মেইন ম্যেনু

বেরোবি’র সাইবার সেন্টার প্রতিষ্ঠার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও হয়নি স্বতন্ত্র ভবন

বেরোবি প্রতিনিধি: পর্যাপ্ত জনবল,যথেষ্ট ইক্যুপমেন্ট(যন্ত্রপাতি) এবং শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়(বেরোবি) সাইবার সেন্টারটির বেহাল অবস্থা দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও নির্মাণ হয়নি কোনো স্বতন্ত্র ভবন। প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিষ্ঠিত একমাত্র সেন্টারটির জন্য বরাদ্দ একটিমাত্র কক্ষে প্রথম থেকেই ৩০ টি কম্পিউটার দিয়ে চলছে শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বিভিন্ন কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের যাবতীয় কাজ সম্পাদনকারী সাইবার সেন্টারের জন্য নেই কোনো উন্নত সুবিধা। প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি পর্যায়ে পরিচালকের পরিবর্তন হলেও উন্নতি হয়নি সাইবার ব্যবস্থার।

সাইবার সেন্টার কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০০৯ সালের অক্টোবরে লালকুঠির একটি অস্থায়ী ভবনে সাইবার সেন্টার যাত্রা শুরু করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে আনুষ্ঠানিকভাবে একাডেমিক ভবন-২ এর ৪র্থ তলায় ইলেকট্রনিক্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইটিই) বিভাগের একটি কক্ষ নিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদিত হয় সাইবার সেন্টারে।
সাইবার সেন্টারের নেটওয়ার্ক এ্যাডমিনিস্ট্রেটর মোঃ আতিকুর রহমান মিলন বলেন, এখানে যে সকল বিভাগের ল্যাব ক্লাস রয়েছে কিন্তু নিজস্ব কক্ষ নেই তারা ক্লাস করে থাকে । ২। আইসিটি বিষয়ক বিভিন্ন প্রোগ্রামের ক্লাস হয়ে থাকে। ৩। ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুত করা হয় এখান থেকে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড, রেজিস্ট্রেশন কার্ডও এখান থেকে প্রস্তুত করা হয়ে থাকে প্রয়োজনানুযায়ী। শিক্ষার্থীরা এখানে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে থাকে।

তবে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে মাত্র শুরু থেকেই ৩০ টি কম্পিউটার দিয়ে সব কাজ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে মাত্র ২০/২১ টি কম্পিউটার যার অধিকাংশই ত্রুটিযুক্ত এবং নেট সংযোগবিহীন। কক্ষটি ছোট হওয়ায় জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নির্বিকার হয়ে। এখানে সংকট রয়েছে চেয়ার-টেবিল এবং কম্পিউটারসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনা। ইন্টারনেট সংযোগ বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা অবস্থায় লোডশোডিং হলে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরে একটি জেনারেটর পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলেও তেলের অভাবে চালানো হয়না সেটি। সাবেক উপাচার্য ড. মুহাঃ আব্দুল জলীল মিয়ার সময়ে শিক্ষার্থীদের পরিচয় সনাক্ত করতে ‘রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডি কার্ড রিডার’ নামে একটি অত্যাধুনিক মেশিন চালু হয় ২০১২ সালের দিকে। কিন্তু বর্তমানে এটি অচল রয়েছে।

সাইবার সেন্টার সূত্র জানায়, প্রচন্ড গরমের সময় এয়ার কন্ডিশনার(এসি) ব্যতীত এই কক্ষে অবস্থান করা মুশকিল হয়ে পড়ে। এছাড়াও ইন্টারনেট মাধ্যমকে শক্তিশালী করতে ‘নেটওয়ার্কিং র‌্যাক’ নামে একটি মেশিন রয়েছে যার জন্য প্রতিটি সময় এসি প্রয়োজন। কিন্তু সে ব্যবস্থা না থাকায় রাতদিন দুটো ফ্যান চালিয়ে রেখে ঠান্ডা রাখা হয় মেশিনটি। এখানে যে ইক্যুপমেন্ট (যন্ত্রপাতি) রয়েছে তার জন্য অবশ্যই এসির প্রয়োজন। এছাড়াও জানা গেছে, ২০১২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে চালু হওয়ার সময়কার পরিচালক,কর্মকর্তাসহ সময় ৫/৬ জনবল নিয়ে কাজ শুরু হলেও চাহিদার তুলনায় আজ পর্যন্ত তেমন জনবল বাড়েনি।

বর্তমান সময়সহ সে সময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মোরশেদ উল আলম রনি এ ব্যাপারে বলেন, আমরা যে সময় ‘রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি(আরএফ) আইডি কার্ড রিডার’ চালু করি তখনও সকল শিক্ষার্থীর আইডি কার্ড ছিলো না। তাদের সনাক্তকরনের জন্য নির্দিষ্ট খাতায় নাম,আইডি নম্বরসহ অন্যান্য তথ্য লিখতে হতো। তাই বেশ কয়েক মাস চলার পর এ মেশিনের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হয়। জেনারেটার চালনার ব্যাপারে তিনি বলেন,সাইবার সেন্টারের তেমন নিজস্ব ফান্ড নেই যার কারনে সেন্টারটির প্রথম পরিচালক ড. কে এম ফরিদুল ইসলাম এর সময়ে সিদ্ধান্ত হয়, যে সব বিভাগের ল্যাব ক্লাস সাইবারে হবে বিদ্যুৎ গেলে তারাই জেনারেটরের তেলের ব্যবস্থা করবে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সময় ৬ মাসে ১২০ টাকা নেওয়া হয় সাইবার কার্যক্রম চালানের জন্য।তবে সে অনুসারে সুযোগ-সুবিধা পান না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি বাংলা লায়ন ও ব্রডব্যান্ডের সমন্বয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ইন্টারনেট কার্যক্রম চলছে বলে সাইবার সেন্টার সূত্রে জানা গেছে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিঃ’ (বিটিসিএল) এর সংযোগ ব্যবস্থার তারও টানানো হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে কবে নাগাদ এই সুবিধা পাওয়া যাবে তা জানা যায়নি। নেট কানেকশন স্লো(ধীরগতি) হওয়াতে বেশ অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে ব্যবহারকারি শিক্ষার্থীদের।

