মেইন ম্যেনু

বোকা মেয়ের ডায়রি: এই দেশের মেয়েরা এত পুরুষ খোঁজে কেন?

প্রতিদিন প্রিয় আনসারে কি বিচিত্র সব প্রশ্ন যে পাই। মানুষের হাজারো সমস্যা দেখতে দেখতে আসলে মানুষ চিনতে পারি। সবে সবচাইতে কষ্টের কথাটা হচ্ছে, সবচাইতে বেশি জানতে পারি আমাদের মানসিক দীনতা সম্পর্কে। প্রিয় আনসার না থাকলে আসলেই চারপাশের মানুষগুলোর এই ভিন্ন রূপটা দেখা হতো না।

একটা উদাহরণ দিই। কিছুদিন আগে একটি মেয়ে চিঠি লিখেছিল যে তাঁর দ্বিতীয় বিয়েটিও ভেঙে যাচ্ছে। মেয়েটির বয়স খুব কম, বিদেশে থাকে, পেটে সন্তান। প্রথম বিয়ে করেছিল পালিয়ে, একেবারে টিন এজ বয়সে। পরবর্তী বিয়ে হয় আর্থিক অবস্থা খারাপ এমন একটি ছেলের সাথে, ছেলেকে বিদেশ নিয়ে যাওয়া হবে এই শর্তে। তবে সেই সংসারও টেকেনি। বর মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে নিজের মামাতো বোনকে বিয়ে করতে যাচ্ছে।

বাচ্চা জন্ম নেয়ার পরই ডিভোর্স নিশ্চিত। অনেক কিছু ভেবে মেয়েটি আর সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে চাইছে না। তাঁর মনে হচ্ছে না যে এতবড় একটি দায়িত্ব সে নিতে পারবে। যাই হোক, সমস্যা সেটি না। সমস্যা হচ্ছে এই মেয়েটির সমস্যা ছাপা হবার পর আমি নিদেনপক্ষে ৩/৪ টি মেসেজ পেয়েছি নানান বয়সী নারীদের কাছ থেকে, যারা সন্তানটি দত্তক নিতে আগ্রহী। একজন তো ফেসবুকেই কমেন্ট করে বসছেন- “ছেলে হলে বাচ্চাটা আমাকে দিবেন।” হ্যাঁ, যারা সন্তান দত্তক নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সকলের একই কথা- ছেলে সন্তান হলে নিতে আগ্রহী। মেয়ে সন্তান হলে নিতে চান না।

যাদের ২/১ জন কন্যা সন্তান আছে, তাঁরা যদি একটি পুত্র সন্তান দত্তক নিতে চান, বিষয়টি আমি বুঝলাম। কিন্ত যাদের সন্তানই নেই, তাঁদের জন্য পুত্র জরুরী কেন? যারা দত্তক নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তাঁদের মাঝে দুজন ভদ্রমহিলা এমন, যারা নিঃসন্তান। একজন মধ্যবয়সী, সন্তান হবার বয়স পেরিয়ে গেছেন। মনে হলো সন্তানের প্রতি আকাঙ্ক্ষা হয়তো সবচাইতে তাঁরই বেশী।

খুব বিনীতভাবে প্রশ্ন করলাম, “আপা, যদি মেয়ে হয় নেবেন না?”
তিনি জবাব দিলেন- “মেয়ে নিয়ে কী করবো? অযথা যন্ত্রণা পুষবে কে! আপনি ছেলে হলে আমাকে জানাবেন। আমি নিব। বুড়ো বয়সে ছেলেই কাজে আসবে…”
“সবাই যদি ছেলেই নিতে চায়, তাহলে মেয়ে বাচ্চা হলে কী করবে?”
“বলেন এতিম খানায় দিয়ে দিতে। বিদেশের এতিম খানাও ভালো…! ”

পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছেন, এরপর আর ভদ্রমহিলার সাথে আমি কথা বাড়াইনি। শুধু লিখেছিলাম- ” এই দেশের মহিলাদের সমস্যা কী,আপা? তাঁরা কেবল পুরুষ খোঁজে কেন?” এই কথা লেখাটা অশোভন হয়েছে জানি। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই রাগে গা রি রি করছিল। একটি ছোট্ট শিশু, অথচ তাঁকেও আমরা ব্যবসার উপাদান বানিয়ে ফেলেছি। তাঁর লিঙ্গ দিয়ে ঠিক করছি যে কেমন জীবন সে পাবে। ছেলে হলে আদর মমতা ভালোবাসা, মেয়ে হলে এতিমখানা। কেন? কারণ ছেলে যে টাকা কামানোর মেশিন!

শুনে রাগ হলো? কিন্তু কথাটা সত্যি। এই দেশের মেয়েরা নারী স্বাধীনতার কথা বলে যতই গলা ফাটিয়ে ফেলুক না কেন, আসলে পুরুষের ওপরে নির্ভরশীলতা ছাড়া তাঁরা বেঁচে থাকতে পারে না। আরও ভালো করে বলতে গেলে, পুরুষ ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না কারণ পুরুষ হচ্ছে টাকা উপার্জনের মেশিন। সন্তান চাই, কিন্তু ছেলে সন্তান। কেন? কারণ ছেলে কামাই করবে, পরিবারের দায়িত্ব নেবে, বুড়ো বয়সে মা বাবাকে খাওয়াবে। প্রেমিক চাই, কিন্তু পয়সা ওয়ালা। পয়সা না থাকলে ডেটিং এর খরচ আসবে কোথেকে? স্বামী চাই, সেখানে নির্লজ্জতা আরও বেশী। মাস শেষে মোটা অংকের উপার্জন থাকতে হবে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, গাড়ি বাড়ি থাকলে তো আরও ভালো। তাই যতই ভালো মানুষ হোক না কেন, পকেট খালি পুরুষগুলোকে না পরিবার দাম দেয়, না স্ত্রী, না সন্তান, না সমাজ। আমাদের সমাজে পুরুষকে বিচারের একটাই মানদণ্ড দাঁড়িয়ে গেছে, অর্থ এবং কেবলমাত্র অর্থ। আর তাই তো নারীরা কেবল পুরুষ খোঁজে এদেশে, ধনী পুরুষ। হোক মদ্যপ, হোক চরিত্রহীন, হোক খুনে স্বভাবের। পুরুষ যদি ধনী হয়, তবেই নারী খুশি। এই ধন সম্পদ যে নিজে উপার্জন করেও অর্জন করা সম্ভব, এটা বেশিরভাগ মেয়েরই মাথায় খেলতে দেখি না।

স্বামী শারীরিক নির্যাতন করে, মানসিক অত্যাচার করে। কিংবা করে পরকীয়া, কখনো শ্যালিকা বা কাজের বুয়ার সাথেও যৌন সম্পর্ক করে, ঘরের মাঝে দাসী বানিয়ে রাখে, স্ত্রীর মা বাবাকে অসম্মান করে, এমনকি যৌতুক নেয় আর সেটা না পেলে খুনের হুমকি দেয়। তবুও বেশিরভাগ মেয়ে সেই স্বামীর সাথেই থাকতে চায়। এমনকি সতীনের সাথে ঘর করবে, কিন্তু তাও স্বামীর সাথেই থাকবে। কেন? কারণ নিজে উপার্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব না!!! বা স্বামীর বাড়ির আরাম আয়েশ ছেড়ে সে বাঁচতে পারবে না!!!

ভাবছেন কেবল লেখাপড়া না জানা অশিক্ষিত মেয়েরা এই কথা বলে? একদম ভুল! অনার্স বা মাস্টার্স করছে এমন প্রচুর মেয়ে শুরুতেই বলে নেয় যে- ” আপু, আর যাই বলেন নিজে কামাই করে খাওয়ার কথা বলবেন না! ভালো ঘরের মেয়েরা কাজ করে খায় না।” আরেকটা মেয়ে তো আজকে বলেই ফেলল, “আমি জানি ও অনেক মেয়ের সাথে থাকে, কিন্তু আমি ওকে ছেড়ে যাব না। ও অনেক রিচ, বাবার বাড়িতে এই লাইফ স্টাইল পাব না আমি।” আরেকটি মেয়েকে প্রশ্ন করেছিলাম, “স্বামীর তো এত যোগ্যতা আছে, তোমার কি যোগ্যতা পরিচয় দেবার মত? কীসের কারণে সে তোমাকে দাম দেবে, সম্মান করবে?” মেয়ের সোজা সাপটা জবাব ছিল- “আমি সুন্দরী না? আমার মত সুন্দরী সে কখনো পেতো বউ হিসাবে? ওর তো আমাকে মাথায় করে রাখা উচিত!”

বাহ, স্ত্রী কেবল সুন্দরী বলে তাঁকে মাথায় করে রাখতে হবে! না থাকুক গুণ, না থাকুক বিদ্যা, না থাকুক অন্য কিছু। কেবল সুন্দরী হলেই চলবে! পুরুষ অর্থের বিনিময়ে পাবে শয্যাসঙ্গিনী হিসাবে সুন্দরী বউ আর নারী রূপের বিনিময়ে পাবে স্বামীর টাকায় আয়েশ করে বেঁচে থাকার সুযোগ। কী দারুণ সমীকরণ! এসব প্লাস্টিক মেয়েদের কারণে গোটা নারী জাতিকে গাল দেয় পুরুষ। আর এসব প্লাস্টিক পুরুষের কারণে মেয়েদের কাছে পুরুষ মানেই এখন টাকা কামানোর মেশিন। অনেক পুরুষ টেরও পান না যে জীবনে সত্যিকারের ভালোবাসা কারো কাছ থেকেই জোটেনি, সকলে ভালবেসেছে তাঁর টাকাকেই।

ব্যাপারটা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। যত দেখছি, তত অবাক হচ্ছি। বলা যায় বিস্মিত হচ্ছি ও লজ্জিত হচ্ছি। আমরা বাঙালিরা কি এতটাই মেরুদণ্ডহীন সবসময় ছিলাম, নাকি আজকাল হয়েছি? পরিবার, ভালোবাসা আর দাম্পত্যের মত এত সুন্দর একটা সম্পর্কগুলোকে আমরা রীতিমত ব্যবসা বানিয়ে ফেঁদে বসে আছি! কী আশ্চর্য একটা ব্যাপার!

পরিশিষ্ট
আমি স্বয়ং নারী, তাই আমি পুরুষকে বলবো না, আগে বলবো নারীকেই।

মেয়ে, শোনো!
যখন অন্যের টাকায় আরাম আয়েশ করেই জীবন কাটাতে চাও, তখন আর তাঁকে নিয়ে কমপ্লেইন কোরো না। তুমি নিজেই মেরুদণ্ডহীন, নিজেই নিজেকে সম্মান দিতে পারো না। তাহলে কীভাবে আশা করো বর তোমাকে সম্মান দেবে? যার অর্থবিত্ত ছাড়া তোমার জীবন চলবেই না, তাঁর দুটো লাথিও তোমাকে হজম করতে পারতেই হবে। কারণ এই অধিকার তুমিই তাঁকে দিয়ে দিয়েছ। অর্থ বিত্তের লোভে যদি স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী হতে তোমার অসুবিধা না থাকে, যদি কন্যা সন্তানের বদলে কেবল পুত্র সন্তানই তোমার কাম্য হয়ে থাকে… তাহলে তোমার জন্য করুণা ছাড়া আর কিছুই দেবার নেই আমার! না তুমি স্ত্রী হবার যোগ্য, না মা, সর্বোপরি তুমি মানুষ হবারই যোগ্য নও।

ছোটবেলা থেকেই এই দেশের মেয়েগুলির মাথায় ভরে দেয়া হয় যে ভালো বিয়ে হওয়া জরুরী, আর এই বিয়ের জন্য রূপ থাকা জরুরী। তাই রূপবতী কন্যা হলে আর কোন চিন্তাই নেই! আজকাল অবশ্য একটু ভালো বিয়ে হতে গেলে একটা ভালো ডিগ্রিও থাকতে হয়। বিশেষ করে বিদেশে বিয়ে করতে চাইলে তো লেখাপড়া জানাটা লাগবেই।

কোনরকমে একটা ভালো বিয়ে হয়ে গেলে, তারপর আজীবনের আয়েশ। যতই শিক্ষিত হও না কেন তুমি, নিজের বিদ্যা জলাঞ্জলি দিয়ে ঘরে বসে থাক। কিটি পার্টি করো, ফেসবুকিং করো আর স্বামীর মনোরঞ্জন। সন্তান আর সংসারের বাহানা দিয়ে এটা ভুলে যাও যে তোমারও উচিত ছিল নিজের নামটা উজ্জ্বল হয় এমন কিছু করা। এই পৃথিবীর জন্য তুমিও কিছু করতে পারতে। তোমার একবারও মনে পড়বে না যে জীবনে নিজেরও কিছু অর্জন থাকতে হয়। স্বামী তোমার জীবন সঙ্গী, তোমার সম্পত্তি নয়। তুমি একবারও তাকিয়ে দেখবে না যে স্বামী , সংসার, সন্তান সামাল দিয়েও বহু মেয়েই নিজ জীবনে সফল। বরং সেইসব মেয়েগুলিকে তুমি “খারাপ মেয়ে” বলো। নাক সিটকে বলো যে ভালো পরিবারের মেয়েরা কাজ করে খায় না!

শোন মেয়ে, ছেলেরা টাকা কামানোর মেশিন না যে সে নোট ছাপিয়ে যাবে আর তুমি সেটা ওড়াবে। আর তুমি নিজেও দোকানদার নও যে রূপের বিনিময়ে আরাম আয়েশের জীবনের সওদা করবে। যদি রূপের বিনিময়েই ধনী স্বামী পেতে চাও, তাহলে নিজেকে একজন দেহ ব্যবসায়ীর সাথে তুলনা করলেই বরং বেশী সমীচীন হবে।

শোন নারী, অন্যের টাকায় খেয়ে পরে কখনো স্বাধীন হওয়া যায় না। তাই স্বাধীনতার বুলি কপচানোর আগে নিজের বাবা, স্বামী , পুত্রের প্রতি নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত হও। তাঁদেরকে টাকার মেশিন ভাবা বন্ধ করে নিজের জন্য নিজে উপার্জন করো। স্বাধীনতা আপনা থেকে হাতের মুঠোয় ধরা দেবে।

নিজে নিজেকে সম্মান করতে না জানলে, অন্যের কাছ থেকেও সম্মান আশা করা বৃথা!