মেইন ম্যেনু

ভারতীয় পত্রিকায় খালেদার সাক্ষাৎকার

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৩৬ ঘণ্টা ঢাকা সফরে এমন অনেক কিছু্ ঘটেছে যা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে মুখরোচক ইস্যু সম্ভবত খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার সংক্ষিপ্ততম বৈঠক, যার স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় দশ মিনিটের মতো। এসময়ে খালেদা জিয়াকে দেখা গেছে লিখিত অভিযোগনামা পাঠ করতে এবং মোদিকে সুবোধ ভঙ্গিতে বসে শুনতে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এর আগে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে খালেদার সঙ্গে মোদি আদৌ বৈঠকে বসবেন কি না। কিন্তু দেখা গেছে, অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য হলেও খালেদা জিয়া তার প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়ন করেছেন এবং বলেছেন সরকারের সমস্ত বিরোধিতা সত্ত্বেও দিল্লির অকুণ্ঠ সহায়তায় এই বৈঠক সম্ভব হয়েছে। বহুল আলোচিত বৈঠকের পরই সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি হয়েছিলেন ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক সানডে গার্ডিয়ানের সাংবাদিক সৌরভ স্যানাল। সাক্ষাৎকারের বিভিন্ন অংশে উঠে এসেছে মোদির সঙ্গে বৈঠককে ঘিরে সৃষ্ট জটিলতাসহ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফর, জামায়াতের সঙ্গে দলীয় অংশীদারিত্ব, বিগত সংসদ নির্বাচনসহ আরও নানান সংবেদনশীল ইস্যু। গতকাল শনিবার সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছে।

বেগম জিয়া, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক কেমন হয়েছিল?
খুবই সন্তোষজনক বৈঠক হয়েছে। ‘মোদিজি’র সঙ্গে আলাপ একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা। আমাকে অবশ্যই বলতে হচ্ছে, বৈঠকটিতে বেশ অন্তরঙ্গ পরিবেশ বজায় ছিল। আমি খুবই সন্তুষ্ট।

কোন বিষয়গুলো নিয়ে বৈঠক হয়েছিল?
আগেও যেমন বলেছিলাম, বৈঠকটি ছিল খুবই অন্তরঙ্গ এবং ভালো। আপনি জানেন, ওটা ছিল শুধুমাত্র দুইজন মানুষের বৈঠক। আমরা কোন কোন বিষয়ে কথা বলেছি তা আমি বলতে পারি না। কিন্তু স্পষ্টভাবেই ওটা ছিল একটি সন্তোষজনক বৈঠক।

একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, আলোচনাটি হওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়ে সবাইকে সন্দিহান মনে হচ্ছিল। যখন আপনি সত্যিই প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে পৌঁছালেন, তখন কি সব সংশয় দূরে হয়েছিল? এই সংশয় তৈরি হয়েছে কোন বিষয়টিকে কেন্দ্র করে?
সবকিছু নিয়ে সংশয় কি ছিল? আমি কি একবারও বলেছিলাম যে আমি মোদিজির সঙ্গে আলোচনা করবো না? তিনি নির্বাচনে জেতার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে অভিনন্দিত করেছিলাম। আপনি কি শুনেছেন, আমাদের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির (বিএনপি) কোনো নেতা বলেছেন যে আমি মোদিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো না? মোদিজি বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের নেতা। তিনি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক মজবুত করার লক্ষ্য নিয়েই বাংলাদেশে এসেছিলেন। এই সংশয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি করে একধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টির সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। মোদির সঙ্গে যে আমার কোনো বৈঠক হয়নি সেটা প্রমাণ করারও সর্বাত্মক চেষ্টা চলেছে।

ম্যাডাম, আপনি তখন বলেছিলেন যে মোদির সঙ্গে আপনার বৈঠককে বাধাগ্রস্ত করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চলছে। এর পেছনে কে আছে বলে আপনি মনে করেন?
সত্যি কথাটা আমাকে সরাসরিই বলতে হচ্ছে। মোদি যখন বাংলাদেশে তখন তার সঙ্গে আমার বৈঠকের সম্ভবনাকে পুরোপুরি জনসমক্ষে নাকোচ করে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তখন নয়াদিল্লি সত্য প্রকাশে এগিয়ে আসে। মোদি যেদিন দেশে এলেন সেদিন বিকেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন উক্তির ঘণ্টাখানেক পরই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শংকর নয়াদিল্লি থেকে বলেন, মোদির সঙ্গে বৈঠকে বসা সম্ভব। তো এখন এই দুটো ব্যাপার আপনি কীভাবে মেলাবেন? আমি ভারতীয় প্রশাসনের কাছে কৃতজ্ঞ এজন্য যে বাংলাদেশ সরকার এই বৈঠক ঠেকাতে যে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে সেটা তারা লক্ষ্য করার পরও আমার সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। সরকার কোনোভাবেই চায়নি মোদিজির সঙ্গে আমার কোনো প্রকার আলোচনা হোক।

একটা প্রশ্ন তাহলে আপনাকে সরাসরিই করছি, আপনি বলেছেন মোদির সঙ্গে আপনার বৈঠক ঠেকাতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। কিন্তু ২০১৩ সালের মার্চ মাসে যখন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশে এসেছিলেন তখন আপনি তার সঙ্গে দেখা না করার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
আপনাকে ধন্যবাদ যে আপনি এই প্রশ্নটা করেছেন। এটা সত্যি যে প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন তখন আমি তার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। তখন জামায়াতে ইসলামীর অবরোধ চলছিল, ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলটির তিনজন শীর্ষস্থানীয় নেতা অভিযুক্ত ছিলেন। তাদের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি হিসেবে জামায়াত ওই অবরোধ ডেকেছিল। তখন খবর এসেছিল যে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যদি আমি দেখা করতে যাই তাহলে আমার ওপর আক্রমণ হতে পারে। রীতিমতো জীবন সংশয়ের ব্যাপার। এবং আপনার হয়তো মনে আছে, তিনি যে হোটেলে ছিলেন তার কাছেই এক জায়গায় পেট্রোলবোমা বিস্ফোরিত হয়, যে স্থানটি আমাকে অতিক্রম করতেই হতো।

কিন্তু জামায়াতে ইসলামী তো জোটের অংশীদার। কেন তারা আপনাকে আক্রমণ করতে যাবে?
এখানেই তো মূল বিষয়টি বোঝার ব্যাপার। ওই সময়ে আমার ওপর যদি কোনো হামলার ঘটনা ঘটে পুরো দোষটা পড়বে জামায়াতের ওপর। এখনেই তো আমাদের প্রতিপক্ষের চাল, যেটা আমরা ধরে ফেলেছিলাম এবং বৈঠকের পরিকল্পনা বাতিল করে দিয়েছিলাম। আজকে আমি আপনার সঙ্গে সত্যি কথাটা বললাম।

বেগম জিয়া, প্রণব মুখার্জি যখন ঢাকা ছিলেন তার সঙ্গে কেন দেখা করেননি সে ব্যাপারে আপনার অবস্থান ব্যাখ্যা করলেন। সারা পৃথিবী কিন্তু এটাকে আপনার ভারতবিরোধী অবস্থানের অংশ বলে মনে করছে।
কেন আমি ভারতবিরোধী হতে যাবো? দেখুন, আপনাকে আমি ঠিক এটাই বলতে চাচ্ছি। এটা আমার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন সরকারের অপপ্রচারের অংশ। তারা চাইছে আমার ভারতবিরোধী, হিন্দুবিদ্বেষী ভাবমূর্তি দাঁড় করাতে। ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যকার বন্ধন খুবই দৃঢ়, আর আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতের অবদানকে আমরা পুরোপুরি স্বীকার করি। মোদি এসেছেন ভারত-বাংলাদেশের এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে। আর আমাকে ভারতবিরোধী প্রমাণের এটাই ছিল মোক্ষম মুহূর্ত। আমাকে এবং বিএনপিকে ভারতবিরোধী প্রমাণের জন্য খুবই তৎপর অপপ্রচার যন্ত্র সচল ছিল।

