মেইন ম্যেনু

ভাগ্যবশত যেভাবে জাতীয় দলে উঠে আসেন মুস্তাফিজুর রহমান

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-২০ ম্যাচে প্রথম দেখা মেলে মুস্তাফিজুর রহমানের। আসলে তখনই সবার নজরে আসেন মাত্র ১৯ বছর বয়সী এই পেসার। ধারনা করা হয়েছিল এই ছেলেটি কিনা দলকে বিপদেই ফেলে দেন। কিন্তু না তার ২০ রানে ২ উইকেট, তাও আবার শহীদ আফ্রিদি আর মোহাম্মদ হাফিজ, সবাইকে অবাক করে দেয়।

এবার ওয়ানডে অভিষেক হতে যাচ্ছে তার এটা মোটামুটি সবাই নিশ্চিত ছিলেন। কিন্তু এমনভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে গোটা ভারতকে ধসিয়ে দিবেন- তা কে ভেবেছে। খেলা শেষে তাই নায়ক ওই লিকলিকে মুস্তাফিজ। গায়ের জোরে নয়, কৌশলে ঘায়েল করেন তিনি বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যাদের। ধীরগতিতে (স্লোয়ার) আর কাটারেই কাবু রোহিত, রায়না, রাহানেরা।

অভিষেকে পাঁচ উইকেট নিয়ে ভারতকে ৭৯ হারানোর নায়ক তিনিই। তাই খেলা শেষে সতীর্থরা তাকে নিয়ে কী করবেন যেন দিশা পাচ্ছিলেন না। সবাই তাকে জড়িয়ে অভিনন্দন জানাতে ব্যস্ত, কেউবা কাঁধে তুলে নিতে চাইলেন। আর অধিনায়ক মাশরাফিতো তার কপালে যেন চুমু এঁকে দিতে লাগলেন।

বিচিত্র সে এক অভিজ্ঞতা লাজুক ছেলেটির। তার মুখে কেবল স্মিত হাসি। বুঝতেই যেন পারছিলেন না তিনি আহামরি কী-ই বা করেছেন যে এতো উল্লসিত হতে হবে তাকে নিয়ে। পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চে যারা তাকে দেখেছেন তারা বুঝেছেন তার অবস্থা। ইংরেজি বলতে পারেন না তেমন। আর তাই অধিনায়ক মাশরাফি আসেন দোভাষীর ভূমিকায়।

কিন্তু বাংলাতেও তার মনের অবস্থা বোঝাতে পারছিলেন না। একই অবস্থা ছিল বদ্ধ ঘরের সংবাদ সম্মেলনেও। বলতেই পারছিলেন না কিভাবে তার ক্রিকেট জীবন শুরু। ভাগ্যবশত যেভাবে জাতীয় দলে উঠে আসেন মুস্তাফিজুর রহমান এই নিয়ে এবারের প্রতিবেদন। উপমহাদেশের অনেক ক্রিকেটারের সঙ্গেই মিলে যাবে মুস্তাফিজের বেড়ে ওঠার গল্প। একেবারে অজপাড়ায় জন্ম।

সেখান থেকে ক্রিকেটের ভালবাসা আজ তাকে নিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। কপাল ভাল তার, না হয় অনেক প্রতিভার মতো হারিয়ে যেতে পারতেন তিনিও। তার পরিবার মুস্তাফিজের প্রতিভা আর ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসাটা বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টাও করেছেন প্রত্যক্ষভাবে। শৈশবে বন্ধুদের সঙ্গে টেনিস বলে ব্যাটসম্যান হিসেবেই খেলতে চাইতেন। নিজেকে দেখতে চাইতেন লারা-শচীনদের কাতারে।

কিন্তু দৈহিক গড়ন দেখে অনেকেই তাকে পরামর্শ দেন ফাস্ট বোলিং করার জন্য। সাতক্ষীরা জেলা বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণে, ভারতের সীমান্তঘেঁষা। রাজধানী থেকে প্রায় সাড়ে তিনশ’ কিলোমিটার দূর। মুস্তাফিজের গ্রাম থেকে সাতক্ষীরা শহরও ৪০ কিলোমিটার দূরে। তাই তার এক বড় ভাই মুখলেসুর রহমানের ওপর দায়িত্ব পড়ে অনুজকে ক্রিকেটমাঠে নিয়ে যাওয়া আর নিয়ে আসার।

মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে শীতের প্রত্যুষে মুস্তাফিজকে নিয়ে বের হতেন মুখলেস। রাতের আকাশে উজ্জ্বল তারা হয়েও মুস্তাফিজ তাই ভোলেননি সেই ভাইকে। বললেন, আমি তখন সাতক্ষীরা শহরটাও ঠিকমতো চিনতাম না। প্রতি ভোরে ভাই আমাকে নিয়ে যেতেন অনুশীলনে। আর তাই আজ এই জয়ের রাতে সবার আগে যাকে মনে পড়ে তিনি হলেন আমার সেই ভাই।’

সাতক্ষীরায় প্রশিক্ষণ থেকেই তার ডাক পড়ে অনূর্ধ্ব ১৭ প্রতিযোগিতায়। এরপর ঢাকায় পেস বোলিং শিবিরে সুযোগ পান। মিরপুরের শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের সুযোগ-সুবিধায় দ্রুত পরিশীলিত হতে থাকেন তিনি। সবার নজরেও আসেন দ্রুত। অনূর্ধ্ব ১৯ জাতীয় দলেও খেলেন তিনি। ২০১৪ সালে অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপের ছয় খেলায় নয় উইকেট নেন তিনি।

এরপর প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ তাকে তুলে আনেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের বাংলাদেশ ‘এ’ দলে। ২০১৩ মওসুমে জাতীয় ক্রিকেটে লীগে খুলনার হয়ে অভিষেক হয় তার প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে। ২০১৪-১৫ মওসুমে ২৬ উইকেট নেন প্রথম শ্রেণীর খেলায়। তার চেয়ে বেশি উইকেট ছিল কেবল পেসার শহীদের।

কিন্তু ২০টির বেশি উইকেট পাওয়া চার পেসারের মধ্যে তার গড়ই সবচেয়ে ভাল ১৮.০৩। সংবাদ সম্মেলনে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় কিভাবে তিনি তার এই স্লোয়ার বলের ওপর এত নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ রাখতে শিখেছেন। সরল উত্তর- ‘একদিন অনূর্ধ ১৯ দলের অনুশীলনের সময় বিজয় ভাই (এনামুল হক) আমাকে স্লোয়ার কাটার দিতে বললেন। তখনই প্রথমবারের মতো আমি চেষ্টা করি সেই বল করার এবং তাকে আউট করি।

এরপর থেকে আমি ওই বল দেয়া শুরু করি।’ বৃহস্পতিবার তার চার ওভারের প্রথম স্পেলটা খুব কার্যকরী হয়নি। রোহিত শর্মা তাকে সীমানার বাইরে পাঠান কয়েকবার। পরে অবশ্য তাকে দিয়েই শুরু। ওয়ানডে ক্রিকেটে একমাত্র দুটি ডবল সেঞ্চুরির মালিক যিনি সেই রোহিত শর্মা তার প্রথম ওয়ানডে উইকেট। চিরদিন মনে রাখার মতোই বটে।