মেইন ম্যেনু

‘ভিলেন’ শ্রীনিবাসনই এখন বাঁচাচ্ছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটকে!

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে তার চেয়ে বড় ‘দুশমন’ কমই এসেছে। ২০১৫ সালের ১৯ মার্চ মেলবোর্নে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে হারার পর গোটা বাংলাদেশ প্রায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসন তাদের দেশের ক্রিকেটের জন্য এক নম্বর শত্রু, সবচেয়ে বড় ভিলেন।

আইসিসিতে প্রভাব খাটিয়ে তিনিই যে রোহিত শর্মার আউটে নো-বল ডাকানোর ব্যবস্থা করেছিলেন, কিংবা ফাইনালের পরে তখনকার আইসিসি প্রেসিডেন্ট মোস্তফা কামালকে ট্রফি দিতে না ডেকে চরম অপমান করেছিলেন সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহই ছিল না বাংলাদেশের।

তাতে কতটা সত্যি ছিল, আর কতটা জল্পনা ছিল সে অন্য বিতর্কের বিষয়। কিন্তু সম্প্রতি আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর নির্বাহী কর্মকর্তাদের বৈঠকে যে টু-টিয়ার সিস্টেম বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাতে অনেকেই শ্রীনিবাসনের লম্বা হাতের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন।

এই সিদ্ধান্তের ফলেই বাংলাদেশের একটা বড় আশঙ্কা দূর হয়েছে, টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে ওপরের দিকের দলগুলোর সঙ্গে ম্যাচ খেলার সুযোগ হাতছাড়া হবে বলে বাংলাদেশের যে দুশ্চিন্তা ছিল, আপাতত সেটা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হচ্ছে না!

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেখানে এন শ্রীনিবাসনের ভূমিকা কোথায়?

ভারতীয় বোর্ডের খুব নির্ভরযোগ্য সূত্রে যেটা জানা যাচ্ছে তা হল আইসিসির বিরুদ্ধে প্রায় জেহাদ ঘোষণা করে ভারত যে টু-টিয়ার সিস্টেম বাতিল করার দাবিতে দুবাইয়ের বৈঠকে প্রবল চেঁচামেচি করেছে সেই স্ট্র্যাটেজি ঠিক করার ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়েছেন স্বয়ং শ্রীনিবাসন। অথচ টু-টিয়ার সিস্টেমের প্রস্তাব তার আমলেই আনা, কিন্তু ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ এই পুরনো নীতিতে আস্থা রেখে তিনি এখন গোপনে হাত মিলিয়েছেন ভারতীয় বোর্ডের বর্তমান কর্তাদের সঙ্গে।

সোজা কথায়, তার এক নম্বর শত্রু এখন শশাঙ্ক মনোহর, যিনি আইসিসি চেয়ারম্যান। মনোহরের সঙ্গে সংঘাত চরমে পৌঁছেছে ভারতীয় বোর্ড বিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট অনুরাগ ঠাকুরের। ফলে তিনি এখন শ্রীনির ‘শত্রুর শত্রু’। পয়লা নম্বর শত্রুকে বিপাকে ফেলতে অনুরাগ ঠাকুর অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে তলে তলে যোগাযোগ রাখছেন তিনি, যদিও এককালে এই অনুরাগ ঠাকুরের সঙ্গেও তার কম তিক্ততা হয়নি।

নানা কেলেঙ্কারিতে জেরবার হয়ে শ্রীনি বেশ কিছুদিন ক্রিকেট প্রশাসনের বাইরে ঠিকই, কিন্তু ক্রিকেট থেকে তার আগ্রহ চলে গেছে এ কথা কেউই বলছে না। ফলে আইসিসিতে গিয়েই যিনি ভোল পাল্টে ফেলেছেন এবং ভারতের স্বার্থ মোটেই দেখছেন না বলে ভারতীয় বোর্ডের ধারণা, সেই শশাঙ্ক মনোহরের বিরুদ্ধে কী করা যায় এটা ভেবে যখন অনুরাগ ঠাকুররা মাথার চুল ছিঁড়ছেন, তখনই তাদের কাছে ‘ফিলার’ পাঠান শ্রীনিবাসন।

