মেইন ম্যেনু

ভারতের ইঁদুর মাতার মন্দির

পুরান মতে ১৪০০ সালের দিকে ভারতের ইঁদুর মন্দিরের কাছাকাছি কোনো এক স্থানে। হিন্দু দেবী দুর্গার অবতার করনি মাতা মৃত্যুর দেবতা যমকে গল্প বলিয়ের পুত্রকে পুনরায় জীবিত করতে বলেন। কিন্তু মৃত্যুদেবতা যম তা করতে অস্বীকার করলেন। আর তখনই করনি মাতা এই বলে অভিশাপ দিলেন যে, সকল পুরুষ গল্প বলিয়ে পরবর্তীতে ইঁদুর হিসেবে জন্মগ্রহন করবে এবং ইঁদুর হিসেবে মৃত্যুর পর করনি মাতার বংশধর হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।

ইঁদুর মাতার মন্দির

অবশ্য রাজস্থানের সাবেক সেই ইঁদুর মাতার মন্দির এখন আর নেই। এখন মার্বেল দ্বারা নির্মিত যে মন্দিরটি আমরা দেখতে পাই সেটা মূলত ১৯০০ সালের দিকে নির্মিত। এর আগে ১৫০০ সালের মন্দিরটি বিভিন্ন সময়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় ভক্তদের মধ্য থেকে বিশিষ্ট জনেরা এই মন্দির নির্মানে সহায়তা করেন। ওই মন্দির নির্মানের আগেও সেখানে ইঁদুর হত্যা করা হতো না, কিন্তু মন্দির স্থাপনের পর স্থানটি হলো হাজার হাজার ইঁদুরের নিরাপদ আশ্রয়, যেমনটা শিশুরা মায়ের কোলে নিরাপদে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে প্রায় বিশ হাজারেরও বেশি ইঁদুর রাজ্য বিস্তার করে আছে করনি মাতার মন্দিরে।

ইঁদুর মাতার মন্দির

পৌরানিক হিসেব মতে, বর্তমানে মন্দিরে আছে প্রায় ৫১৩টি করনি মাতার বংশধরদের পরিবার। এই পরিবারগুলোর মধ্য থেকে নির্দিষ্ট সময় করে মন্দিরের দায়িত্ব বন্টন করা আছে। পরিবারগুলোর কয়েকটি স্থায়ীভাবে এই মন্দিরেই বসবাস করে। তাদের উপরই ন্যাস্ত আছে মন্দিরের সকল ইঁদুরদের দেখভাল করা এবং মন্দিরকে পরিচ্ছন্ন রাখা। পরিবারগুলোর কাছে এই ইঁদুরগুলো ‘কাব্বা’ অথবা ‘ছোটো শিশু’ হিসেবেই পরিচিত।

ইঁদুর মাতার মন্দির

ছোটো এই শিশুদের জন্য খাবার হিসেবে প্রতিদিন ভক্তদের দেয়া দুধ, নাড়ু ইত্যাদিতো থাকেই। উপরন্তু মন্দিরের সেবায়তরা প্রতিবেলায় হরেক পদের খাবার নিয়ে আসে ইঁদুরদের জন্য। মাঝারি আয়তনের লোহার বাটিতে ইঁদুরদের জন্য দুধ দেয়া হয়। দুধ দেবার পর দেয়া হয় বাদাম দিয়ে বানানো মিষ্টি নাড়ু। গোটা মন্দির প্রাঙ্গনে তাই ইঁদুরের খাবারের অবশিষ্টাংশ নাড়ু, নারকেল দেখতে পাওয়া যায়।

ইঁদুর মাতার মন্দির

মন্দিরে আসা ভক্তদের কাছে ইঁদুরের খাবারের ওই উচ্ছিষ্টাংই হলো প্রসাদ সমতুল্য। ভক্তি সহকারে লোহার পাত্র থেকে দুধ, নাড়ু তুলে খান ভক্তরা। মন্দিরে কোনো বিষয় নিয়ে নেই বাড়াবাড়ি। কেউ চাইলে দীর্ঘদিন এই মন্দিরে থাকতে পারেন। কিন্তু একটা বিষয়ে এই মন্দিরের রয়েছে খুব কঠোর আইন। আর সেটা হলো, কোনো ইঁদুর যদি দুর্ঘটনাবশত মারা যায় তাহলে রৌপ্য অথবা স্বর্ণ দিয়ে নতুন একটি ইঁদুর তৈরি করে দিতে হয়।

ইঁদুর মাতার মন্দির

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ অবধি ইঁদুরদের কারণে ওই অঞ্চলের মানুষদের কোনো রোগব্যাধি হয়নি। ইঁদুরদের বেশ কয়েকবার শারিরীক অসুস্থতার ঘটনা ঘটেছিল কিন্তু সেটা মানুষের উপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। বর্হিবিশ্বের বেশ কয়েকটি বেসরকারি এনজিও এই মন্দিরটির পরিবেশ নিয়ে সমালোচনা তুলেছিল, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষায় মন্দিরটিতে এমন কোনো রোগ-জীবানু পাওয়া যায়নি যা মানবশরীরের জন্য ক্ষতিকারক। অবশ্য স্থানীয়দের বিশ্বাস, করনি মাতা সার্বক্ষনিক ওই ইঁদুরদের সঙ্গে আছেন এবং নিজ সন্তানের মতো আগলে রাখেন।

ইঁদুর মাতার মন্দির

প্রতি বছর বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে অগুনতি মানুষ আসেন এই ইঁদুর মাতার মন্দির দেখতে। যারা দিনে এসে দিনে চলে যান তাদের জন্য ইঁদুর মাতার মন্দিরে দেখার মতো অত কিছু নেই। তবে যারা ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে পারেন, তারা মধ্যরাতে এবং ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগে দলে দলে ইঁদুরদের সমবেত নৃত্য দেখতে পারেন। মন্দিরের প্রতিটি দেয়াল তখন দেখার মতো দৃশ্য হয়ে ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ ভয় পাওয়ার কারণে মন্দির কর্তৃপক্ষ ওই সময়ে বাইরের কোনো ব্যাক্তিকে মন্দির প্রাঙ্গনে থাকতে দেন না।



« (পূর্বের সংবাদ)