মেইন ম্যেনু

ভারতের গরুর গোশতের অর্থনীতি!

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গরুর গোশত রফতানিকারক দেশ হচ্ছে ভারত। প্রথমে হয়তো কারো বিশ্বাস হতে চাইবে না। কিন্তু তথ্য, পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা তা-ই প্রমাণ করে। ভারত ২০১৪ সালে ৪৮০ কোটি মার্কিন ডলারের গরুর গোশত রফতানি করেছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। এ তথ্য দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ। এই বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য মতে, ভারত মূলত মহিষের গোশত রফতানি করে থাকে। কিন্তু এটি গরু প্রজাতির একটি প্রাণী। তাই একে গরুর গোশত রফতানি হিসেবেই বোঝানো হয়েছে। তবে মহিষের সাথে গরুর গোশত ভারত থেকে রফতানি হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ভারত থেকে প্রতি বছর দুই হাজার ৮২ মেট্রিক টন গরুর গোশত রফতানি হয়ে থাকে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ব্রাজিল এক হাজার ৯০৯ মেট্রিক টন, অস্ট্রেলিয়া এক হাজার ৮৫১ মেট্রিক টন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে রফতানি হয় এক হাজার ১১৭ মেট্রিক টন গোশত। ভারত থেকে রফতানিকৃত গরুর গোশতের বেশির ভাগের গন্তব্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। এর মধ্যে বেশি রফতানি হয়ে থাকে ভিয়েতনামে। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে মালয়েশিয়া, মিসর ও সৌদি আরব।

ভারত বিশ্বের বৃহত্তম হিন্দু জনগোষ্ঠীর দেশ। ধর্মীয় কারণে সে দেশে গরুকে দেবতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে দেশটির অধিকাংশ জায়গায় গরু জবাই করা নিষিদ্ধ। একই সাথে ভারত থেকে গরু রফতানি করাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত রয়েছে মহিষ। এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে যেয়ে ‘র‌্যাবোব্যাংক’ বিশ্লেষক পণ কুমার ‘সিএনএন মানি’কে বলেন, ‘অনেকটা দুর্ঘটনাক্রমে ৪৮০ কোটি ডলারের এই রফতানি পণ্যটির জন্ম হয়েছে। কারণ ভারতে দুধের একটি বিশাল বাজার রয়েছে। এই দুধের বাজারের চাহিদা পূরণ করছে মহিষ। এই মহিষকে আবার রফতানি নিষিদ্ধ তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। তাই মহিষের গোশত বিদেশে রফতানি হচ্ছে। তিনি বলেন, এখানকার রফতানিকৃত মহিষের গোশত তুলনামূলক দামে সস্তা। তাই ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এ খাতে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ শতাংশ।

ভারত থেকে গরুর যে গোশত রফতানি হয় তার ৪০ ভাগের গন্তব্য ভিয়েতনাম। কিন্তু এই গোশতের সব আবার ভিয়েতনামের জনগণের খাবার হিসেবে মুখে ওঠে না। এর একটি অংশ আবার সীমান্ত গলিয়ে চীন চলে যায়। কারণ এ দেশে প্রতি বছর গোশত খাওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গরুবাণিজ্য ভারত-বাংলাদেশ
ধর্মীয় কারণে আনুষ্ঠিকভাবে ভারত গরু রফতানি করে না। ভারতের সীমান্ত গলিয়ে প্রতি বছর প্রচুর গরু এ দেশে চলে আসে। এখানে চলে আসা বললে ভুল হবে, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নগদ অর্থের লোভে রাতের আঁধারে সীমান্ত দিয়ে গরুর পাল বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেয়। এর সংখ্যা ২০ লাখের বেশি বলে ভারতীয় পত্রিকা ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ উল্লেখ করেছে। শুধু স্থলপথে নয়, নদীপথেও ভারত থেকে এ দেশে গরু নিয়ে আসা হয়। এক হিসাবে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার গরু এ দেশে পাঠানো হয়ে থাকে।

কিন্তু চরম হিন্দুবাদী সরকার ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপি) ক্ষমতায় আসার পর ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধে ব্যাপক পদক্ষেপ নেয়। ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশের বর্ডার গার্ডকে নির্দেশ দেন কোনো অবস্থায় যেন গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে। সেই থেকে ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু প্রবেশ আশঙ্কাজনক কমে যায়। ফলে গরুর গোশতের দাম কেজি প্রতি আড়াই শ’ টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে তিন শ’ টাকায় পৌঁছে যায়। এতে বেজায় খুশি হয়েছেন ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেছেন, আমরা চাই বাংলাদেশে গরু গোশতর কেজি যেন হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। এ বছরই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশে পাচার করার সময় ৯০ হাজার গরু আটক করেছে বলে দাবি করে। এই পাচারে জড়িত থাকার সন্দেহে আটক করা হয় ৫০০ ভারতীয় নাগরিককে।

এতে ভারতীয় কৃষকেরা বেশ হতাশ। তারা বলেছে, হাল চাষের পর গরু বয়স্ক হলে তাকে দিয়ে আর কিছু করার থাকে না। তখন এসব গরু তারা বিক্রি করে দেন। বিক্রি হওয়া এই গরুর গন্তব্য হয় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে। এই গরু তখন সীমান্ত এলাকার ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন। যেহেতু বৈধভাবে গরু এ দেশে আসার কোনো সুযোগ নেই। তাই এই গরুবাণিজ্যে দুই দেশে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরাই কিন্তু ‘লাভবান’ হন।

এখানে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, বৈধভাবে ভারত থেকে গরু বা মহিষের গোশত বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। কিন্তু সে দেশ থেকে বাংলাদেশে গরু আসতে বাধা কেন দেয়া হচ্ছে। এর উত্তরে কিন্তু অর্থনীতির বিষয়ই খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। এ খাতে যুক্তি দেখানো হয়েছে। প্রতি বছর ভারতে গরুর গোশত রফতানির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৩০ শতাংশ হরে। আগামীতে তা আরো বেড়ে যেতে পারে। তাই গরুর গোশত রফতানিতে যেন কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না হয় তার জন্য বাংলাদেশে গরু প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এখানে ধর্মীয় কারণে চেয়ে অর্থনৈতিক কারণই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

লেখক: সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু