মেইন ম্যেনু

ভারতের নাটকে নির্দোষ মুস্তাফিজের জরিমানা

১৮ জুন মিরপুরে ওয়ানডে ম্যাচে ধোনির ধাক্কা-কাণ্ডে ভারতের অধিনায়ককে তার ম্যাচ ফির ৭৫ শতাংশ এবং ওয়ানডেতে অভিষিক্ত মুস্তাফিজের ম্যাচ ফির ৫০ শতাংশ জরিমানা করে আইসিসি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আম্পায়ার্স রিপোর্টে নামই ছিল না মুস্তাফিজের! তবু তাকে জরিমানা গুনতে হলো কেন? এ নিয়ে রয়েছে একটি বড় ধরনের নাটকীয় ঘটনা।

ধোনি-কোহলিরা সেই রাতে অভুক্ত থেকেছেন তা-ই নয়, নির্ঘুম রাত কাটিয়ে নাটকে অংশ নিয়েছিলেন। সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন রবি শাস্ত্রীও। নাটকটির নাম ‘মুস্তাফিজ’। এই নাটকে শেষাবধি তারা সফল হন এবং ৫০ শতাংশ জরিমানা হয় মুস্তাফিজের। খবর আনন্দবাজার পত্রিকার।

খবরটিতে বলা হয়, যতই এক টেস্ট ও তিন ওয়ানডের সংক্ষিপ্ত সফর হোক না কেন, বাংলাদেশ সফরে সিনিয়র টিমই শেষ পর্যন্ত পাঠিয়েছে ভারত। মেলবোর্নে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মেঘে ঢেকে গেল মিরপুরের আকাশ। কাঁধের এক ধাক্কায় মহেন্দ্র সিং ধোনি এ পারে সম্মানের সোনার সিংহাসন হারালেন। ভারত অধিনায়ক রাতে ঠিক করে ঘুমাতে পারলেন না। ম্যাচ হারের ময়নাতদন্ত করে উঠতে পারলেন না। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত তাকে দৌড়ে বেড়াতে হলো ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফটের ঘরে। যা সম্পূর্ণ প্রমাণ করতে পারলেন না ভারত অধিনায়ক।

বাংলাদেশ পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের যদি ৫০ শতাংশ জরিমানা হয়ে থাকে, ধোনির হলো ৭৫ শতাংশ। ম্যাচ রেফারির সামনে ঘটনার সময় নিজের গতিবিধি, বোলারের মুভমেন্ট, রায়নার পজিশন সব পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করেও পূর্ণ কলঙ্কমোচন সম্ভব হলো না। মেজাজ হারালেন ক্যাপ্টেন কুল।

নাটকের সূত্রপাত, বৃহস্পতিবার রাত দুটোয়। মিরপুর স্টেডিয়াম ছেড়ে ততক্ষণে অভুক্ত অবস্থায় হোটেলে ফিরে গিয়েছে ভারতীয় টিম। আচমকাই রাত দুটো নাগাদ ধোনিকে ডেকে পাঠান ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফট। ভারত অধিনায়ক উপস্থিত হলে তাকে বলে দেওয়া হয়, ‘আম্পায়াররা তোমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট জমা করেছেন। মুস্তাফিজুরকে তুমি ধাক্কা মেরেছ ম্যাচে, যা লেভেল টু অপরাধ।’ এবং তিনটি রাস্তা ফেলে দেওয়া হয় ধোনির সামনে। এক, দোষ স্বীকার করে নেওয়া। যা হলে ম্যাচ ফির ৫০ শতাংশ জরিমানা। দুই, দোষ স্বীকার করে শাস্তি কমানোর আবেদন করা। তিন, অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ করা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে দুই ম্যাচের নির্বাসন বা ১০০ শতাংশ ম্যাচ ফি কেটে নেওয়ার যেকোনো একটা হবে।

