মেইন ম্যেনু

ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে কি অপহরণ?

ভালোবেসে পালিয়ে বিয়ে কি অপহরণ? অনেক সময়েই বিয়ে পর্যন্ত ভালোবাসার সম্পর্ক নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। বাবা-মায়ের অসম্মতির কারণে অনেক ভালোবাসার সম্পর্কে সমাপ্তি ঘটে। অনেকেই বাবা-মায়ের অসম্মতির পরও নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন বিয়ে করার জন্য। ঘর পালিয়ে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান দুজনেই। করে ফেলেন পরিবারকে ছেড়ে যাওয়ার দুঃসাহসিক কাজটি। তারপরই শুরু হয় আসল বিপত্তি।

এই পরিস্থিতিতে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মেয়ের বাবা থানায় গিয়ে ছেলের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন; এবং মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন তার নাবালিকা মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর যথারীতি চলে আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু এক্ষেত্রে আইনি সমাধান কি তা দেখি আমরা।

ছেলেমেয়ে যদি প্তবয়স্ক হয়, অর্থাৎ ২১ বছরের ছেলে ও ১৮ বছরের মেয়ে স্বেচ্ছায় বিয়ে করলে তাদের কিছু করতে পারবে না। এখানে অপহরনের মামলা করলেও মেয়ে যদি হলফনামা দিয়ে স্বেচ্ছায় আদালতে জবানবন্দি দেন, তাহলে এ মামলা খারিজ (বাতিল) হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে আদালতের কিছু করার থাকে না; মেয়ের মতামতকে মূল্য দিয়ে থাকেন। মেয়েকে আদালতে জন্মসনদ বা এসএসসি’র মূল সনদ দাখিল করতে হবে।

তবে যদি মেয়েটি নাবালক অর্থাৎ ১৮ বছরের কম বয়সী হয় তাহলে কি হবে? আইনের চোখে নাবালকের স্বেচ্ছায় মতামতের কোন মুল্য নেই। এক্ষেত্রে আদালত মেয়েটির কল্যাণের দিক বিবেচনা করে সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিবেন। অনেক সময় দেখা যায়, মেয়ের পরিবার বিয়ে মেনে নিয়েছে বলে কৌশলে মেয়েকে তাদের জিম্মায় নিয়ে যেভাবেই হোক মেয়েকে রাজি করিয়ে প্রেমিক-স্বামীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে জবানবন্দি দেন, তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে বিয়ে করেছেন। এক্ষেত্রে ছেলেটি কোনো অপরাধ না করেও এবং উভয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও ফেঁসে যেতে পারেন।

অনেকে যারা অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া বা পালিয়ে বিয়ে করতে চায় তারা কোর্ট ম্যারেজ করতে আগ্রহী। অনেকে ভাবেন কোর্ট ম্যারেজ করলেই হয়ে গেলো। আসলে কোর্ট ম্যারেজ বলতে কোনো কিছু নেই আইনে। এটি একটি প্রচলিত শব্দ। অনেকে মনে করেন কোর্ট ম্যারেজ হয়তো কোর্টে গিয়ে বিয়ে করা অথবা মাজিস্ট্রেট-এর সামনে বিয়ে করা। আসলে তা নয়। কোর্ট ম্যারেজ করতে হলে যেতে হবে কোন নোটারী পাবলিকের (সরকারী রেজিস্টার্ড উকিল) কাছে। তিনি ১০০ বা ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি হলফনামায় সই করাবেন যাতে লিখা থাকবে আপনারা প্রাপ্তবয়স্ক এবং সেচ্ছায় বিয়ে করেছেন। এটি আসলে কোনো বিয়ে নয়; বিয়ের ঘোষণা মাত্র। তার মানে বিয়ে করতে হবে যথারিতি কাজী অফিসে। রেজিস্ট্রী কাবিনমুলে। কাজী অফিসে কাবিননামায় সই করতে হবে। কাজি’কে ছেলেমেয়েদের এসএসসি’র সার্টিফিকেট বা জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হবে বয়স প্রমানের জন্য। বয়স অবশ্যই আঠারো (মেয়ে) ও একুশ (ছেলে) হতে হবে। আর লাগবে দুইজন সাক্ষী। কাবিননামাই বিয়ের প্রধান আইনী দলিল।

তবে জেনে রাখবেন, নোটারী পাবলিকের কাছে করা হলফনামার কোনো দাম নেই যদি কাবিননামা না থাকে। কাবিননামা থাকলে বিয়ের পক্ষে আর কোনো ডকুমেন্টই লাগবে না। কাবিননামাই সব।

আইনে অপহরণের সংজ্ঞা এবং শাস্তি বলপ্রয়োগ বা প্রলুব্ধ করে বা ফুসলিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে বা ভীতি প্রদর্শন করে কোন স্থান থেকে কোন ব্যক্তিকে অন্য কোন স্থানে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে অপহরণ। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ এবং ‘দণ্ডবিধি আইন’ উভয় আইনেই অপহরণের মামলা দায়ের করা যায়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী নারী অপহরণের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। দণ্ডবিধির ৩৬৬ ধারা অনুযায়ী কোনো নারীকে বিয়েতে সম্মতিদানে বাধ্য করার অভিপ্রায়ে অপহরণ বা প্ররোচিত করলে কিংবা জোরপূর্বক সহবাসে বাধ্য করলে, তাহলে দায়ী ব্যক্তি ১০ বছর যাবৎ যে কোন মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

মোঃ আলী হোসেন
এলএল.বি (অনার্স).এলএল.এম
শিক্ষানবীশ আইনজীবী
কিশোরগঞ্জ জজ কোর্ট, বাংলাদেশ।