মেইন ম্যেনু

দিন কাটছে অর্ধহারে অনাহারে

ভোলার মেঘনার ভাঙনে আশ্রয়হীন হাজার হাজার মানুষ

ভোলার মেঘনার ভাঙনে ঘরভিটা হারিয়ে পূর্ব ইলিশা, দক্ষিণ রাজাপুর ও কালুপুর গ্রামের প্রায় হাজার হাজার মানুষ খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। এদের মধ্যে কেউ বাঁধের উপর আবার কেউ বা রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছেন। বসতভীটা হারিয়ে এসব পরিবারের মানুষের দিন কাটছে অর্ধহারে অনাহারে।

সর্বস্বহারা মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখার কেউ নেই। সরকারের দপ্তর থেকে সামান্য কিছু ত্রাণ পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে অভিযোগ ভাঙন কবলিত মানুষের।স্থানীয়রা জানায়, রোজার ঈদে হঠাৎ করেই ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করে ভোলার মেঘনা।

সদরের ইলিশা পয়েন্ট দিয়ে পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তীব্র ভাঙনে গত দুই মাসে বিলীন হয়ে গেছে হাজারো ঘরবাড়ি, দু’টি গুচ্ছগ্রাম, দু’টি মসজিদ, দু’টি মৎস্য আড়ৎ, একটি ফেরিঘাট, একটি লঞ্চঘাট ও শত শত হেক্টর ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধের উপর খোলা আকাশের নিচে। সহায় সম্বল হারিয়ে এসব পরিবারগুলো কিছুতেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না। ভাঙন কবলিত এলাকার সাহজল মাঝির স্ত্রী গৃহবধূ সাহিনুর বান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ১২ গন্ডা জমি ছিল, জমির আয়-ইনকাম দিয়ে সংসার চলত। অভাব ছিলো না, কিন্তু মেঘনা সব কেড়ে নিয়েছে।

এখন আশ্রয় নেওয়ার মত কোনো জায়গা নেই। কৃষক সোবাহানের স্ত্রী তারা বিবি বলেন, তেমাথা এলাকায় বাড়ি ছিল আধকানি জমিও ছিল। মেঘনার ভাঙনে সব শেষ। এখন বাঁধের উপর আছি, সরকার আমাদের কোনো খোঁজ খবর নেয়না।জাফর উদ্দিন বলেন, মেঘনার এমন ভাঙন এর আগে কখনো দেখিনি। যেভাবে ভাঙছে এতে কিছুদিনের মধ্যেই পুরো এলাকা নদীতে চলে যাবে।

স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী আঁখি আক্তার বলে, দিনে ও রাতে সমান তালে মেঘনার ভাঙন চলছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সরকারি সাহায্য পায়না, তালিকায় উঠেনা ক্ষতিগ্রস্তদের নাম, ত্রাণ নিয়েও চলে অনিয়ম।

একই অভিযোগ করেন, জয়নাল আবেদিন, আলমগীরসহ অনেকে।জানা যায়, রাজপুর রিং (বিকল্প বাধ) বাঁধের উপর শত শত পরিবারের আশ্রয়। খড়-কুটো, খলপা কিংবা একচালা টিন দিয়ে ঝুপড়ি ঘরে সন্তানদের নিয়ে তাদের বসবাস করতে হচ্ছে। সব হারিয়ে এসব পরিবারের দিন কাটছে অনাহারে অর্ধাহারে। রান্না-বান্নাও ঠিকমত করতে পারছেন না তারা।এদের মধ্যে বিল্লালের স্ত্রী বিপুল বেগম, দুলালের স্ত্রী জরিনা, আ. বারীর স্ত্রী মমতাজ বেগম জানান, ছবি তুলে কি লাভ, আমাদের দুঃখ দুর্দশা কেউ দেখেনা। কিছুদিন আগে নগদ টাকা ও চাল বিতরণ হলেও আমাদের ভাগ্যে তা জোটেনি। মেম্বার-চেয়ারম্যারা আমাদের খবর নেয়না।ইউপি সদস্য মাসুদ রানা বলেন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সাহায্য সহযোগিতা করা হয়েছে। ৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় চার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।

এদিকে মেঘনার ভাঙনে ইলিশা নতুন ফেরিঘাট এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। নতুন করে ভাঙনের মুখে পড়েছে আদর্শ গুচ্ছ গ্রাম।গুচ্ছ গ্রামে খবর নিয়ে জানা যায়, গুচ্ছ গ্রামে ৩০টি পরিবার বসবাস করছেন। তবে ঘর রয়েছে অর্ধশতাধিক। ভাঙন আতঙ্কে ঘরভীটা অনত্র সরিয়ে নিচ্ছেন সেখানকার মানুষ। কেউ ঘর ভেঙে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত আবার কেউ গাছ কেটে নেওয়ার কাজে। কিন্তু এদের আশ্রয় কোথায় এমন প্রশ্ন করা হলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অনেকেই বলেন, রাস্তার উপর। তারা বলেন, এক সময় আমাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগানো মত অবস্থা ছিলো, কিন্তু এখন সব শেষ। সর্বনাশা মেঘনা কেড়ে নিয়েছে সব।

ভাঙন কবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে চরম মানবিক বিপর্যয়। বাঁধে ও রাস্তায় আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারছেননা। ভাঙনে দিশেহারা তিন গ্রামের পরিবারে যেন নিরব কান্না চলছে।

গতিপথ পরিবর্তন ও স্রোতের ঘূর্ণিতে ভাঙন বেড়েছে বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হেকিম বলেন, ভাঙন রোধ না হওয়া পর্যন্ত কাজ অব্যাহত থাকবে।

ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ভোলার নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং গৃহহারা পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে ভোলার মেঘনা। তীব্র ভাঙন চলছে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে।

মেঘনার এ ভাঙন অব্যাহত থাকলে একটি পুলিশ ফাঁড়ি, ১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১০ হাজার ঘরবাড়ি, কয়েক হাজার হেক্টর ফসলের জমি, বড় দু’টি বাজার, মসজিদ, রাস্তাঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিলীন হয়ে যাবে। হুমকির মুখে পড়বে ভোলা শহর।