এটা শুনে নাকি উত্তেজিত হয়ে পড়েন ধোনি। বলতে থাকেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মোটেও এটা করেননি। দুভাবে ব্যাপারটা এড়ানো যেত। তিনি নিজে দাঁড়িয়ে পড়তে পারতেন। কিন্তু তাতে রান আউট হতে হতো। আর নইলে মুস্তাফিজুরকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য দিক দিয়ে দৌড়াতে পারতেন। সেটা হলে নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে থাকা রায়নার সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারত। ধোনি নাকি আরো বলেন, যে তার কাঁধ কনুইয়ের পজিশন দেখলেই বোঝা যাবে এটা ইচ্ছাকৃত নয়। তাই অভিযোগের বিরুদ্ধে তিনি লড়বেন। কারণ, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ করছেন- এই মর্মে ফরমে সই করে ম্যাচ রেফারির কাছে পাঠিয়েও দিলেন।

ম্যাচ রেফারি এবং আম্পায়াররা ঘটনার ভিডিও ফুটেজ নিয়ে রাতেই বসে পড়েন। বারবার চালিয়ে দেখা হয় ভারতীয় ইনিংসের ২৫ নম্বর ওভার। যেখানে মুস্তাফিজুরকে সজোরে ধাক্কা মেরে রান নিতে যাচ্ছেন ধোনি। অন্যদিকে ভারতীয় শিবিরে আবার বৈঠকের পর বৈঠক চলতে থাকে। সকাল পৌনে নয়টা নাগাদ ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে পড়েন চারজন। অধিনায়ক ধোনি। টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রী। সহ-অধিনায়ক বিরাট কোহলি এবং টিমের প্রশাসনিক ম্যানেজার বিশ্বরূপ দে।

ব্রেকফাস্ট টেবিলে সবচেয়ে উত্তেজিত চরিত্রের নাম ছিল বিরাট কোহলি। তিনি বলতে থাকেন ‘দোষ যে করল সে শাস্তি পাচ্ছে না। যে করেনি, সে পাচ্ছে।’ ম্যাচ রেফারির ঘরে শুনানির জন্য ঢোকার আগে পরবর্তী প্ল্যান অব অ্যাকশনও ঠিক করে ফেলা হয়। পাইক্রফটের সামনে ঘটনার অ্যাকশন রিপ্লে ধোনি করে দেখাবেন। নিজের। বোলারের। রায়নার। শাস্ত্রী তুলবেন বোলারের পজিশনের ব্যাপারটা। আর টিম ম্যানেজার আইনি প্যাঁচে ফেলবেন পাইক্রফটকে।

ছক বাঁধা পথে যা এর পর চলতে থাকে। ধোনি ঘটনার সময় নিজের কাঁধ, কনুই, মাথার পজিশন সবকিছুর পুনরাবৃত্তি করে বোঝাতে থাকেন কেন এটা ইচ্ছাকৃত নয়। শাস্ত্রী বলেন যে, ‘বোলার কেন ডেঞ্জার জোনে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে? ফলো থ্রু অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। বলও তার ধারেকাছে ছিল না।’ টিম ম্যানেজার বিশ্বরূপ যুক্তি দেন, ‘কোনো গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটলে তাকে দুভাবে দেখা যেতে পারে। চালকের দোষে সেটা ঘটেছে। নইলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই গাড়ির সামনে চলে এসেছে। সব সময় তাই চালকের দোষেই হবে, এমন নয়।’

নানা যুক্তিতর্কের পর ম্যাচ রেফারি বলেন যে, ধোনি এটা ইচ্ছে করে করেননি বোঝা গেল। কিন্তু আইসিসির কোড অব কন্ডাক্টেই আছে যে, ম্যাচ চলাকালীন ধাক্কাধাক্কি হলে জরিমানা অবধারিত। ধোনির তাই ম্যাচ ফির ৭৫ শতাংশ কেটে নেওয়া হবে। শাস্ত্রীরা তখন বলেন যে, ধোনি দোষী হলে মুস্তাফিজুরও সম্পূর্ণ নির্দোষ নন। ভারত ঠিক করে ফেলে বাংলাদেশকে যদি না ডাকা হয়, তাহলে আইসিসির কাছে রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করা হবে।

যুদ্ধে মহানাটকীয় মোড় এনে ম্যাচ রেফারি এবার ডেকে পাঠান মুস্তাফিজুরকে। যার আম্পায়ার্স রিপোর্টে নামই ছিল না! কিন্তু ভারতের শুনানির পরে মুস্তাফিজুরকে ডেকে তারও ৫০ শতাংশ ম্যাচ ফি কেটে নেওয়া হয়!