পরামর্শ দেন, ‘আইসিসি যদি তোমাদের দাবি মতো টাকা দিতে না চায় বা ‘বিগ থ্রি’ (ইংল্যোন্ড-অস্ট্রেলিয়া-ভারত) ফর্মূলা মানতে না চায় তাহলে টু-টিয়ার সিস্টেমটাই তোমরা বাতিল করার দাবি তোলো! এককালে সমর্থন করেছো তো কী হয়েছে, এখন স্রেফ ভুণ্ডুল করে দাও গোটা পরিকল্পনা!’

এই এক শলাতেই কাজ হয়েছে ম্যাজিকের মতো। দুবাইয়ের বৈঠকে ভারত পাশে পেয়েছে বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে আর শ্রীলঙ্কাকে। বাকি ছয়টি পূর্ণ সদস্য দেশ টু-টিয়ার সিস্টেমকে সমর্থন করা সত্ত্বেও আইসিসি সেই প্রস্তাব মুলতুবি করে দিতে বাধ্য হয়েছে। এমন কী, এই প্রস্তাবে ভোটাভুটি পর্যন্ত করানো যায়নি, যদিও ভোট হলে প্রস্তাবের বিরোধীদের হার হতো অবধারিত।

সেই বৈঠকের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সিইও নিজামুদ্দিন চৌধুরী ক্রিকইনফোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘টু-টিয়ার সিস্টেমের অসুবিধা নিয়ে আমরা যে অন্য দেশগুলোকে শেষ পর্যন্ত বোঝাতে পেরেছি তাতে বাংলাদেশ খুবই আনন্দিত!’

তবে এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই যে, শ্রীনিবাসনের বাংলাদেশ-প্রেম হঠাৎ উথলে উঠেছে। নিচু র্যাংওকিংয়ের দলগুলোর শুধু নিজেদের মধ্যেই খেলা উচিত, ব্যক্তিগতভাবে এখনও এই বিশ্বাসেই তিনি অটল। কিন্তু শত্রুদের সঙ্গে তার অনেক নিজস্ব হিসেব চোকানোর বাকি, ফলে ওইসব নিয়ে তিনি এখন আর মাথা ঘামাতে রাজি নন। শশাঙ্ক মনোহরকে ঘায়েল করার জন্য তিনি একটা স্ট্র্যাটেজি তৈরি করেছেন, পরোক্ষে তার ফায়দা পেয়ে গেছে বাংলাদেশ – ব্যাস, এটুকুই!

তবে এই গল্পে রয়েছে আরও একটা সূক্ষ্ন মোচড়। মাত্র দু’দিন আগেই ভারতীয় বোর্ডের সচিব অজয় শিরকে (যিনি একদা শ্রীনির দুর্নীতির প্রতিবাদে বোর্ড থেকে ইস্তফা দেন) সঙ্গীদের নিয়ে চেন্নাইতে শ্রীনিবাসনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু অফিসের দরজা থেকেই শ্রীনি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। মিডিয়াকে জানানো হয়েছে, শ্রীনি দেখা করেননি।

ভারতীয় বোর্ডের এক কর্তা হাসতে হাসতে বলছেন, ‘বুঝলেন তো, এটাও পুরোটাই শ্রীনির ধুরন্ধর চাল। বর্তমান বোর্ড নেতৃত্বের সঙ্গে তার যে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই, সেটাও দেখানো হল – আবার তিনি যে নিজে থেকে বোর্ডকে পরামর্শ দিতে চান না, বরং বোর্ডই তার পরামর্শ চায় সেটাও প্রমাণ করা হল!’

ভারতের ক্রিকেট রাজনীতির এই জটিল সমীকরণের অঙ্কেই আপাতত ক্রিকেট বিশ্বের সেরা লীগে থাকার আশ্বাস পেয়ে গেল বাংলাদেশ। পরোক্ষ সৌজন্যে নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসন!-বাংলা ট্রিবিউন