মেইন ম্যেনু

‘ব্যাংকের প্রতি মানুষ আস্থা হারাতে পারে’

৩ ব্যাংকের ৬টি এটিএম বুথ থেকে প্রায় ১৭ লাখ টাকা চুরির ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টির পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন এটিএম কার্ডধারী প্রায় ৯০ লাখ গ্রাহক।

গ্রাহক ও অর্থনীতিবীদরা বলছেন, সবকিছু যখন ম্যানুয়ালে চলছিল তখনো চুরির ঘটনা ঘটেছে, এখন ডিজিটাল হয়েছে তাই চুরির গতি পরিবর্তন হয়ে এখন ইলেকট্রনিক চুরির ঘটনা ঘটছে। তবে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষ আস্থা হারাতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই ৩ ব্যাংকের ৬টি এটিএম বুথ থেকে প্রায় ১৭ লাখ টাকা চুরি করেছে দেশি-বিদেশি সংঘবদ্ধচক্র। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া এটিএম কার্ড তৈরিতে নিয়োজিত আউটসোর্সিং বিভাগের ব্যক্তিরাও জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনা অনুসন্ধানে পৃথক তিনটি তদন্ত টিম গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, সিসি ক্যামেরার প্রতিটি ফুটেজে দুজন বিদেশি ও একজন দেশি নাগরিককে দেখা গেছে। তবে নেপথ্যে ছিল একটি বড় চক্র। সংশ্লিষ্ট তিন ব্যাংকের কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকারও প্রমাণ মিলেছে। এদের কেউ বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা।

তদন্ত কর্মকর্তা আরো জানান, ব্যাংকের সুপারভিশন খুবই দুর্বল। যে চক্রটি টাকা সরিয়েছে তারা দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সে কারণে পরিকল্পিতভাবে তারা কাজটি করেছে। অপর তদন্ত কর্মকর্তা জানান, যারা এটিএম কার্ড তৈরি ও সরবরাহ করে তাদের একটি অংশ এই চক্রের সদস্য থাকতে পারে।

অন্য তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তিন ব্যাংকের খোয়া যাওয়া টাকার পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ । এর মধ্যে ২২ জনের কার্ড নকল করে ইস্টার্ন ব্যাংকের কয়েকটি বুথ থেকে ১৩ লাখ টাকা সরিয়েছে চোরেরা। বাকি টাকা চুরি করেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) ও দ্য সিটি ব্যাংকের বুথ থেকে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা এতে জড়িত বলে জানান খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ‘কার্ড জালিয়াতচক্র এটিএম কার্ড পাঞ্চ করার স্থানে বিশেষ স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে দেয়। মাত্র ২০০ ডলারে সংগ্রহ করা যায় এসব ডিভাইস। গ্রাহক এটিএমে কার্ড পাঞ্চ করলে এর সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কপি হয়ে যায়। এ তথ্য ক্লোনড কার্ডে ব্যবহার করে জালিয়াতি সংঘটিত হয়। ইস্টার্ন, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ও দ্য সিটি ব্যাংকের জালিয়াতিও এই পন্থায় হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসম্পন্ন ও ঝুঁকি প্রতিরোধী ব্যবস্থাসম্পন্ন হার্ডওয়্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্ডই জালিয়াতির হুমকিতে পড়তে পারে। জালিয়াতি প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকের এটিএমে ব্যবহার করা হয় অ্যান্টি-স্কিমিং প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে এটিএমের তথ্য কপি করার সুযোগ কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে অ্যান্টি-স্কিমিং প্রযুক্তিসংবলিত এটিএমের দাম সাধারণ মানের এটিএমগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি। এ কারণে ব্যাংকগুলো এ ধরনের এটিএম ব্যবহারে খুব বেশি আগ্রহী নয় বলে জানা গেছে। ব্র্যান্ডভেদে সাধারণ মানের বিভিন্ন এটিএমের দাম যেখানে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা, সেখানে অ্যান্টি-স্কিমিং প্রযুক্তিসংবলিত এটিএমের দাম পড়ে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা।

সামপ্রতিক জালিয়াতির বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘বর্তমানে যেসব জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে, তাতে মূলত এটিএম ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জড়িত। এ জালিয়াতি ও প্রতারণা বন্ধে ব্যাংকগুলোর আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।’

এটিএমের মাধ্যমে লেনদেনের ঝুঁকি কমাতে অ্যান্টি-স্কিমিং ছাড়াও বেশ কিছু প্রযুক্তি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালু হয়েছে। টু-ফ্যাক্টর ও বায়োমেট্রিক অথেনটিকেশন পদ্ধতি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবস্থায় প্রচলিত পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি গ্রাহকের সেলফোনের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। আর বায়োমেট্রিক অথেনটিকেশন ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিকগনিশন প্রযুক্তি। এক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ মিলিয়ে গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত হলেই কেবল এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলন সম্ভব হয়। দেশের শীর্ষ এটিএম ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান আইটি কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আইটিসিএল) বলছে, ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকগুলোকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। নিয়মিত পুরো ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা প্রয়োজন। এছাড়া কোনো কর্মী ব্যাংক ছেড়ে গেলে অ্যাকাউন্ট লক, পাসওয়ার্ড পরিবর্তনসহ সিকিউরিটি প্রটোকলের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শক্ত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, ব্যাংকের দুর্বলতার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে। ফলে তারা দায় এড়াতে পারে না। তাদের দুর্বলতার জন্য সাধারণ গ্রাহক কেনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নিলে ব্যাংকের প্রতি সাধারণ গ্রাহকের আস্থা হারাতে শুরু করবে।’ এছাড়া যত্রতত্র এটিএম বুথ স্থাপনের বিরোধিতা করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও এতো এটিএম বুথ আমি দেখিনি। এতো বুথের কি প্রয়োজন। বড় অংকের টাকা ব্যাংকে গিয়ে তুলবে গ্রাহক, এই জন্য তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রাস্তার মোড়ে, যেখানে সেখানে অনিরাপদ স্থানে বুথ স্থাপন করা হয়েছে, এগুলো সংযত করা দরকার। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আইটি অফিস এবং তদারকি আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি সিকিউরিটি গার্ডদের প্রশিক্ষণ ও সিসি ক্যামেরাগুলো সার্বক্ষণিক মনিটরিং দরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘এধরনের ঘটনা নতুন কিছু নয়, আগে ম্যানুয়ালি চুরি হতো এখন হচ্ছে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের মাধ্যমে। তবে যে সব গ্রাহকের টাকা খোয়া গেছে তাদেরকে টাকা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে গ্রাহকের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।রাইজিংবিডি