মেইন ম্যেনু

ভালোবাসায় অমলিন, চার্লি চ্যাপলিন

পরনে ঢিলেঢালা অন্তত ৩ সাইজ বড় প্যান্ট, গায়ে কালো পুরোনো কোট, মাথায় কালো হ্যাট, টুথব্রাশের মত গোঁফের নিচে রাখা চুরুট আর হাতে বেতের ছড়ি। অদ্ভুত এই বেশভূষার লোকটিকে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে হয় না। চঞ্চল চোখ আর ছটফটে চলাফেরা, সবসময়ই কিছু খুজতে থাকার ভঙ্গিমা সব মিলিয়ে কমেডি যেন মিশে আছে তার রক্তে। বিশ্বের কোটি কোটি দর্শককে কমেডির মাধ্যমে জীবনের তীক্ষ্ণ বাস্তবতা আর মনুষ্যত্বের সংকটগুলো দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। নাম তার স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র। পুরো বিশ্ব যাকে চেনে চার্লি চ্যাপলিন নামে।
এই যে তাঁর বিখ্যাত ভবঘুরে চরিত্র (Little Tramp), মজার ব্যাপার হলো একমাত্র হাতের ছড়িটা বাদে বাকি সবই ছিলো অন্যদের কাছ থেকে নেয়া। পরনের বেঢপ রকম ঢিলেঢালা প্যান্টটা, সেটা নেওয়া তাঁর প্রথমদিককার সহকর্মী রসকো আরবুকলের কাছ থেকে, রসকো’ই তাঁর শ্বশুরের হ্যাটটা দেন চ্যাপলিনকে। পুরোনো জুতা আর কোটটা পান আরেক সহকর্মী চেস্টার কংক্লিনের কাছ থেকে। টুথব্রাশ স্টাইলের যে গোঁফ – তা তৈরি ম্যাক সোয়াইনের কাটা চুল থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন ফিল্মের জন্য ক্যামেরা আবিষ্কার করলেন ১৮৮৯ সালে। একই বছরে অস্ট্রিয়ায় জন্ম নিলো নির্মম ঘাতক এডলফ হিটলার। আর সে বছরই জন্ম নেন চার্লি চ্যাপলিন, ইংল্যান্ডের লন্ডনে। তারিখটি ছিল ১৬ এপ্রিল। বড় পর্দায় নিজেকে প্রতিষ্ঠার আগে তিনি একটি বাচ্চাদের নাচের দলে কাজ করতেন। গুটি গুটি পায়ে তিনি প্রবেশ করেন সিনেমার জগতে, নির্বাক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নির্বাক করে দেন পৃথিবীকে। ভাষাহীন এইসব চলচ্চিত্র যেন সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য, সকল দেশের, সকল যুগের জন্য।
সবাক চলচ্চিত্রের শুরু দিকের জয়জয়কারের মধ্যেই তিনি নির্বাক ছবি করে দেখিয়ে দিলেন জীবনের তামাশা। যে তামাশার ভিতরে লুকিয়ে আছে মানুষের জীবনের হাহাকার, রূঢ় বাস্তবতার বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ । চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যন্ত্র সভ্যতায় মানুষের বেঁচে থাকার নামে নির্মম পরিহাস। জীবন যেখানে শুধু একটি উৎপাদন যন্ত্র। আবার এর মধ্যেই রয়েছে প্রেম-ভালোবাসা-মনুষত্ব্য। সেজন্যই পৃথিবীর সকল সংগ্রামী মানুষ নিজেদের গল্প খুজতে চলে যান অদ্ভুতদর্শন ছোট্ট্র এই মানুষটির কাছে।
চার্লির মা বাবা দু’জনেই মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের কাছ থেকেই অভিনয়ের হাতেখড়ি চার্লির। শিশুশিল্পী হিসেবে চ্যাপলিন ইংল্যান্ডের ভিক্টোরিয়ান নাট্যমঞ্চে এবং মিউজিক হলে যাত্রা শুরু করেন। চার্লির বয়স যখন মাত্র তিন, তখনই বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। মা হান্নাহ চ্যাপলিন এবং ভাই সিডনির সাথে দক্ষিণ লন্ডনের বার্লো স্ট্রিটে থাকতেন তিনি। অত্যন্ত দারিদ্র আর কষ্টের মধ্যে কেটেছে চ্যাপলিনের শৈশব। লন্ডনের সেসময়ের জনপ্রিয় নাট্যদল ‘জ্যাকসন্স এইট ল্যাঙ্কাসায়ার ল্যাডস’-এর সদস্য হয়ে শৈশব-কৈশোরে তিনি পারফর্ম করেন ব্রিটেনের নানা জায়গায়। সেই বয়সেই নিজের অভিনয় প্রতিভার প্রমান দেন বিশ্বকে।
