মেইন ম্যেনু

ব্লগার হত্যায় ব্রিটিশ নাগরিক গ্রেফতারে ধূম্রজাল!

চলতি বছরে বাংলাদেশের চারজন ব্লগারকে হত্যা করা হয়। সবশেষ ৭ আগস্ট রাজধানীর ভাড়া বাসায় ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়কে কুপিয়ে খুন করা হয়।

কিন্তু ব্লগার অজিতিৎ রায় ও অন্তত বিজয় দাশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে মঙ্গলবার ব্রিটিশ নাগরিক তৌহিদুল রহমানসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি করে র‌্যাব। তাদের গ্রেফতারের পর মিডিয়ার সামনেও হাজির করা হয়। ওই দুই ব্লগার হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক তৌহিদুল রহমানকে মঙ্গলবার নয়, আটক করা হয়েছে গত মে মাসে।

নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে করা শুক্রবার প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এমন দাবি করেছে সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা। তবে এই দাবি অস্বীকার করেছে র‌্যাব।

৫৮ বছর বয়সি তৌহিদুল যে ফ্ল্যাটে বাস করতেন, তার কেয়ারটেকার ও নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, তৌহিদুল রহমান তার বোন ও অসুস্থ মায়ের সঙ্গে বসবাস করতে দুই বছর আগে লন্ডন থেকে ঢাকায় আসেন। মে মাসের ২৮ তারিখের বিকেলে তৌহিদুলকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে যায়।

ডিবি পুলিশ তার ভাইকে জোর করে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে, এমন অভিযোগে একটি ফৌজদারি মামলাও করেন তৌহিদুলের বোন চিকিৎসক নাসিরা বেগম। ৩ জুন ব্রিটিশ হাইকমিশনেও সহায়তা চেয়ে একটি চিঠি পাঠান তিনি।

নাসিরা বেগম দাবি করেন, তিন মাস ধরে তৌহিদের অবস্থান কেউ জানত না। গত সপ্তাহে আরো দুজন আসামির সঙ্গে মিডিয়ার সামনে তার ভাইকেও হাজির করে র‌্যাব। সে সময় র‌্যাব জানায়, তারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। তখনই তিন মাসের মধ্যে প্রথম তার দেখা পাওয়া যায়।

গ্রেপ্তারকৃত অন্য দুই ব্যক্তি সাদেক আলি মিঠু (২৮) ও আমিনুল মল্লিক (৩৫)। তাদেরও মে মাসের ভিন্ন তারিখে উঠিয়ে নিয়ে যায় নিরাপত্তা বাহিনী।

তবে তৌহিদুলকে আগেই আটক করা হয়েছে, এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন র‌্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমে আমরা যা বলেছি সেটাই সত্য। অনেক সময়ই আসামিরা এমন বক্তব্য দিয়ে থাকে। এটা আসলে তাদের কৌশল। তারা নিজেরাই পরিবার থেকে পালিয়ে যায়।’

এদিকে এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা বলে দাবি করেছে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’। সংগঠনের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান আল জাজিরাকে বলেন, ‘অনেক পরিবারের কাছ থেকেই এমন অভিযোগ আসে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পরিবারের সদস্যকে আটক করেছে এবং এরপর থেকেই তারা নিখোঁজ থাকে। তাদের অবস্থানের কথা কেউই বলতে পারে না। এরপর হঠাৎ একদিন দেখা যায় যে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেছিল।’

অনেক সময় তাদের খোঁজ কখনোই পাওয়া যায় না বলেও দাবি করেন তিনি। যদিও নিরাপত্তা বাহিনী কাউকে গ্রেফতার করার ২৪ ঘণ্টার মাথায় আদালতে হাজির করানোর বিধান রয়েছে।

মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব দাবি করে, ওই দিন সকালেই রাজধানীর একটি কাবাব রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দাবি, যে ১২ ঘণ্টা তাকে আটক রাখা হয়েছিল, সে সময়ই তিনি ব্লগার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। র‌্যাবের দাবি, ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন পাসপোর্টধারী অভিজিৎ রায় ও সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন তৌহিদুল।

তবে এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তৌহিদুলের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাসিরা বেগম। তিনি বলেন, ‘সে খুবই ধার্মিক ব্যক্তি। সে খুব অসুস্থও ছিল। তার পক্ষে হত্যার পরিকল্পনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সে সারাক্ষণ বাসাতেই থাকত।’

২০১৩ সালে তার মা অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পরই সে বাংলাদেশে ফিরে আসে বলেও জানান তিনি। তৌহিদুলের বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী মাহের আলি আল-জাজিরাকে বলেন, ২৮ মে কয়েকজন লোক এসে তৌহিদুলকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘চারজন লোক গেটের সামনে এসে আমাকে তৌহিদুলের বাসার ঠিকানা জানতে চান।’

এরপরে তিনি কেয়ারটেকার স্বপন বড়ুয়াকে খবর দেন। স্বপন বড়ুয়া তাদের ফ্ল্যাটে ঢোকার চেষ্টা করলেও তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

স্বপন বড়ুয়া বলেন, ‘আমি ঢুকতে না পেরে নিচে চলে যাই এবং ইন্টারকম দিয়ে তৌহিদুলকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করি যে লোকগুলো কারা ছিল। সে সময় তারা ডিবির লোক বলে জানায়। আমি তাকে তার বোনকে ফোন দিতে বলি।’

নাসিরা বলেন, তিনি কাজ করার সময় একটি ফোন পান। এ সময় তার ভাই জানান, কিছু মানুষ তাকে নিতে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই, তাদের মধ্যে একজন বলেন, আপনার ভাইকে আধা ঘণ্টার জন্য জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যেতে হবে। আমি তখন বলি যে, সে অসুস্থ তাকে এখন নিয়ে যাবেন না। আমি তার নাম জানতে চাইলে তিনি ফোন রেখে দেন।’

বুধবারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনজনকে সাত দিনের জন্য পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। তবে এর আগে তৌহিদুলের আইনজীবী এ এল এম কামাল উদ্দিন আদালতে বলেন, তৌহিদুলকে অবৈধভাবে আটক করা হয়েছে। এ সময় পুলিশি অভিযোগের কপিটি দেখান তিনি। কিন্তু এ ব্যাপারে বিচারক কোনো কথা না বলে চুপ ছিলেন বলে দাবি করে আইনজীবী।

এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ব্রিটিশ হাইকমিশনের একজন মুখপাত্র। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু এটুকু বলতে পারি যে আমরা একজন ব্রিটিশ নাগরিককে সহায়তা করার চেষ্টা করছি।’