সাইবারে নেট ব্যবহার করতে আসা অনেক শিক্ষার্থী ইন্টারনেট চালু,কম্পিউটার সমস্যা,জায়গা অসংকুলান এবং পর্যাপ্ত সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। রসায়ন বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, এখানে নেট কানেকশন স্লো (ধীরগতি প্রকৃতির)। মাঝে মাঝে পাওয়ার বন্ধ হয়ে যায়। সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, সাইবারে ওয়াইফাই ব্যবস্থা নাই,জায়গা নাই,মাঝে মাঝে ইন্টারনেট কানেকশনও পাওয়া যায় না।

এছাড়াও বাংলা টাইপিং এর জন্য সফটওয়ার,ডাউনলোড ধীরগতি এবং অন্যান্য সমস্যার কথাও জানান একাধিক শিক্ষার্থী।

তবে এ ব্যাপারে নেটওয়ার্ক এ্যাডমিনিস্ট্রেটর আতিকুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় এ দুরবস্থা হয়েছে। এছাড়াও বাংলা টাইপিং এবং অন্যান্য কাজের জন্য কর্মরত ব্যক্তিদের পরামর্শ নিতে শিক্ষার্থীদের অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি কম্পিউটার ব্যবহারে সচেতন ও যতœবান হোন তাহলে অনেক সমস্যা কাটিয়েই সবাই কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারবেন।

প্রতিদিন সকাল ৯ টায় শুরু হওয়া সাইবার সেন্টারের কার্যক্রমের ১ টা পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগের ল্যাব ক্লাস-পরীক্ষা এবং শিক্ষক-কর্মকর্তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে। দুপুর ১ টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করতে পারেন। কম্পিউটারে অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে ‘লিনাক্স’ ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য উইন্ডোজ চালু রাখা হয়েছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষ জানান, অনেক সমস্যা সমাধানের জন্য আলাদা একটি আইসিটি ভবন প্রয়োজন যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ইন্টারনেটসহ অনেক সুবিধা পাবেন। রনি জানিয়েছেন, আলাদা ভবন না থাকায় সঠিকভাবে সাইবার কার্যক্রম চালাতে সমস্যা হচ্ছে।

সাইবার সেন্টারের সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের পদক্ষেপের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এবং সাইবারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোরশেদ উল আলম রনি জানান, ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরের বাজেট থেকে এ সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে বলে উপাচার্য জানিয়েছেন। তবে আপাতত আলাদা ভবন নির্মানের কোনো উদ্যোগ এখনও প্রশাসনের নেই।

সাইবার সেন্টারের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং(সিএসই)বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ কে এম ফরিদুল ইসলাম জানান যে, ২০০৯ সালে সাইবার সেন্টারের প্রথম দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। সে সময় মাত্র ৩০ টি কম্পিউটার নিয়ে রংপুরের লালকুঠির একটি ভবনে সাইবার সেন্টার অস্থায়ীভাবে যাত্রা শুরু করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাত্রা শুরু করার সময়ও তিনি সাইবার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় তিনি সাইবার সেন্টারে কম্পিউটার বাড়ানোসহ অন্যান্য সমস্যার কথা প্রশাসনকে জানালেও উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন। তিনি জানান, সাইবার সেন্টারের নিজস্ব কোনো অর্থ ফান্ড নেই।

শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সময় যে টাকা নেওয়া হয় তাও বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ডে থাকে। যার কারনে তাঁর সময়ে সাইবার সেন্টারের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হয় নি। এরপর তিনি স্বেচ্ছায় ২০১৪ সালে দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক ড. মোঃ তাজুল ইসলামকে তাঁর সময়ে সাইবার সেন্টার সম্পর্কে তাঁর পদক্ষেপের কথা জিজ্ঞেস করলে বলেন, আমি সাইবার সেন্টারের জন্য প্রশাসনের কাছে ৫০ টি কম্পিউটার, প্রয়োজনীয় সংখ্যক এসিসহ অন্যান্য ইক্যুপমেন্টের ব্যবস্থা করার জন্যে ইতোমধ্যে চিঠি দিয়েছি।তবে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম জানান তিনি এ ধরণের আবেদন পান নি।

প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডীন হিসেবে পদানুসারে সবশেষ গত জুলাই মাসের ৭ তারিখে দায়িত্ব নেন উপাচার্য ড. একে এম নূর-উন-নবী। তবে চলতি অর্থ বছরের বাজেটে সাইবার সেন্টারের মোটামুটি সমস্যা সমাধান হবে বলে জানা গেছে। তবে আলাদাভাবে ভবন নির্মাণ করা হবে কি না সেটা জানা যায়নি।