কিন্তু জামায়াতে ইসলামী তো আপনার জোটের অংশীদার। তাদের ধর্মীয় চরমপন্থি ভাবমূর্তি রয়েছে এবং তাদের তাদের কর্মকাণ্ডও খুব একটা ভারতবান্ধব নয়, সেক্ষেত্রে….
অবশ্যই জামায়াত আমাদের জোটের অংশীদার। জোটের শর্ত হিসেবেই তারা বিএনপির কথা শুনতে বাধ্য। কথা যেহেতু এদিকেই মোড় নিলো, তাহলে আপনাকে আরও কিছু কথা বলা যায় যেগুলো শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষত হিন্দুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয় আওয়ামী লীগের হাতে। তাদের বাড়িতে লুটপাট চলে, তাদের জমিজমা কেড়ে নেয়া হয়। আর আমাদেরকে বলা হয় কিনা হিন্দুবিরোধী! আমরাতো বরং হিন্দুদের সঙ্গে আছি এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে বাংলাদেশে। আমাদের ওপর অবিরাম হামলা চলছে, আমাদের নেতাদের হত্যা করা হচ্ছে, বিশ হাজারের মতো নেতা নিখোঁজ এবং যে এই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে তাকে চিহ্নিত করে আক্রমণ করা হয়। চরম সঙ্কটাপন্ন অবস্থা এবং যখনই আমি এর বিরুদ্ধে কথা বলছি, তখনই আমাকে পাকিস্তানের দালাল বলা হচ্ছে। আমার স্বামী জিয়াউর রহমান, তিনি স্বাধীনতার ঘোষক। তিনি ছিলেন মেজর এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন, সেটা কি আমরা ভুলে গেছি?

কিন্তু বেগম জিয়া, নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনি তো আওয়ামী লীগকে একপ্রকার মাঠ ছেড়েই দিয়ে এসেছেন। আর আজ আপনি বলছেন দেশ বেআইনিভাবে চলছে….
আওয়ামী লীগ একসময় নির্বাচনী ইস্যুতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। আমরাও তাদের সঙ্গে একমত হয়েছিলাম এবং নির্বাচনও ওভাবেই হয়েছিল। কিন্তু এরপর আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় এসে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে সংবিধান পরিবর্তন করলো, আর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রহিত হয়ে গেল। আর আমরাও বুঝতে পারলাম, একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন কখনোই হবে না। বরং আওয়ামী লীগ তার সমগ্র শাসনযন্ত্র এবং পুলিশকে সর্বতোভাবে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইবে এবং দেখুন সর্বশেষ ঢাকা পৌর নির্বাচনে কী হলো। যখন ভোটাররা ভোট দিতে এলো তাদেরকে উল্টো বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হলো, বলা হলো যে তাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে। নির্বাচন চলাকালে একজন পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য ধারণ করা আছে, সেখানে সবাই পরিষ্কারভাবে শুনেছে যে পুলিশ কীভাবে গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছে। এরপরও কি এখানে একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন কখনও আশা করতে পারি?

এই ভবনে আমি বিরানব্বই দিন যাবৎ অবরুদ্ধ ছিলাম। যোগাযোগের সমস্ত উপায় তারা নষ্ট করে দিয়েছিল। পিপার স্প্রে ব্যবহার করেছিল তারা, খাবারের সরবরাহও বন্ধ করে দেয় হয় এবং একটা সময় পানি সরবরাহও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এটাই জাজ্জ্বল্যমান সত্য।

এরপর আপনার পরিকল্পনা কী, বেগম জিয়া?
আমরা একটা অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে এটা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশে কী ঘটছে সেদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলোর অবশ্যই নজর রাখা উচিৎ।