মেইন ম্যেনু

ভোগান্তি চলছেই, যখন-তখন বাস বন্ধ

রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলোতে সিটিং সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেছে। মূখ্যত বাসমালিকদের সিদ্ধান্তেই এই ধরনের সব পরিবহনসেবা বন্ধ করা দেয়া হয়েছে। যাত্রীদের জিম্মি করলে রুট পারমিট বাতিল করা হবে বলে বিআরটিএ বাস মালিকদের হুঁশিয়ার করলেও ঢাকাবাসীর দুর্ভোগের চিত্র পাল্টায়নি। রাজধানীতে ‘সিটিং সার্ভিস’ বন্ধের পর তৃতীয় দিন মঙ্গলবার (১৮ এপ্রিল) মালিকরা গাড়ি কম নামিয়ে সড়কে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করায় ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ যাত্রীরা।

রাজধানীবাসীর পরিবহনসংকটকে পুঁজি করে গেল বেশ কয়েকবছর ধরেই ‘সিটিং’, ‘ডাইরেক্ট’, ‘কমস্টপেজ’ প্রভৃতি সেবার নামে নাগরিকদের পকেট কাটা হচ্ছিল। হাতিয়ে নেয়া হচ্ছিল কোটি কোটি টাকা। এই অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রতি সরকারের চাপে পরিবহন মালিকরা নিজ থেকেই ঘোষণা দেয় ১৫ই এপ্রিল ২০১৭ থেকে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বলে কোন ধরনের বাসসেবা থাকবে না। তবে ১৫ তারিখে না পারলেও গত রবিবার ১৬ই এপ্রিল থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। একইসঙ্গে এই সিদ্ধান্ত মানাতে অভিযানও শুরু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ। তবে বিভিন্ন রুটের ভাড়া নির্ধারণে এখন পর্যন্ত মালিক কর্তৃপক্ষ বা সরকার তরফে কোন সিদ্ধান্ত না দেয়ায় বেড়েছে যাত্রী হয়রানী।

বিআরটিএ’র অভিযানের কারণে অনেক মালিকই বাস নামায়নি রাস্তায়। তাই হঠাৎ করে বাস না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীসাধারণ। তাদের অভিযোগ মালিকরা সিটিং সার্ভিস বন্ধ করে দিলেও ভাড়া নির্ধারণে তাদের অনিহাই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তারা নিজেদের সিদ্ধান্তই মানছেন না বলেই অভিযোগ যাত্রী সাধারনের।

মালিকরা সিদ্ধান্ত জানিয়ে তাদের দায় সারলেও তা বাস্তবায়নের তাদের তরফ থেকে তেমন কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি। বরং বিআরটিএ’র অভিযানের কারণে গতকাল সকাল থেকেই বেশিরভাগ রুটেই বাসের সংখ্যা কমে যায়। যাওবা চলেছে সেগুলোতেও ভাড়া নিয়ে হয়েছে বাসশ্রমিক ও যাত্রীদের সঙ্গে বচসা। কোথাও কোথাও তা হাতাহাতিতে গড়িয়েছে। বাসশ্রমিকরা বাসগুলোকে লোকাল সার্ভিস করলেও ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে আগের অবস্থানে থাকায় এমন বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, কিলোমিটার নয়, নিজস্ব চেক পয়েন্ট হিসাব করে আর মালিক সমিতির চার্ট দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ, ক্ষেত্রবিশেষে তিনগুণ ভাড়া আদায় করছে পরিবহনগুলো।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান গতকাল বলেন, কোনও পরিবহন কোম্পানি তাদের গাড়ি বন্ধ রাখলে রুট পারমিট বাতিল করে দেয়া হবে।
কিন্তু গতকালও বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, বাসের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। বাস না পেয়ে বিভিন্ন মোড়ে যানবাহনের আশায় দাঁড়িয়ে আছেন যাত্রীরা। নারী যাত্রীদের ভুগতে হচ্ছে অনেক বেশি।

সকালে কালশী মোড়ে এক ঘণ্টা বাসে ওঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন মালতী রাণী দাশ। তিনি বলেন, ‘গাড়িতে উঠতে পারতেছি না। গাড়ি যে কয়টা আসছে পুরুষ যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে উঠল, আমরা আর উঠতে পারি না।’

যমুনা ফিউচার পার্কের দোকান কর্মচারী আনিসুর রহমান জানান, কাজে যাওয়ার জন্য সকালে পূরবী থেকে অছিম পরিবহনের বাসে ওঠেন তিনি। রবিবার তার কাছ থেকে ‘সিটিং ভাড়া’ ২৫ টাকা নেয়া হলেও গতকাল ‘লোকাল ভাড়া’ ১৮ টাকা নেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস কম থাকায় ভোগান্তি ঠিকই হয়েছে।
বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের কথা-কাটাকাটির ঘটনা চোখে পড়েছে গতকালও।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কালশী মোড়ে গ্যালাক্সি পরিবহনের চালকের সহকারী যাত্রীদের সঙ্গে বিতণ্ডার পর গাড়ি থেকে নেমে যান। এ অবস্থায় যাত্রীভর্তি বাসের চালকও সহকারী ছাড়া যেতে অস্বীকৃতি জানান।

বাসের চালক রাসেল মিয়া বলেন, ‘মিরপুর ১১ নম্বর থেকে কাকলীর ভাড়া ১৮ টাকা। কিন্তু কেউ ১০ টাকা দেয়, কেউ ১৫ টাকা দেয়। হেলপারকে মারার পর হেলপার পালাইছে, আমি কেমনে যাব ?’