১৯১০ সালে অভিনয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান চ্যাপলিন। হলিউডে পা রাখেন ১৯১৪ সালে। তার প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্রের নাম ‘মেকিং এ লিভিং’। একই বছর তিনি অভিনয় করেন ‘দ্য ট্রাম্প’ ছবিতে। এখানে তার অভিনীত মুখ্য চরিত্র ’শার্লট‘ সেসময় ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগালে অলোচনার ঝড় তুলেছিল। এরপর একে একে ‘কিড অটো রেসেস অ্যাট ভেনিস’, ‘দ্য কিড’, ‘দ্য গোল্ড রাশ’ প্রভৃতি সিনেমা চ্যাপলিনকে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যুগে কৌতুক চরিত্রে তাঁর অভিনয় পারদর্শিতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।
বিশ্ব যখন দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় বিপর্যস্ত তখন চার্লি চ্যাপলিন তার নির্বাক চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনয়ে তুলে এনেছেন সেসময়কার প্রধান চরিত্রগুলো। যা বিশ্ববাসীকে হাসালো তো বটেই, একই সাথে জানিয়ে দিলো যুদ্ধের প্রকৃত ঘটনা। যেমন, ১৯৪০ সালে হিটলারকে ব্যঙ্গ করে নির্মান করলেন বিখ্যাত ছবি ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’।
চ্যাপলিন ১৯২৬ সালে ‘দ্য সার্কাস’ ছবির জন্যে প্রথম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন। এরপর ৪৩ বছর বয়সে পান দ্বিতীয়বারের মত অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড । মোশন পিকচারে অবদানের জন্যে ১৯৭২ সালে তিনি এ অ্যাওয়ার্ড পান। আবারও ১৯৭৩ সালে ‘লাইমলাইট’ ছবির জন্যে তাকে এ অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত করা হয়।
অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করে রাখা এ বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর জীবনের রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে চলে যান। শুনতে ভীষণ অদ্ভুত মনে হলেও ছোট্ট এই যে সকলকে হাসানো এই মানুষটি আসলে আত্মহত্যা করেছিলেন।
একটি ছোট্ট মজার তথ্য, চ্যাপলিন যে শুধু তাঁর সিনেমার মধ্যে দিয়ে আজো মানুষের মধ্যে বেঁচে আছেন তা নয়, আকাশের তারা হয়েও বিদ্যমান তিনি। ইউক্রেনিয়ান এক জ্যোতির্বিদ কারাচকিনা মঙ্গল আর বুধ গ্রহের মাঝখানে আবিষ্কার করা এক গ্রহের নামকরণ করেন “৩৬২৩ চ্যাপলিন” প্রিয় এই অভিনেতার নামে।

অজস্র মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি, পেয়ে যাবেন আরও সহস্র বছর। পশ্চিমবাংলার প্রখ্যাত শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে যথাযথই লিখেছেন “সেই ছোট্ট ভবঘূরে, আজো আছে মনজুড়ে/ মনজুড়ে তারই ছবি আজও অমলিন/ ভালোবাসা নাও, ভালোবাসা ছড়াও/ আমি তোমায় ভালোবাসি চার্লস চ্যাপলিন।”