মেইন ম্যেনু

ভারতবিদ্বেষী তকমা মুছতে চায় বিএনপি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফরে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলে ‘ভারতবিদ্বেষী’ তকমা মুছে ফেলতে চায় বিএনপি। সেজন্য অতীতের ভুল শুধরে দেশটির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নকে গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।

৬ জুন ঢাকায় আসছেন নরেন্দ্র মোদি। বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে কি তা নিয়ে আশঙ্কা থাকলেও দলীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, সফরের দ্বিতীয় দিন বিকেলে হোটেল সোনারগাঁওয়ে হতে পারে খালেদা-মোদির বৈঠক। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে এই তথ্য।

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার খবরে চূড়ান্ত ফলাফলের আগেভাগেই অভিনন্দন জানিয়েছিলো বিএনপি। প্রত্যাশা ছিলো, তাদের সরকারবিরোধী আন্দোলনে বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশে নতুন নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারকে চাপ দেবে ভারত। কিন্তু বিএনপির সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেয়নি। সেজন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বাংলাদেশ সফরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করতে চাইছে বিএনপি।

সেক্ষেত্রে ২০১৩ সালের ৪ মার্চ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকটি হরতালের অজুহাতে বাতিল করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যে ভুল করেছেন তা শোধরাতে চায় দলটি। আর সম্পর্কোন্নয়নের জন্য আগামী ৬ জুন আসন্ন মোদির সফরকেই টার্গেট করেছে বিএনপি।

সূত্রগুলো জানায়, মোদি-খালেদা বৈঠকের বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি, বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আলোচনা করার বিষয়ে সম্ভবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে দশম সংসদ নির্বাচন বাতিল করে মধ্যবর্তী নির্বাচন, দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার-হয়রানির বিষয়গুলো ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবেন খালেদা জিয়া।

দলীয় সূত্রগুলো আরো বলেছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নকে বিএনপি এই সময়ের এক নম্বর এজেন্ডা হিসেবে বিবেচনা করছে। এজন্য মোদির বাংলাদেশ সফরকে দলটি চূড়ান্ত সুযোগ হিসেবে দেখছে । বিএনপি মনে করছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এবং সর্বশেষ তিন মাসের যে আন্দোলন হয়েছে তা অতীতে খুব একটা হয়নি। সারাদেশ থেকে রাজধানীকে কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিলো। কিন্তু ঢাকায় আন্দোলন না জমার কারণে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করা যায়নি। এর পেছনে দল সাংগঠনিকভাবে যতটা না ব্যর্থ তার চেয়ে বড় বিষয় হিসেবে কাজ করেছে সরকারের কোনো ধরনের কুটনৈতিক চাপ অনুভব না করা। বিশেষ করে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের নিশ্চুপ অবস্থান হতাশ করেছে বিএনপিকে। সেজন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এই মুহূর্তে বিএনপির এক নম্বর অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেছেন, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়া সাক্ষাৎ না করায় যে ভুল হয়েছে তার খেসারত এখনও দিচ্ছে বিএনপি। যারা বিএনপি নেত্রীকে ভুল বুঝিয়ে ওই ঘটনা ঘটিয়েছেন, তারা দলের অনেক ক্ষতি করেছেন। সে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

দলটির নেতারা আশা করছেন, সমমর্যাদার ভিত্তিতে দু’দেশের মধ্যে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক, অমীমাংসিত ইস্যু এবং বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্র পূনরুদ্ধারে’জনগণের পশে থাকবে মোদি সরকার। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে সময় অনুযায়ী ভারতের নতুন সরকার ‘চাপ প্রয়োগ’করবে- সে আশাও পোষণ করেন তারা। দু’দেশের জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

বিএনপি ভারত বিরোধী নয় বরং প্রতিবেশি দেশ হিসেবে তাদের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক চায়- এ কথা জানিয়ে বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ‘বিএনপি বাংলাদেশ ও জনগণের স্বার্থে কথা বলে। সেজন্য সীমান্ত হত্যা ও তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে। তার মানে এই নয় যে, আমরা ভারত বিরোধী।’

