মেইন ম্যেনু

ভোলায় হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশ বান্ধব খেজুর গাছ

ভোলা জেলায় এক সময় সারিবদ্ধভাবে নয়ন জুড়ানো খেজুর গাছ চোখে পড়তো রাস্তার পাশে, পুকুর পাড়ে, কৃষি জমির পাশে। ইটভাটা, বানিজ্যিক চাষ, সুষ্ট তদারকি না করার ফলে ভোলার ঐতিহ্যের বাহক খেজুর গাছ আজ বিলুপ্তি প্রায়।

ভোলাসহ এ জেলার বোরহানউদ্দিন, দৌলতখান, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরা বলতে গেলে খেজুর গাছ এখন দেখাই যায় না আর। এসব এলাকার নতুন প্রজন্মের অনেকে খেজুর রসের স্বাদটা কি রকম তা জানেনা। এক সময় খেুজর রসের জন্য শিয়ালীদেও দুই তিন দিন আগে বলে রাখা হতো। যাদের খেজুর গাছ ছিল না তারাও খেজুর রস খাওয়া থেকে বঞ্চিত হতো না।

বিশেষ করে এ শীত মৌসুম এলে শিয়ালীদের আনন্দের সীমা থাকতো না। শীতের ভোরে খেজুর রস সংগ্রহের জন্য গাছিরা মহাব্যস্ত হয়ে পড়তো। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের প্রতিক মধু বৃক্ষকে ঘিরে গ্রামীণ জনপদে থাকতো উৎসব মুখর পরিবেশ।

কোমরে মোটা রশি বেঁধে গাছে ঝুঁলে ঝুঁলে রস সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তো গাছিরা। খেজুর রস সংগ্রহ করে আমন ধানের নতুন পিঠা, পুলি ও পায়েশ তৈরীর ধুম পড়ে যেতো গ্রামে গ্রামে। তাছাড়া খেজুরের গুড় দিয়ে মুড়ির মোয়া, চিরার মোয়া ও মুড়ি খাওয়ার জন্য কৃষক পরিবার থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের শীতের মৌসুম অতি প্রিয় হয়ে উঠতো।

এ ব্যাপারে ভোলা সদরের ইলিশা ইউনিয়নের শিয়ালী সিডু জানান, প্রতি বছর শীতের মৌসুম এলেই নিজের গাছ ছাড়াও অন্যের গাছ কাটতাম। কিন্তু এখন কিছু গাছ মরে যাওয়া এবং কিছু গাছ বিক্রি করার কারনে ২০/৩০টি গাছ কাটি।

এদিকে পাঙ্গাশিয়া গ্রামের হেলাল উদিদ্দন জানায়, এক সময় আমাদের এলাকার রাস্তার চারপাশে, পুকুর পাড়ে এবং বাগানে অসংখ্য খেজুর গাছ থাকাত। আমাদের এ জায়গার নাম অনেকে খেজুর তলা বলত। বর্তমানে ইটভাটায় খেজুর গাছ পোড়ানোর কারনে এখন আর খেজুর কাছ নেই। শীত মৌসুম আসলেই খেজুর রস দিয়ে রসের নাস্তা আর ভাপা পিঠার ধুম পরে যেত। সে সময় খেজুর রস ছিল সহজলভ্য। নতুন মেহমান আসা মানেই খেজুর রস আর ভাপা পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন। যাদের গাছ ছিল না তারাও শিয়ালীদের কাছ থেকে কাচা কিংবা পাকা রস কিনে খেত।

এ ব্যাপারে ধনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মামুন,আরিফ জানান, এ মৌসুম এলেই আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে শিয়ালিদের ফাঁকি দিয়ে খেজুর রস চুড়ি করে রাত জেগে রসের নাস্তার আয়োজন করতাম, এখন টাকা দিয়েও খেজুর রস খেতে পারি না।

অপরদিকে শীত মৌসুম এলেই অনেক শিয়ালী গাছ ছাটাই করে সে রস বিক্রির টাকায় ভালোভাবেই সংসার চালাতে পারতো।এ সব শিয়ালীদের নিজস্ব খেজুর গাছ না থাকলেও গাছ মালিকদের গাছ ছাটাই করে সংগ্রহীত রসের একটি অংশ প্রদান করতে হত।

অন্যদিকে বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের শিয়ালী নসু জানান, গত কয়েক মৌসুমে ৩০-৪০টা গাছ ছাটাই করতাম। সম্প্রতি অধিকাংশ গাছ মরে যাওয়ায় এ মৌসুমে সামান্ন কিছু গাছ ছাটাই করা সম্ভব নয়।
এ দিকে খেজুর গাছের দহন ক্ষমতা অনেক বেশী হওয়ায় ভোলা জেলার অধিকাংশ ইটভাটাগুলোতে খেজুর গাছ পোড়ানো হয়।

সূত্রে জানা যায়, ভোলা জেলায় সরকারের অনুমতি নিয়ে না নিয়ে প্রায় ৭২টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ভোলা সদরে ১৬টির মধ্যে ৪টি, বোরহানউদ্দিন উপজেলায় ১৩টির মধ্যে ১টি, চরফ্যাশন উপজেলায় ১৪টির মধ্যে ৩টি ২০১০ পর্যন্ত লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে।

এসব ইটভাটাগুলো কয়লা দিয়ে পোড়ানোর কথা থাকলেও অধিকাংশ ইটভাটাগুলোতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ, এমনকি ভোলার পরিবেশ বান্ধব খেজুর গাছ পোড়ানো হচ্ছে। এভাবে খেজুর গাছ পোড়ানো হলে আগামী কয়েক বছরে সুÑস্বাধু এবং ঘনপাকা রস মাসের পর মাস রেখে খাওয়ার সুযোগ রয়েছে কি?

চিন্তাশিল ব্যক্তি মাত্রই এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন।এখনো পরিকল্পিত উপায়ে বাগান করে খেজুর গাছ বিলুপ্তি রোধ করার পাশাপাশি ইটভাটাগুলোতে খেজুর গাছ যাতে না পোড়ানো হয় সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সু-নজর কামনা করছে সচেতন মহল।