মেইন ম্যেনু

বেতনবৈষম্য নিরসনে দ্বিধায় সচিব কমিটি

অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নন-ক্যাডার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ নিরসন প্রশ্নে দ্বিধায় ভুগছে সচিব কমিটি। ফলে বেতনবৈষম্য নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো নিতে পারেনি তারা।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’-এর সমাবেশে দেয়া বক্তব্যে প্রকারান্তরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই আন্দোলন নিয়ে। বেতনকাঠামো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের অসন্তোষ তার বোধগম্য নয় বলে জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে শিক্ষকদের জন্য না চাইতেই অনেক কিছু করা হয়েছে বলে জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী ৪ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে নির্দেশ দিয়েছিলেন শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো নিয়ে সমস্যার দ্রুত সমাধানের। এরপর গত ছয় দিনে সচিব কমিটি শুধু প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় পরিষদের সঙ্গে একটি বৈঠকে করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে এখনো কথা বলেনি তারা। ফলে যে লক্ষ্য সামনে রেখে মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের সচিব কমিটি গঠন করেন প্রধানমন্ত্রী, সেটি দৃশ্যত থেমে আছে।

ওই কমিটি বেতন স্কেলের সমস্যা ও বৈষম্য চিহ্নিত করতে বৃহস্পতিবার রাতে প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় পরিষদের সঙ্গে বৈঠক করে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসন ক্যাডারের এক কর্মকর্তা বলেন, যারা বেতন নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছেন, তাদেরই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বৈষম্য নিরসনের। এতে কি আর বৈষম্য নিরসন হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেও ওই কমিটি কার্যকর উদ্যোগ নিতে এখনো কোনো বৈঠক করেনি।

ওই কর্মকর্তা আরো জানান, এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবও বুঝতে চেষ্টা করছেন সচিব কমিটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী যাদের দায়িত্ব দিয়েছেন তারাই চান না শিক্ষকদের দাবি পুরণ হোক। এ কারণে সংকটের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

জানতে চাইলে সচিব কমিটির সদস্য অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, “বেতনবৈষম্য নিরসনের বিষয়ে আমরা কাজ করছি। ইতিমধ্যে আন্দোলনরত প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় পরিষদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। শিক্ষকদের সঙ্গে এখনো বৈঠক করা সম্ভব হয়নি।”

এক প্রশ্নের জবাবে মাহবুব আহমেদ বলেন, “আশা করছি সমস্যা খুব শিগগির সমাধান হবে। আমরা সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবেই চেষ্টা করে যাচ্ছি।”

এদিকে সোমবার থেকে লাগাতার পূর্ণ কর্মবিরতি আন্দোলনে গেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। ফলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ কোনো ক্লাস হয়নি।

সরকার ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামোয় সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাদ দেয়া এবং সরকারি চাকরিতে প্রবেশের গ্রেড অবনমন করায় প্রশাসনবহির্ভূত ২৬টি ক্যাডারের কর্মচারীরা প্রতিদিন দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করার কথা জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, “আমরা আন্দোলনে আছি। সোমবার থেকে সারা দেশে লাগাতার কর্মসূচি চলবে।”

আন্দোলনে বিরতি দেয়ার সম্ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিলেই কেবল আন্দোলনে বিরতি দেয়া হবে। কিন্তু এখনো তাদের সচিব কমিটি ডাকেনি বলে জানান তিনি।

এ ছাড়া সরকারি কলেজশিক্ষকদের আগামী ২২ জানুয়ারি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করার কথা রয়েছে।

বেতন-কাঠামো নিয়ে আন্দোলনের মাঠে আছেন ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। গত কদিন ধরে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ফটকের সামনে দুই ঘণ্টা করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। তবে তাদের সমস্যার বিষয়ে আলোচনার জন্য গভর্নরের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত কর্মসূচি স্থগিত করেছেন তারা।

আন্দোলনরতরা জানান, অষ্টম বেতন স্কেলে সরকারি চাকরিতে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে ক্যাডার কর্মকর্তাদের অষ্টম গ্রেড ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য নবম গ্রেড নির্ধারণ করায় এ বৈষম্য হয়েছে। তাদের মতে, সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সাধারণত মেধাবীরাই যোগদান করে থাকেন, যারা নন-ক্যাডার কর্মকর্তা। অথচ তাদের নবম গ্রেড দেয়া হয়েছে।

তারা বলছেন, ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, সচিব কমিটির সুপারিশ এবং মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সারসংক্ষেপেও ক্যাডার ও নন-ক্যাডার বৈষম্য ছিল না। এমনকি সপ্তম বেতন স্কেলেও চাকরি শুরুর পদে ক্যাডার ও নন-ক্যাডাররা নবম ধাপেই ছিলেন। অথচ অষ্টম বেতন স্কেলে ক্যাডারদের এক ধাপ এগিয়ে অষ্টম ধাপে উন্নীত করা হলেও নন-ক্যাডারদের নবম ধাপেই রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, সরকারি চাকরিতে ২০টি গ্রেড রয়েছে। এত দিন সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল থাকার কারণে পদোন্নতি না পেলেও অনেকে উচ্চতর গ্রেডে যেতে পারতেন। কিন্তু নতুন বেতন স্কেলে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিয়ে চাকরির ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে আন্দোলনরত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা জানান, নতুন বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেড তুলে দেয়ায় সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেড-১ এ যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এ জন্য তারা সপ্তম জাতীয় বেতন স্কেলের অনুরূপ সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বহাল রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন। এ ছাড়া অষ্টম বেতন স্কেলে সিনিয়র সচিবের যে স্থান রাখা হয়েছে, সেই স্থানে গ্রেড-১ প্রাপ্ত অধ্যাপকদের মধ্য থেকে একটি অংশকে শতকরা হারে উন্নীত করা, সরকারি কর্মকর্তাদের অনুরূপ গাড়ি ও অন্যান্য সুবিধা শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করা, সরকার ও বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর প্রদত্ত উচ্চশিক্ষা বৃত্তি তরুণ শিক্ষকদের জন্য নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন করছেন।

শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠিতে জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও গ্রেড-১ ও গ্রেড-২ এ যাওয়ার সুযোগ পাবেন, তবে সেই সংখ্যা আগের তুলনায় কমবে।

নতুন প্রজ্ঞাপনে সরকারি কলেজের শিক্ষকরা (বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা) চতুর্থ গ্রেড থেকেই অবসরে যাবেন। এত দিন ৫০ শতাংশ অধ্যাপক সিলেকশন গ্রেড পেয়ে গ্রেড-৩ এ যেতে পারতেন। নিয়োগবিধি ও পদোন্নতি বিধিমালা সংশোধন করে সরকারি কলেজের শিক্ষকদেরও আগের মতো গ্রেড-৩ এ যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে কলেজ শিক্ষকরা বলছেন, এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে।