মেইন ম্যেনু

বোরকা বনাম সংক্ষিপ্ত পোশাক, মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ

রওশন আরা নীপা : এই দুই দিন আগে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে শ্যামলী যাচ্ছি, হঠাৎ করেই মধ্যবয়সী এক বোরকা পরিহিত নারীর ডাকে পিছন ফিরে চাই। মহিলা আমার শরীরের দিকে আঙুল তুলে ধমকের সুরে আদেশ করছেন ওড়নাটা ঠিক করবার জন্য। প্রথমে বিষয়টা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, আমি ভেবেছি আমার ওড়না মাটিতে পড়ে গেছে। মাঝে মাঝেই এটা হয় বলে দুই ধরনের পোষাক পড়তে আমি অভ্যস্ত, ১- শাড়ি, ২- প্যান্ট শার্ট বা ফতুয়া। ওনার কথায় চমকে নীচে তাকাই, না ঠিক আছে তো ওড়না যথা স্থানেই আছে। এরপরে খেয়াল করলাম আমার ফতুয়ার ওড়নাটা ঠিক প্রচলিত ওড়না নয় তাই উনি আমাকে পুরো শরীর ঢাকতে বলছেন। ২ সেকেন্ড হতভম্ব থেকে সরাসরি ওনার সামনে গিয়ে বললাম, নিজের চরকায় তেল দেন- রাস্তা ঘাটে এরকম উপদেশ না দিলেও চলবে। মহিলা কি ভেবে আর কথা বাড়ালো না।

চলে গেলো কিন্তু তখনও আমার রাগ কমেনি। পোশাকের বিষয়ে আমি যথেষ্ট সচেতন। কখনই এমন পোশাক পরি না যা অশালীন মনে হয়। যদিও শালীনতা বিষয়টা আপেক্ষিক। তারপরও সাধারণভাবে কয়েকটা জিনিস মেনে চলি-

প্রথমতঃ কাজে স্বাচ্ছন্দ্য আনে এমন ধরনের পোশাক পরি কাজের সুবিধার্থে, কিন্তু এমন পোশাক পরি না যাতে নিজেকে সেক্স পণ্য মনে হয়। শারীরীকভাবে আমি আমার নারী কাঠামোর বিষয়ে সচেতন। সেটা যখন তখন যেকোনোভাবে প্রকাশের বিরোধী আমি, ঠিক তেমনিভাবে আমার শরীরটা নারী শরীর মানেই যৌন উদ্দিপক পণ্য, তাই এটাকে একটা বস্তা জাতীয় বস্তুর মধ্যে লুকিয়ে রাখতে হবে এটারও ঘোর বিরোধী।

মূলত ওই দুই ধরনের পোশাক পরিহিতাকে সমগোত্রীয় বলেই মনে হয়। এরা উভয়েই নিজের শরীরকে একটা পণ্যের চেয়ে বেশি কিছু মনে করতে পারে না। একজনের ভাবনায় থাকে তার মূল্যবান পণ্যকে ঢেকে রাখতে হবে যেন সিন্দুকের মহামূল্যবান বস্তু কেউ চুরি করতে না পারে। আরেকজন দোকানের সেলফে সাজিয়ে প্রদর্শন করেন মূল্য যাচাইয়ের জন্য।

কথাগুলো অনেক নারীবাদী বা উদারনৈতিক মানুষের কাছে খুব একটা ভালো লাগবে না জানি, কিন্তু একবারটি কেউ ভেবে দেখবেন আপনি নারী, ঘরে, বাইরে, সমাজে, রাষ্ট্রে আপনার রূপ, যৌবন, সৌন্দর্য নিয়ে যতটা চর্চা হয় তার এক ভাগও কি আপনার মেধা, দক্ষতা নিয়ে হয়? কোথাও অফিসিয়াল বা গণমাধ্যমে আপনাকে বসতে হয় দুই পা বিশেষ ভঙ্গিমায় রেখে, কিন্তু পুরুষের বেলায় এরকম বেঁধে দেয়া ভঙ্গি আছে কিনা আমার জানা নেই। পাশ্চত্যে মেয়েরা স্কার্ট পরে অফিস করবে আর পুরুষ ফুল প্যান্ট? আমাদের আচরণে, মননে মস্তিষ্কে সেই শৈশব থেকেই একটা জিনিস প্রথমেই গেঁথে দেয়া হয় তুমি নারী, তোমার শরীর আলাদা, তোমার বাহ্যিক সৌন্দর্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ!

আমার আপত্তিটা এখানে। আমি পোশাক পরবো সভ্য হবার জন্য, লজ্জা নিবারণের জন্য, আমি মাথা উঁচু করে চলবো, খেলার মাঠে দৌঁড়াবো, যেখানে যেমন প্রয়োজন আমার পোশাকটাও তেমনি হবে এর বাইরে নয়।

আজকাল পথেঘাটে হিজাব আর স্পেশাল ফ্যাশনের বোরখা আর লো স্কার্ট, শর্টস পরা মেয়েদের দেখলে যে কেউ বলতে পারবে দুটো পোশাকের উদ্দেশ্যই এক ও অভিন্ন।

লেখক: চলচ্চিত্র পরিচালক