রিপন অভিযোগ করেন, ‘সরকারের মধ্যে অনেকে অপপ্রচার করে যে, বিএনপি ভারত বিরোধী। এটি সঠিক নয়। কোনো দেশের রাজনীতিবিদই দেশের স্বার্থ বিলিয়ে দিতে সম্পর্ক করে না। ভারতের বিরুদ্ধে নয়, দেশের স্বার্থের জন্য বিএনপি কথা বলেছে। আমরা ভারতের সঙ্গে একটি ইফেক্টিভ সম্পর্ক আশা করি।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফরকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে এদেশের জনগণও তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাতে প্রস্তুত আছে।’ মোদির এই সফরের মধ্যে দিয়ে দু’দেশের জনগণের মধ্যে আরো সুসর্ম্পক হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

নরেন্দ্র মোদিকে ‘অত্যন্ত দূরদর্শী রাজনীতিবিদ’ আখ্যা দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘তার (নরেন্দ্র মোদি) অভিজ্ঞতার আলোকে এদেশে গণতন্ত্র বিকাশে কাজ করবেন। তিনি আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, তার সরকার কোন বিশেষ দলের সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে কাজ করবে। আমরাও বিশ্বাস করি, মোদির সরকার জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।’

বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত এই নেতা বলেন, ‘সার্কভুক্ত দেশ ভারত অন্যতম বড় গণতান্ত্রিক দেশ। তারা পার্শ্ববর্তী সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়। তিনি (মোদি) নিজেও চান প্রতিবেশী দেশগুলোতে তার মতো একটি গণতান্ত্রিক সরকার থাকবে। যেখানে মানুষ তার গণতান্ত্রিক অধিকার যথাযথভাবে পালন করতে পারবে।’

রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল কোনো পদে বা বিরোধী দলে না থাকায় মোদির সফরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্য সময় থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে অবশ্যই বৈঠক হবে।’ পাশাপাশি মোদি তার সফরকালে এদেশের ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের’ জন্য আশা আকাঙ্খার কথা শোনাবেন, সেটিও আশা করেন তিনি।

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি ৬ জুন বাংলাদেশ সফরে আসছেন। ওই সফরে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে তার বৈঠকের দিন ক্ষণ গোপন রাখা হয়েছে। যিনি (খালেদা জিয়া) ১৬ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটান, সেই নেত্রীর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ হবে না, তা এ দেশের মানুষ ভাবতে পারে না।’

বিএনপি প্রধানের সঙ্গে মোদির নিশ্চয় বৈঠক হবে- এই আশা ব্যক্ত করে দলের এই নেতা বলেন, ‘আমরা চাই, সেই বৈঠকে তিনি (নরেন্দ্র মোদি) এদেশে গণতন্ত্র উত্তরণে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী গণতন্ত্রের কথা বলুন। ১৬ কোটি মানুষের কাছে গণতন্ত্রের বিজয়ের বার্তা শোনান।’

মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় গণতান্ত্রিক দেশ। সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘বহুল প্রত্যাশিত’ বাংলাদেশ সফরে আসছেন। তার এই সফরকে আমরা স্বাগত জানাই।’

মোদির এবারের সফরে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধান হবে- এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘অতীতে জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে ভারতের অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান বাংলাদেশ সফরে এলেও সংকটের সমাধান হয়নি। তবে ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোদির এই সফর নিয়ে অনেক আশার সৃষ্টি হয়েছে।’ তোমার লাভ, আমারও লাভ- এই নীতিতে সীমান্ত চুক্তি, তিস্তা চুক্তি, ছিটমহল সমস্যা, বাণিজ্যিক বৈষম্য দূরীকরণ ও অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা ব্যক্ত করেন বিএনপির এই নেতা।রাইজিংবিডি