা পানি পরিশোধন করে নদীতে ছাড়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রাজধানীর ১৮টি স্যুয়ারেজ পাইপলাইনে বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে নদীতে গড়িয়ে পড়ছে দূষিত পানি। স্বাভাবিক উপায়ে স্যুয়ারেজ পাইপের পানি ফিল্টারিং করতে প্রাথমিক পর্যায়ে ৭ থেকে ৮টি পরিশোধন প্লান্ট বসানো হবে। এতে কাঙ্খিত ফল পাওয়া গেলে সব স্যুয়ারেজ পয়েন্টে পরিশোধন প্ল্যান্ট বসাবে কর্তৃপক্ষ।

নদীর পানির মান ঠিক রাখতে সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও জাপানের অনুকরণে রাজধানীর স্যুয়ারেজ লাইনের পানি রিসাইক্লিন প্রকল্পটি ‘ঢাকা ইনটিগ্রেটেড আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্মার্ট সিটি ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টের বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধার প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে স্যুয়ারেজ লাইনের দূষিত পানি বুড়িগঙ্গায় পড়ার আগে তা আলাদা তিন থেকে চারটি পুকুরে রাখা হবে। প্রথম পুকরে দূষিত পানি ফিল্টারিং হয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুকুর হয়ে নদীতে যাবে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্জ্যমিশ্রিত পানি পুকুরগুলো অতিক্রমের সময় এর সঙ্গে মিশে থাকা বিভিন্ন তরল ও কঠিন বর্জ্য পুকুরের তলদেশে জমবে। সেখান থেকে এসব বর্জ্য সিটি করপোরেশনের কর্মীরা অপসারণ করবে। ফলে কোনো প্রকার কেমিক্যাল ছাড়া পানি স্বাভাবিক নিয়মে পরিশোধিত হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়বে। এতে বুড়িগঙ্গার পানি দূষণমুক্ত হবে।

পরিবেশ ক্ষতির বিষয়টিও পর্যবেক্ষণে রাখবে ডিএসসিসি। বর্জ্যমিশ্রিত পানি প্রথমে যে পুকুরে রাখা হবে সেটি বিশেষ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হবে, যেখানে সর্বসাধাণের প্রবেশাধিকারও থাকবে নিষিদ্ধ। পর্যায়ক্রমে এ ধরনের পুকুরের সংখ্যা বাড়ানো হবে।

বাস্তবায়নকারি কর্তৃপক্ষ জানায়, মেগা এ প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে ১৫ থেকে ২০ বছর। অনুরুপ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভিয়েতনামে সময় লেগেছে ২০ বছর, সিঙ্গাপুরে ৮ বছর ও কোরিয়ায় ১০ বছর এবং জাপানে ১২ বছর। নানা বিবেচনায় বাংলাদেশে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় একটু বেশি রাখা হয়েছে।

এ সম্পর্কে ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, বুড়িগঙ্গাকে বাচাঁতে ও প্রাচীন এ নদীর ভূপ্রাকৃতিক অবয়ব অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। নদী দু’পাড় ঘেঁষে রাখা হচ্ছে বিশেষ ধরনের সিরামিকের তৈরি ওয়াকওয়েসহ (চলাচলের রাস্তা) নানা বিনোদন সুবিধা। তবে এখনও প্রকল্পের ড্রইং ও ডিজাইন হয়নি। সবার সহযোগিতা পেলেই মেগা এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন ডিএসসিসির এ কর্মকর্তা ।