পরে একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট এসে ইসিবি চত্বর থেকে ভাড়ার চার্ট নিয়ে সে অনুযায়ী ভাড়া আদায়ের রফা করলে বাস গন্তব্যে ছেড়ে যায়।

সকাল ৯টার দিকে কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় দেখা যায়, মিরপুর থেকে বাস নিয়ে কুড়িল এসে আর যেতে চাইছেন না চালকরা। কারণ জানতে চাইলে আকবর আলী নামে একজন চালক অভিযোগ করেন, ‘যাত্রীরা ভাড়া ঠিকমতো দেয় না। উল্টো মারপিট করে। আগে মিরপুর থেকে মহাখালী পর্যন্ত ২৫ টাকা ভাড়া আছিল। অহনও চার্টে ২২ টাকা ভাড়া আছে । কিন্তু যাত্রীরা দিবার চায় না। ১৫ টাকা দ্যায়, আবার অনেকে ১০ নম্বর থাইকা মহাখালী পর্যন্ত ১০ টাকা ভাড়া দেয়। সুপারভাইজার তো ওয়েবিলে ২০ ট্যাকা লেইখা দেয়। বাকি ট্যাকা আমি কইত্থন দিমু ?’

কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় কথা হয় খিলক্ষেত থেকে আগারগাঁও রুটের যাত্রী সূর্যদেব সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সিটিং ভাড়া আদায় একটু কমেছে। আগে খিলক্ষেত থেকে আগারগাঁও ৩০ টাকা ছিল, আজকে পঁচিশ টাকা নিয়েছে। কিন্তু বাস কম, যাত্রী যেতে পারছে না।’

সড়কে বাস কম থাকার কারণ জানতে চাইলে বসুমতি পরিবহনের পরিচালক খন্দকার মনির আহমেদ বলেন, ‘বিভিন্ন পরিবহনের কর্মীদের সঙ্গে যাত্রীদের ঝামেলা হওয়ায় চালকরা গাড়ি চালাতে চাইছেন না। রবিবার মারামারির পর অনেক ড্রাইভার আজ বের হয় নাই। সকালেও কয়েকটা বাসে মারধরের ঘটনা ঘটছে। ভাড়া কম পাওয়ায় অনেকে গাড়ি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি তাদেরকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে গাড়িতে নিয়ে আসার। যাত্রীদেরকেও বলছি, ভাড়ার চার্ট অনুযায়ী ভাড়া দেন। বেশিও দিয়েন না, কমও দিয়েন না।’

বাস না পেয়ে রবিবার রিকশায় চড়ে ফার্মগেইট থেকে মিরপুরের বাসায় ফেরেন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা তাসনিয়া রহমান। গতকাল সকালে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বাস পেলেও তাকে অফিসে যেতে হয়েছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।

তিনি বলেন, ‘যা ভিড়, এদিকে বাসও তেমন নেই। উপায় না দেখে দাঁড়িয়েই যেতে হচ্ছে। সিটিং সার্ভিস না থাকায় এখন গাদাগাদি করে যাত্রী তুলছে, গরমের মধ্যে সবাই কষ্ট পাচ্ছে। পৌঁছতেও সময় লাগছে বেশি। এভাবে তো নিয়মিত চলাফেরা করা সম্ভব না।’

রামপুরার একরামুন্নেছা স্কুলের শিক্ষক রাখী রায় বলেন, তার এলাকায় আগের সিটিং বাসগুলোতে লোকালের মত লোক তোলা হলেও সিটিং সার্ভিসের মতই ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মেরাদিয়া থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত লোকাল ভাড়া ৫ টাকা। আমার কাছ থেকে আজকেও ১০ টাকা নিল।’

সদরঘাট থেকে প্রগতি সরণি হয়ে গাজীপুর চলাচলকারী সুপ্রভাত পরিবহনেও রবিবারের তুলনায় ভাড়া কমানো হয়েছে। কিন্তু গাড়ি কম থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন রামপুরা উলনের বাসিন্দা মেরাজ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘বাসে তো ওঠার জো নাই। গাড়ি ঠাসাঠাসি করে তবেই ছাড়ে। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে হেল্পার বলে সামনে নাইমা হাইট্টা যান।’

বাসে ভাড়ার তালিকা নিয়েও বিভ্রান্তি আছে যাত্রীদের মধ্যে। অনেক যাত্রী বিআরটিএর ২০১৫ সালের করা তালিকা অনুযায়ী ভাড়া দিতে নারাজ। এ নিয়ে পরিবহন শ্রমিকরদের সঙ্গে তর্কে জড়াচ্ছেন তারা।

নতুন বাজার থেকে মহাখালী যাওয়ার জন্য বিহঙ্গ পরিবহনের বাসে ওঠা শাহ আলমের কাছে তালিকা অনুযায়ী ১৩ টাকা ভাড়া চাওয়া হলেও তিনি ১০ টাকার বেশি দিতে নারাজ।

তিনি বলেন, ‘এরা পুরনো তালিকা ধরে ভাড়া নিচ্ছে। পরে যে তালিকায় করছে, সেখানে তো ভাড়া কমাইছে। কিন্তু সে তালিকা তারা আনে না।’

বাসে ভাড়ার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন করলে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেন, ২০১৫ সালের পর আর নতুন করে তালিকা হয়নি। ভাড়ার তালিকা নিয়ে যাত্রীদের বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।