মেইন ম্যেনু

ভারতীয় ভিসা : ই-টোকেন বাণিজ্যের নেপথ্যে কারা

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা শামীম আহমেদ। একটি সিমেন্ট কোম্পানিতে চাকরি করেন। ঈদের পর ভারত যাওয়ার পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ভিসার জন্য আবেদন করবেন। ভারতীয় দূতাবাসের ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনে আবেদন ফরমও পূরণ করেছেন তিনি। তবে কোনোভাবেই ফাইল নম্বর দিয়ে ই-টোকেন বা সাক্ষাতের তারিখ পাচ্ছিলেন না। সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে পড়ার পর একটি কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে টাকা দিয়ে ১৫ দিন পর সাক্ষাতের অনুমতি পান তিনি।

শামীমের মতো হাজারও লোক দুই থেকে তিন হাজার টাকার বিনিময়ে ই-টোকেন সংগ্রহ করে ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন করছেন। ঢাকা থেকে ভারতীয় দূতাবাসে ভিসা আবেদনের ফি মাত্র ৬০০ টাকা। তাহলে কেন অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা গচ্চা যাচ্ছে আবেদনকারীদের? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে অনুসন্ধান চালিয়েছে ।

অতিরিক্ত এ টাকা নিচ্ছে বাংলাদেশি ট্যুর অপারেটর এবং কম্পিউটার কম্পোজের দোকানগুলো। এতে ভারতীয় দূতাবাসের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তাহলে কীভাবে তারা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ই-টোকেন পাচ্ছে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের একটি ট্যুর অপারেটর কোম্পানির মার্কেটিং প্রধান বলেন, আমরা ই-টোকেন বিক্রি করি না, আমরা তৃতীয় পক্ষ। মূলত কয়েকটি আইটি সল্যুশন প্রতিষ্ঠান এ কাজ করে। তারা আমাদের ফোন দিয়ে চাহিদা জানতে চায় ও একটি ই-মেইল অ্যাড্রেস দেয়। আমরা গ্রাহকদের ফাইল নম্বর ই-মেইলে পাঠালে তারা ফিরতি ই-মেইলে ই-টোকেন পাঠায়।

তবে ই-মেইলে ই-টোকেন নম্বর দেয়ার আগে ৫০ ভাগ টাকা বিকাশে পরিশোধ করতে হয়। বাকি টাকা ই-টোকেন পাওয়ার পর দিতে হয়। এছাড়া আর্জেন্ট ই-টোকেনের জন্য অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়।

এই আইটি সল্যুশন প্রতিষ্ঠান কারা চালান- জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা তাদের নাম-পরিচয় জানি না। জানার প্রয়োজন হয় না। কারণ, ভারতের প্যাকেজ বিক্রি করতে হলে আমাদের ই-টোকেন দরকার। তাই কিছু না জেনেই আমরা ই-টোকেন সংগ্রহ করি। মাঝে মাঝে পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের একটি ‘আন্তর্জাতিক আইটি সল্যুশন’ প্রতিষ্ঠান বলে দাবি করে। এছাড়া তারা প্রতি সপ্তাহে ই-মেইল ও ফোন নম্বর পরিবর্তন করে।

নাসির ট্যুরিজমের এক্সিকিউটিভ জামাল হায়দার বলেন, আমাদের অফিসে ফোন করে তারা নিজেদের ‘আইটি বিশেষজ্ঞ’ বলে পরিচয় দেন। এ পর্যন্ত তারা অনেকের ই-টোকেন করে দিয়েছেন। ফোন দিয়ে তারা বলেন, তারা কয়েকজন ছাড়া বাংলাদেশে কেউ ই-টোকেন করতে পারে না। তাদের সঙ্গে দূতাবাস কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না।

তিনি আরো বলেন, সাধারণত একটি নরমাল ই-টোকেনের জন্য তারা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং আর্জেন্ট ই-টোকেনের জন্য ১৫শ টাকা পর্যন্ত নেন। ট্যুর অপারেটররা এছাড়া গ্রাহকদের কাছ থেকে যে যেমন পারেন টাকা নেয়।

তবে ভারতীয় হাইকমিশন জানিয়েছে, বাংলাদেশে ভিসা দেয়ার জন্য তাদের কোনো অনুমোদিত এজেন্ট বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নেই।

এদিকে, ই-টোকেন সরবরাহকারী চারটি ট্যুর অপারেটর ও দুটি ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েকজন আইটি বিশেষজ্ঞ ও সল্যুশন প্রতিষ্ঠান একজোট হয়ে ভারতীয় দূতাবাসের ওয়েবসাইট জ্যাম করে রাখে। তাই ফরম পূরণ করে ফাইল নম্বর পেলেও ই-টোকেন পাওয়া যায় না।

এদের মধ্যে কয়েকটি আইটি সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বেআইনিভাবে সিকিউরিটি চেক করার মাধ্যমে সার্ভার ব্যস্ত করে রাখে। দিনের কোনো এক সময় তারা ১০ মিনিটের জন্য সার্ভার ফ্রি করে নিজেরা নিজেরা ই-টোকেন সংগ্রহ করে।

সম্প্রতি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে ভারতীয় হাইকমিশন। যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ই-টোকেন বাণিজ্য করছে, তাদের গ্রেফতারের অনুরোধ জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে তারা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই চিঠি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

চিঠি পাওয়ার পর ই-টোকেন সরবরাহকারীদের ধরতে পরিকল্পনা করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিকভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং বিজ্ঞাপন থেকে সরবরাহকারীদের ফোন নম্বর নিয়ে তাদের গ্রেফতারের ছক তৈরি করা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা পেলে আমরা তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালাবো।

এছাড়া যদি সার্ভার জ্যাম করে রাখার বিষয়টি প্রমাণিত হয় তবে সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে আইসিটি অ্যাক্টেও মামলা দায়ের করা হবে বলেও জানান ওই ডিবি কর্মকর্তা।